
স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসই প্রথম স্বদেশপ্রেমের পাঠ দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্রকে
ছাত্রজীবনে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মনে প্রথম দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা-সংগ্রামী হওয়ার বীজ যিনি পুঁতেছিলেন, তাঁর নাম বেণীমাধব দাস । তখন এলিট বাঙালি সমাজে ইংরেজ সরকারের অধীনে উঁচু পদের চাকরিকেই সম্মানীয় কাজ হিসেবে ধরা হত। সুভাষচন্দ্রের মামা বিনোদচন্দ্র মিত্র ছিলেন বাংলার অ্যাটর্নি জেনারেল। ছোট্ট সুভাষ স্বপ্ন দেখতেন, তিনি বড়ো হয়ে মামার মতো পদাধিকারী হবেন, অথবা হবেন আইসিএস। র্যাভেন শ কলেজিয়েট স্কুলের পড়ার সময় প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব পুরোপুরি সুভাষচন্দ্রের চিন্তাভাবনা পালটে দিলেন। স্কুলের প্রথম দিন যখন বেণীমাধব হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন বারান্দায়, তাঁকে দেখে ইংরেজ শাসকের আজ্ঞাবাহক কোটপ্যান্ট-পরিহিত নকলনবিশ কর্মচারীদের প্রতি সুভাষের যে অন্ধভক্তি এতদিন ছিল, তা এক ঝটকাতেই ক্ষীণ হয়ে এসেছিল দেশীয় পোশাকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বেণীমাধবের ক্যারিশ্মাটিক ব্যক্তিত্বের সামনে। সুভাষ তখন থেকেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রশাসনের কোনো উঁচু পদের কর্মচারীর বদলে, ধুতি চাদর পরা এই মানুষটিই হয়ে উঠলেন তাঁর জীবনের আদর্শ।
যখন সুভাষচন্দ্র প্রোটেস্টান্ট ইউরোপিয়ান স্কুল থেকে গিয়ে ভর্তি হলেন র্যাভেন শ কলেজিয়েট স্কুলে, তখন বয়স ছিল তাঁর বারো। ১৯০৯ সালে তাকে ভর্তি করা হয় চতুর্থ শ্রেণিতে, এখনকার সিস্টেম অনুযায়ী যেটা সপ্তম শ্রেণি। সুভাষচন্দ্র যে খুবই মেধাবী ছাত্র সেটা প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব প্রথমবার তাঁকে দেখেই বুঝে গেছিলেন। সুভাষের কয়েকদিন আগেই সেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। চারুকে দেখে বেণীবাবুর ধারণা হয়েছিল যে তিনিই ক্লাসে প্রথম হবেন। তারপর সুভাষচন্দ্রকে দেখে সেই ধারণা তাঁর বদলে যায়। চারুকে বলেন, “ভেবেছিলাম তুমিই ফার্স্ট হবে। কিন্তু তোমার একজন কম্পিটিটর এসেছে, দেখেছ?” বেণীমাধবের প্রেডিকশন মিলিয়ে দিয়ে এরপর থেকে সুভাষই ক্লাসে প্রথম হতেন। এ বিষয়ে একটা ঘটনা বলা যায়। স্কুলে ভর্তির সময় সুভাষচন্দ্র সংস্কৃত অক্ষরই চিনতেন না। শুধুমাত্র অধ্যাবসায়ের জেরে বছরের শেষে তিনি সংস্কৃত পরীক্ষায় একশো তে একশো পান। সংস্কৃতের শিক্ষক বিশ্বনাথ কাব্যতীর্থকে ডেকে বেণীমাধব জানতে চাইলেন, তিনি কেন সুভাষকে এত নাম্বার দিয়েছেন। তাতে বিশ্বনাথবাবু উত্তর দেন, একশোর মধ্যে একশো দশ দেওয়া যায়না বলেই তিনি বাধ্য হয়েই মাত্র একশো দিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই বেণীমাধবের অনুসরণে সুভাষ ধুতি আর জামা পরে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলেন, যদিও ছোটোবেলা থেকেই তিনি স্কুলে যেতেন কোট-প্যান্ট পরে। প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব মূলত উঁচু ক্লাসেই পড়াতেন। নিচু ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা তাঁকে এড়িয়ে চললেও সুভাষচন্দ্র অধীর ছিলেন, কখন তিনি প্রধান শিক্ষকের কাছে পড়বেন। তারপর যখন বেণীমাধবের ক্লাস করার সুযোগ পেলেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতেন তাঁর কথা। বেণীমাধব উপদেশ দিতেন মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য। বলতেন নেপোলিয়নের বীরত্বের কথা, ম্যাৎসিনি-গ্যারিবল্ডির দেশপ্রেমের কাহিনি। প্রধান শিক্ষকের বলা এসব কথা সুভাষচন্দ্রকে উদ্বুদ্ধ করত প্রবলভাবে।
১৯০৯ সালের ১১ আগস্ট বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ১১ আগস্ট গ্রামেগঞ্জে ক্ষুদিরামকে স্মরণ করা হত। ১৯১১ সালে সুভাষ ঠিক করলেন, এই তারিখে স্কুলের মধ্যে স্মরণ করতে হবে শহিদ ক্ষুদিরামকে। প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব তাঁকে প্রচ্ছন্নভাবে সমর্থন করেছিলেন। র্যাভেন শ স্কুল আর কলেজের হোস্টেলে উনুন জ্বলল না সেদিন। ছাত্ররা উপবাস করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করতেন আত্মত্যাগী শহিদদের। এদিকে কলেজের এক অধ্যাপক সেটা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিতে কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করল। ইংরেজ শাসকের বিরোধী শহিদদের সম্মান জানানো মানে ইংরেজ শাসিত উপনিবেশে রাজশক্তির প্রতি আনুগত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো। কর্তৃপক্ষ আর বেণীমাধবকে স্কুলে রাখতে চাইলেন না। কটক থেকে তাঁকে বদলি করা হল কৃষ্ণনগরে।
বেণীমাধব যখন শেষদিন সুভাষদের ক্লাসে গেলেন, বিষাদে দুঃখে কান্না উঠে আসছিল সুভাষের বুক থেকে। ক্লাস ভর্তি ছাত্রদের সামনে অনেক কষ্টে সুভাষ কান্না চেপে রেখেছিলেন তখন। যদিও সেদিন স্কুল শেষ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার সময় বারান্দায় দাঁড়ানো বেণীমাধবকে দেখে চোখের জল সামলাতে পারলেন না তিনি। সুভাষকে অঝোরে কাঁদতে দেখে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন বেণীমাধব। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সুভাষের মাথায় হাত রেখে সস্নেহে তিনি বললেন, “সুভাষ, আবার আমাদের দেখা হবে”। পরের দিন বেণীমাধবের বিদায়সভায় সুভাষ পারেননি বেণীবাবুর ভাষণ মন দিয়ে শুনতে, এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তিনি। যখন কটক স্টেশনে বেণীমাধব ট্রেনে উঠলেন, ছাত্ররা ভিড় করে ছিল তাঁকে। ফুলের মালা পড়ানো হল তাঁর গলায়। ছাত্ররা একে একে প্রণাম করল বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে। সুভাষের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বেণীমাধব বললেন, “সুভাষ, তুমি যেন একজন মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারো। ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি”। সুভাষের চোখ জলে ভরে এল।
প্রিয় শিক্ষকের চলে যাওয়া অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ করেছিল সুভাষকে। বেণীমাধব অনেক দূরে চলে গেলেও সুভাষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। বরং চিঠিপত্রে দু’জনের সম্পর্ক আরও বেশি নিবিড় হয়েছিল। যে সব কথা সামনাসামনি তাঁরা একে অপরকে বলতে পারেননি, চিঠিতে সহজেই প্রকাশ করতে পারতেন সেগুলো। প্রিয় শিক্ষককে তাঁর মনের কথা জানাতেন সুভাষ। আর বেণীবাবুও নতুন নতুন চিন্তাভাবনার যোগান দিতে লাগলেন সুভাষের মস্তিষ্কে। বেণীবাবু হেমন্ত নামের এক তরুণকে কটকে সুভাষের কাছে পাঠিয়েছিলেন, যিনি নিজের রাজনৈতিক সংগঠনের বিষয়ে এমন সব তথ্য সুভাষকে জানান, যেগুলো তরুণ সুভাষের মনে দারুণ প্রভাব ফেলে। দেশত্যাগের সময়েও বেণীমাধবের আশীর্বাদ চেয়েছিলেন সুভাষ।
স্বামী বিবেকানন্দ ছাড়া যে ব্যক্তির প্রভাব সুভাষের জীবনে সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন এই শিক্ষক বেণীমাধব দাস। সমস্ত জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের কাজে। বেণীমাধবের দুই মেয়ে কল্যাণী এবং বীণা দু’জনেই ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের অনেক পরে ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতে বেণীমাধব দাসের মৃত্যু হয়।
