
বাংলা থিয়েটারের মধ্যে অদ্ভুত এক ধরনের গ্রহণ-বর্জনের ছাঁকনি আছে। বাংলা থিয়েটার বলতে আমি এখানে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কথা বলছি। বিজন ভট্টাচার্য-কে আমরা সে রকমই আমাদের পরিচিত বা চর্চিত বৃত্তের বাইরেই সসম্মানে সরিয়ে রেখেছি। তাঁর বৈশিষ্ট্য বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য যে বিদগ্ধ পণ্ডিত মানুষটি ধারবাহিকভাবে লেখনী ব্যবহার করে চলেছেন, তিনি হলেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। কঠিন হলেও আসল কথা বলি, বিজনবাবুর কাজ আমাদের সেভাবে প্রভাবিত করত না, প্রণোদিত করত না।
বিজনবাবুর বিষয় ভাবনার সঙ্গে মেলে না তাঁর প্রয়োগ ভাবনা। জীর্ণ পুরাতন মঞ্চ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নতুন চিন্তার নাটক! নবান্ন-এর মঞ্চ নির্দেশেও সেই পশ্চিমি থিয়েটারের কাঁচা স্বাভাবিকতাবাদের অনুকরণই চোখে পড়ে।
গণনাট্য সংঘ ১৯৪৩-এ মঞ্চস্থ করে ‘আগুন’, ১৯৪৪-এ ‘জবানবন্দী’ এবং ‘নবান্ন’। ‘নবান্ন’ শ্রীরঙ্গমে সাতদিন, পরে বিভিন্ন মঞ্চ এবং সম্মেলন ইত্যাদিতে অন্তত চল্লিশবার অভিনীত। ১৯৪৫-এ রচিত ‘জীয়নকন্যা’ একবারই মাত্র মঞ্চস্থ হয় রংমহলে ১৯৫০ সনে। উনি নিজেই বলছেন ‘প্রযোজনা ভালো হয়নি, নয় তো ওই ফর্ম নিয়ে আরও এগোতাম।’ কুড়ি বছর আগের একাঙ্ক ‘মরাচাঁদ’ পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল ১৯৪৬-এ। ’৫২ পর্যন্ত চলেছিল অভিনয়। ১৯৪৭-এ রচিত ‘অবরোধ’ এর মঞ্চায়নের কোনও খবর নেই। ক্যালকাটা থিয়েটার-এর প্রথম প্রযোজনা ‘কলঙ্ক’ (১৯৫১)। মঞ্চায়নের খবর নেই ‘জননেতা’ (১৯৫১) বা ‘জতুগৃহ’ (১৯৬২) নাটক দুটিরও।
রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁকে বলছেন ‘অযত্নে রুক্ষ প্রতিভাবৃক্ষ’। প্রথমে গণনাট্য সংঘ, পরে তাঁর নিজের গ্রুপ, ক্যালকাটা থিয়েটার এবং কবচ কুণ্ডল। প্রথমটাতে অধিক সন্ন্যাসীর গাজন, গ্রুপ দুটির ব্যাপারে বলা যায় একটি নাট্যদল গড়ে তোলা এবং সক্রিয়ভাবে টিকিয়ে রাখার সংগঠনক্ষমতা বা কৌশলের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে। তার থেকেই শৃঙ্খলাহীনতার জন্ম। সংগঠন এলোমেলো হলে সৃজনকর্মেও তার ছাপ পড়ে। তাই, যতই দুর্ভাগ্যজনক এবং ক্ষতিকর হোক না কেন, ঐ সময়ের নাট্যকর্মীদের ভাবনার জগতে বা মননে তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারল না বিজনবাবুর প্রযোজনা, একক অভিনয় প্রতিভায় যেমন পেরেছেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণলতা’ বা ‘পদাতিক’ ছবিতে, কিংবা উৎপল দত্তর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মঞ্চ-প্রযোজনায়।
বিজনবাবুর বিষয় ভাবনার সঙ্গে মেলে না তাঁর প্রয়োগ ভাবনা। জীর্ণ পুরাতন মঞ্চ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী নতুন চিন্তার নাটক! নবান্ন-এর মঞ্চ নির্দেশেও সেই পশ্চিমি থিয়েটারের কাঁচা স্বাভাবিকতাবাদের অনুকরণই চোখে পড়ে। ‘নেপথ্যে একটা বড় গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ, মড় মড় মড়াৎ। কাঁচাপাতা পল্লব, ডাল সব ছিঁড়ে এসে পড়ে উঠোনে। দোচালাখানা নড়তে থাকে ঘন ঘন, যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে আর কী। …দেখতে দেখতে দোচালাখানা ভেঙে পড়ে প্রধানের।’ এ সবই তো পেশাদার রঙ্গমঞ্চের তৃতীয় শ্রেণির অনুকরণ!
রুদ্রপ্রসাদ বোধহয় ঠিকই বলেছেন, বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন ‘দেবতার মতো প্রতিভাবান, আর হয়তো শিশুর মতো অগোছালো।’ ১৭ জুলাই, বিজনদার জন্মদিনে আমার প্রণাম গ্রহণ করবেন। ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন।

