বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন : বাঙালির আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার পরিচায়ক

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর হল শিল্পের শহর, শিল্পের আঁতুড়ঘর বললেও ভুল কিছু বলা হয় না। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা শিল্পের অনুরাগী ছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই বিষ্ণুপুর হয়ে উঠেছিল তদানিন্তন বাংলার ‘আর্ট ডিপো’। একদা বিষ্ণুপুরের লণ্ঠন (Bishnupur Lantern) শিল্প পৌঁছে গিয়েছিল অনন্য উচ্চতায়। এক সময় সন্ধ্যা নামলেই বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘর আলোকিত করতো বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন। হয়ে উঠেছিল আভিজাত্য ও বনেদিয়ানার পরিচায়ক। শোভাযাত্রা, অনুষ্ঠান বাড়িতে সমাদৃত হত; কিন্তু কালের নিয়মে শতাব্দী প্রাচীন লণ্ঠন শিল্প এখন অবলুপ্তির পথে। বিজলিবাতির আলোই প্রথম আঁধারে ঠেলে দিয়েছিল লণ্ঠনকে। এখন হাজার একটা বিকল্প রয়েছে মানুষের কাছে, এলইডি থেকে ঝকমকি নানান বাহারি আলো! স্নিগ্ধ, স্থির, নিশ্চল লণ্ঠনের আলোর আর খোঁজ পড়ে না আগের মতো।

বাপ, ঠাকুরদার লণ্ঠন শিল্পকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন দিলীপ গড়াই। একশো বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ছোটোবেলা থেকেই বিষ্ণুপুর ঘরানার লণ্ঠন গড়ছেন দিলীপবাবু।

বিষ্ণুপুরের হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আজ কোনওক্রমে পূর্বপুরুষের এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তেমনই একজন হলেন দিলীপ গড়াই। বাপ, ঠাকুরদার লণ্ঠন শিল্পকে তিনি এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন। একশো বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ছোটোবেলা থেকেই বিষ্ণুপুর ঘরানার লণ্ঠন গড়ছেন দিলীপবাবু। লণ্ঠন নির্মাণ সম্পর্কে বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানালেন, “সবটাই কুটির শিল্প। কোনও মেশিন নয়। হাতেই বানাই। ফর্মা অনুযায়ী টিন কাটি। এক একটা লণ্ঠনে চারটে করে কাচ লাগে। কোনওটার আবার ছটাও লাগে। এরপর কাচকে ফ্রেমে বাঁধতে হয়। ঝালাই করতে হয়। এরকম ভাবে হয় আরকি!”

লণ্ঠনের ভিতরে আলোর উৎস হিসেবে এক সময় কেরোসিন তেলই ব্যবহার হত। দিলীপবাবু বলছিলেন, “এখন কেরোসিন পাওয়ার সমস্যা হয়ে গিয়েছে। আমরাও একটা বিকল্প ব্যবস্থা করেছি। হোল্ডার সিস্টেম করেছি। ইলেকট্রিক আলোই জ্বলে। যেখানে তেল ঢালা হত ওখানে হোল্ডার রেখে দিই। যাতে ক্রেতারা ঘর সাজাবার উপাদান হিসাবে এটা বাড়িতে রাখতে পারে। আরও এক ধরনের লণ্ঠন হচ্ছে এখন, ছটা কাচ দিয়ে একটু বড়ো সাইজের। পুজোর মণ্ডপে ওগুলো খুব চলছে। ওর ভিতরে মাটির প্রদীপ রাখা হয়। সর্ষের তেল দিয়ে জ্বালানো হয়। পুরোটাই ঢাকা। ফলে মাটির প্রদীপও জ্বলল আর প্রদীপ নিভেও গেল না। বিয়ের বাড়ি সাজাতে, কালীপুজো, দুর্গাপুজোয় এর কদর আছে।” 

বিষ্ণুপুর ঘরানার লণ্ঠনের চাহিদা দিন দিন কমছে। দিলীপবাবুর কথায়, “আগে যখন কেরোসিন তেলের খুব ব্যবহার ছিল, তখন প্রচুর খরিদ্দার আসতো। ধরুন কারও বাড়িতে ছটা ঘর, তার বাড়িতে কমপক্ষে আটটা লণ্ঠন থাকতো। এখন ব্যবহার কমে গেছে। এটা বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। প্রায় ৭০-৮০টা পরিবার ছিল, এই লণ্ঠন বিক্রি করেই তাঁদের সংসার চলতো। সবার হয়তো দোকান ছিল না। বাড়িতেই বানাতো। ছেলেরা মেয়েরা সবাই মিলে বানাতো। এখন আটটা পরিবারও হয়তো লণ্ঠন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নয়। আমাদের নিজেদের এক সময় কর্মচারী ছিল। খদ্দের সামাল দিতে পারতাম না। প্রত্যেক দিন ১২৬টা করে লণ্ঠন বানাতাম। এখন দিনে বারোটা করে লণ্ঠন বানাই তাও বিক্রি করতে অসুবিধা হয়ে যায়। আমায় একজন কারিগর সাহায্য করে, সকাল সাতটা থেকে রাত্রি একটা অবধি কাজ করি। সারাদিন কাজ করে বারোটা করে লণ্ঠন বানাতে পারি।”

দিলীপবাবু বলছিলেন, লণ্ঠনের চালায় অর্থাৎ মাথায় একটু নকশা করে দিলে দেখতে সুন্দর লাগে। কখনও বিষ্ণুপুরের মন্দিরের ছবি রাখা হয়, দেখতেও ভালো লাগে, বিক্রিও হয়। শিল্পীদের কাছ থেকে লণ্ঠন কিনে এখন আবার অনেকে ছবি এঁকে বিক্রি করেন। লণ্ঠনে যে কাচ থাকে তাতে দশাবতার তাসের ছবি এঁকেও বিক্রি হচ্ছে। বিষ্ণুপুরে পোড়া মাটির হাট হয়। এখন সপ্তাহে একদিন হাট বসে, শনিবারে। ওই হাটেও বিক্রি হয়। চাহিদা নেই লণ্ঠনের। তবে পর্যটন মরশুমে বিক্রি হয়। বিষ্ণুপুরে তো সবাই বেড়াতে যান। আশ্বিন মাস থেকে বাইরের পর্যটকেরা ঘুরতে এলে খুচরো বিক্রি হয়। তিনি আরও বলছিলেন, “এই কাজটা আমি ছোটো থেকে করে আসছি। কাজটাকে ভালোবাসি বলে এটা নিয়েই আছি। এখনকার প্রজন্মের ছেলেরা আসবে না। এটা খুব ধৈর্য্যের কাজ, সেটা এখনকার লোকেদের নেই। আমার ৬৩ বছর বয়স, যতদিন পারবো ততদিন করবো। যাঁরা এখনও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, এমন চার-পাঁচজন আছি। সবারই ষাটের উপর বয়স। এরা যতদিন থাকবে চলবে, তারপর এই শিল্পটাই শেষ হয় যাবে।”

একদা আঁধার নামলে লণ্ঠন, হ্যারিকেন, কুপি, হ্যাজক-ই ছিল ভরসা। শৌখিন গড়নের জেরে বিষ্ণুপুরী লণ্ঠনের কদর ছিল। হয়ে উঠেছিল অপরিহার্য। তারপর বিদ্যুৎ বিপ্লবের কল্যাণে ধীরে ধীরে এরা হারিয়ে গেল। অপরিহার্যতা হারিয়ে মানুষের মর্জির উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়লো বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন।

একদা আঁধার নামলে লণ্ঠন, হ্যারিকেন, কুপি, হ্যাজক-ই ছিল ভরসা। শৌখিন গড়নের জেরে বিষ্ণুপুরী লণ্ঠনের কদর ছিল। হয়ে উঠেছিল অপরিহার্য। তারপর বিদ্যুৎ বিপ্লবের কল্যাণে ধীরে ধীরে এরা হারিয়ে গেল। অপরিহার্যতা হারিয়ে মানুষের মর্জির উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়লো বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন। হয়ে উঠল নিছক ঘর সাজানোর উপাদান। ধাক্কা খেল বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন শিল্প। নতুন প্রজন্ম আর আসেনি এই শিল্পে। অধুনা বিষ্ণুপুরের চার-পাঁচজন প্রবীণ শিল্পী একে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁদের ছুটি হলেই ইতিহাসে পরিণত হবে বিষ্ণুপুরী লণ্ঠন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দ্য বেঙ্গল স্টোর (The Bengal Store) তাদের দক্ষিণ কলকাতার বিপণিতে ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপুরের লণ্ঠন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। শুধুমাত্র বিক্রিই নয়, এই বিপণির নানান কোন সাজানো হয়েছে এই লণ্ঠনের আলোয়।

Written by