
নদীতে ভাটির টানে নৌকো বেয়ে উদাস মনে গান গেয়ে ওঠেন মাঝি
নদীর দেশ বাংলাদেশ। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা – যেন গোটা বাংলাদেশের শরীরে বয়ে চলেছে শিরা-ধমনীর মতো। নদী থাকলে তো নৌকোও থাকবে এবং নৌকো চালাতে গেলে দরকার হবে মাঝির। বাংলাদেশের নদীগুলোর স্রোত, ঢেউয়ের ওঠানামা, সবের মধ্যেই রয়েছে সংগীতের বিস্তার। তাই বাংলাদেশের মাঝিরা সবাই খুব ভালো গাইতে পারেন। বিশাল নদীতে ভেসে চলা মাঝিদের গান থেকেই ভাটিয়ালির উদ্ভব। যে কারণে ভাটিয়ালি গানে ‘নৌকো’, ‘দাঁড়’, ‘মাঝি’, ‘গুণ’ এই শব্দগুলি খুব বেশি ব্যবহৃত হয়। তার সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের দুঃখ, বিরহ, ভালোবাসা, অভিমান, বেঁচে থাকার সংগ্রাম – এগুলোও ফুটে ওঠে এই ধরনের গানে। বাউলরা মনে করেন, তাঁদের প্রকৃতিতত্ত্ব ভাগের গান হল ভাটিয়ালি।
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া – এই সাতটি জেলার চল্লিশটি উপজেলা জুড়ে আছে ভাটি অঞ্চল। এখানে ছ’মাস জল থাকে, আর ছ’মাস যায় শুকনো। প্রকৃতির সৌন্দর্য এখানে অপরূপ, আর ভাটি অঞ্চলের বেশিরভাগ লোকেরই পেশা মাছ ধরা কিংবা নৌকো চালানো। ভাটিয়ালি গান এই ভাটি অঞ্চলেরই লোকঐতিহ্য। বহু মানুষের মত হল, ‘ভাটি’ থেকেই ‘ভাটিয়ালি’ নামটা এসেছে। অবশ্য ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝিমাল্লাদের মধ্যে ভাটিয়ালি গানের চর্চা রয়েছে। ভাটিয়ালি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে আরেকটা মত হল, নদীতে ভাটার টানে যখন নৌকো নিজে থেকেই এগোতে থাকে, তখন মাঝিকে আর পরিশ্রম করতে হয় না। সেই অবসরে উদাস মনে নিজেদের মতো করে মাঝিরা গান গেয়ে ওঠেন। ভাটার সময়ে যে গান, সেটাই ভাটিয়ালি।
একটা সময়ে ভাটি অঞ্চলের লোকজন নৌকোয় চেপে অনেক দূরের শহরে ব্যবসা করতে যেত। পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে বহু দিন নদীতে ভেসে থাকতে হত তাদের। চারদিকে জল আর জল। জলের দু’দিকে কত গ্রাম, চাষের জমি, বাড়িঘর, কত বিচিত্র সব মানুষ। আর মাথার ওপরে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ। এই বিশালতাই নৌকোযাত্রীদের মনে সুরের ঝংকার তুলত। প্রথম প্রথম ভাটিয়ালি গানে বাদ্যযন্ত্রের কোনো ব্যবহার হত না। পরে লোকজ কিছু বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে এই ধরনের গান গাওয়া হতে থাকে। ভাটিয়ালি গানের বৈশিষ্ট্য হল দীর্ঘ টান আর লয়ের প্রয়োগ। এই গান মূলত এককভাবেই গাওয়া হয়ে থাকে। লৌকিক জীবনের নানা বিষয়ের মোড়কে গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন লুকিয়ে থাকে ভাটিয়ালি গানের মধ্যে।
