সম্প্রীতির আলকাপ

নাচ-গান-তামাশায় গ্রামীণ পালাগান

বাংলার গ্রামীন সংস্কৃতির মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপাদানগুলো লুকিয়ে আছে, খেটে খাওয়া গ্রামের মানুষ খুব সহজেই নিজেদের একাত্ম করে নিয়ে পারে সেগুলোর সঙ্গে। যেমন সত্যপিরের পুজোতে হিন্দু-মুসলিম একজোট হয়ে মানত করে, শিরনি খায়, আনন্দে মেতে ওঠে। হিন্দুদের দেবতা সত্যনারায়ণ আর মুসলমানের পির একাত্ম হয়ে গেছে সত্যপিরের বিশ্বাসে। সেইরকমই আলকাপ গানেও বাঁধা রয়েছে সম্প্রীতির সুর। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ, বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে আলকাপ গানের চর্চা করেন সাধারণত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। বিহার, ঝাড়খণ্ডের কোনো কোনো জায়গাতেও আলকাপের প্রচলন আছে। আর সেই গানের সবথেকে বেশি চাহিদা থাকে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজোর মতো হিন্দু উৎসবগুলোতে। এর পাশাপাশি নতুন ধান কাটার সময়েও বসে আলকাপের আসর। গ্রামের পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতেও আলকাপের দল বায়না করে থাকে। যেহেতু সারা বছর পালার আয়োজন হয় না, তাই আলকাপের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের সবারই অন্য পেশা রয়েছে।  

এই গানের আসর অনেকটা যাত্রাপালার মতো। তবে যাত্রায় অভিনয়ের ভাগ থাকে বেশি, আর আলকাপে গুরুত্ব পায় নাচ-গান-তামাশা। যাত্রার মতো নির্দিষ্ট কাঠামো আলকাপের নেই। এই একে পালাগানের একটি শাখা বলাই ভালো। ‘আলকাপ’ একটি আরবি শব্দ। ‘আল’ কথাটির বাংলা অর্থ বেশ কয়েকটি – ‘কাব্যের অংশ’, ‘তীক্ষ্ণ’, ‘তীব্র’, ‘ধারালো’। ‘কাপ’ শব্দেরও অনেকগুলো বাংলা করা যায় – ‘কাব্য’, ‘সং’। ‘আলকাপ’ কথাটিকে একসঙ্গে সাধারণত ‘কৌতুক’ বা ‘মস্করা’ অর্থে ব্যবহার করা হয়। ১৯ শতকের শুরুতে গ্রামীন বাংলায় আলকাপের চর্চা শুরু হলেও এর জনপ্রিয়তা আসে ২০ শতকের শুরুতে। গান আর বোল বা ছড়া নিয়ে তৈরি হয় আলকাপ। ছড়া বাঁধায় অংশ নেন দর্শকরাও। গানের ছয়টি অংশ – জয়, আসর বন্দনা, দেশ বন্দনা খ্যামটা, দ্বৈত সংগীত আর আলকাপ পালা।  রাতে অথবা দিনে বসতে পারে আসর। দিনে মোটামুটি দুপুর ৩টের পর থেকে শুরু হয়ে পাকলা শেষ হয় ৮টা পর্যন্ত। আরেরকটা পালা রাত ১১টার পর শুরু হয়ে চলে সারারাত। 

রাধাকৃষ্ণের লীলা, মনসা-চণ্ডীর কাহিনির মতো পৌরাণিক বিষয়ের সঙ্গে কৃষক আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, নেতাজি সুভাষ বসুর জীবনী – অনেক বিষয় নিয়েই পালা বাঁধা হয়। পালার আসরে চারদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন দর্শকরা আর মাঝখানে বসে গানের আসর। গানের দলে থাকে মোটামুটি আট-দশ-বারো জন লোক। একজন থাকেন ওস্তাদ, মাস্টার বা সরকার থাকেন। আরেকজন থাকেন ভাঁড় বা কাপ্যাল। পালাতে এরা দুই ভাইয়ের মতো দুটি চরিত্র। গানের সময় ওস্তাদ কাপ্যালকে ‘পটলা’, ‘মদনা’-র মতো নামে ডেকে থাকে। এছাড়া থাকে মেয়েদের পোশাকে দু-তিন জন ছেলে, যাদের বলা হয় ছোকরা। মঞ্চের ওপরে থাকে দোহার আর নিচে একদিকে থাকে বাজনার দল। থাকে হারমোনিয়াম, ডুগি, তবলা, খঞ্জনি, ঢোল, বাঁশি। খঞ্জনিকে কখনও কখনও বলা হয় জুরি। আলকাপের পালায় দরকার মতো বাজনাদার আর দোহারিদেরও অভিনয় করতে হয়, আবার প্রয়োজন হলে দোহারির কাজ করতে হয় অভিনেতাদের। গানের আসরে আগে হ্যাজাগ বাতি থাকত, এখন ইলেকট্রিকের আলোতেই বসে আলকাপের আসর।

তথ্যসূত্র – priyo.com; আলকাপ গান, ওয়াকিল আহমদ 

Developed by DXDasia