ওগো লুচি তুমি মান্য ত্রিভুবনে

ডায়েট-এর যুগেও অমলিন বাঙালির লুচি-প্রেম

“তব সহোদর ভাই রুটি ও পরোটা,/ আর যে জন জানে না বলে পর ওটা,/ ডালপুরি ব্যাটা সে যে তোমার জ্যাঠা,/ ভুলিব বল গো কেমনে,/ ওগো লুচি তুমি মান্য ত্রিভুবনে।।”

রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, রসরাজ অমৃতলাল বসুর এই বিখ্যাত পুরাতনী গানই সবটা বলে দেয়। গোল ঘিয়ে রঙের, উপরে একটু লালচে আভার সঙ্গে গা দিয়ে গড়িয়ে পড়া তেলের চকচকে আভরণে সজ্জিতা “লুচি”-র সঙ্গে পরিচয় নেই এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না বোধহয় ভূভারতে। বিয়েবাড়ির জলখাবার থেকে শ্রাদ্ধবাড়ির মধ্যাহ্ন ভোজে অবলীলায় জায়গা পেয়েছে যে খাবারটি, তা হল লুচি। যতই থাকুক পরোটা, কচুরি বা ডালপুরি, জনপ্রিয়তার দৌড়ে সবক’টিই দ্বিতীয় সারিতে। তার অন্যতম কারণ, আমিষ হোক বা নিরামিষ, যে কোনো পদের সঙ্গেই তার জমাটি বন্ধুত্ব। তাকে যেখানেই বসানো হবে সেখানেই সে আকর্ষণের মধ্যমণি।

“সামাজিক শুভ কার্য্য বিবাহ/ তোমা বিনা কিছু হয় না নির্বাহ,/ আর পার্বণে পূজায় রাজায় প্রজায়/ আনে তোমায় ভবনে।/ তুমি অরুচির রুচি, মুখমিষ্টি শুচি/ খাই এ ধন্য জীবনে”

আজও শীতের সকালে বা রোববারে, কালোজিরে ফোড়নে সাদা আলুর চচ্চড়ি বা ছোলার ডালের সঙ্গে লুচিই হল বাঙালি বাড়ির প্রাতরাশে প্রথম পছন্দ। তবে একটা সময় ছিল, যখন বাঙালিদের রোজকার জলখাবার বলতে লুচি ছাড়া আর কিচ্ছুটি ছিল না। অতিথি আপ্যায়নে লুচির বিকল্প আজও ভাবতে পারেন না অনেকেই। শুধু কি তাই? ব্রত বা উপোসের শেষে লুচিই ব্রতীদের অন্যতম ভরসা। অন্যদিকে যাদের নেমতন্ন বাড়িতে অন্ন খাওয়া চলে না বা বিধিনিষেধ, তাদের কাছেও লুচি ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’।

লুচিভক্তদের তালিকায় কে নেই? বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বিদ্যাসাগর মশাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ পছন্দ ছিল সন্ধ্যার জলখাবারে লুচির সঙ্গে মধু। বিদ্যাসাগর মশাই ভালোবাসতেন বাসি লুচি খেতে। শরৎচন্দ্রের লুচির প্রতি অনুরাগ তাঁর প্রতিটি উপন্যাসের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে।

কিন্তু বাঙালি হেঁসেলে লুচি কবে থেকে জায়গা পেল, তা কিন্তু আজও সঠিকভাবে বলা যায় না। চিকিৎসাবিদ্যার জনক সুশ্রুতের শিষ্য এবং পালযুগের বিখ্যাত চিকিৎসক চক্রপাণি দত্ত-র ভেষজ শাস্ত্রের উপর লেখা বই “দ্রব্যগুণ”-এ প্রথম লুচির উল্লেখ পাওয়া যায়। “শঙ্কুলি” নামে উল্লেখ ছিল প্রথম লেখা সেই ডাক্তারি পুঁথিতে। সেখানে লেখা আছে গমের গুঁড়োকে ঘি দিয়ে মেখে, লেচি বেলে গরম ঘিয়ে ভেজে শঙ্কুলি বা লুচি তৈরি করার পদ্ধতি। সেই হিসেবে লুচিকে বাংলার খাবার হিসেবেই ধরা যেতে পারে। “বাঙালির খাদ্যকোষ” রচয়িতা মিলন দত্ত-র মতে লুচি হল সবচেয়ে জনপ্রিয় নোনতা খাবার। এত সব তথ্য জানার পরে বলতেই হয় লুচি বাঙালির একান্তই আপন সৃষ্টি।

এপার-ওপার বাংলায় সেই লুচি সমান জনপ্রিয়তা পেলেও লুচির আকারে কিন্তু বিভেদ ছিল। এপার বাংলায় লুচি হতো ছোটো আকারের সাদা ধবধবে, ফুলকো ফুলকো। সঙ্গে অবশ্যই কাঁচা লঙ্কা ও কালোজিরে ফোড়নের রং-বিহীন সাদা আলুর চচ্চড়ি। আর ওপার বাংলায় লুচি একটু ঘিয়েটে রঙের, আকারে সামান্য বড়ো। সঙ্গে ছোলার ডাল বা নিরামিষ আলু কুমড়োর ছক্কা। এখনকার দিনের স্বাস্থ্য সচেতন বাঙালির সানফ্লাওয়ার বা সাদা তেলে নয়, তখন লুচি ভাজার জন্য ব্যবহৃত হতশ্রী বা বিশ্বেশ্বর ঘি, যা লুচি ভাজার জন্যই নিবেদিত ছিল। এক আঙুলের আলতো খোঁচায় লুচির পেট ফাঁটিয়ে তার মধ্যে থাকা বাষ্পে ভরে উঠত নাসারন্ধ। আহা! সেই স্বর্গীয় ঘ্রাণ ক্ষিদের তীব্রতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলে আক্ষরিকভাবেই “ঘ্রাণেনম অর্দ্ধভোজনম” হয়ে দাঁড়াতো। এখনও যে এই প্রথা নেই তা বলা চলে না। তবে আয়েশ করে লুচি খাওয়ার সময়টা কমে এলেও শহুরে কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে লুচির প্রতি ভালোবাসায় কিন্তু ঘাটতি পড়েনি। 

মা দুর্গার ভোগ হোক বা বিপদতারিণী ব্রত, শেষে তেরোটা লুচি খাওয়ার নিয়ম কোথাও বাঙালির লুচিপ্রেমকেই নির্দেশ করে। কারণ সম্পূর্ণ নিরামিষ উপাদানে তৈরি লুচির সঙ্গে বেগুনভাজা, ফুলকপির তরকারি, আলু ছোলা কুমড়োর ছক্কা বা ছানার ডালনা যাই হোক না কেন, কারোর সঙ্গেই জুটি বাঁধতে আপত্তি নেই তার। সেই সঙ্গে মিহিদানা, বোঁদে বা রসগোল্লার সঙ্গেও তার যুগলবন্দি সুপারহিট। বাংলার বাইরের রাজ্যে উপোস ভাঙা হয় যেখানে সাবুর বড়া বা অন্যান্য নোনতা খাবার দিয়ে,  সেখানে বাঙালি তার প্রিয় লুচিকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতেই পারেনি। নানা পদের সঙ্গে জুটি বাঁধলেও, লুচি-আলুরদম জুটির জনপ্রিয়তা একবারে লতা মঙ্গেশকর আর কিশোর কুমার জুটির মতোই কালজয়ী। আমিশাষীদের জন্য লুচির সঙ্গে পাঁঠার মাংসের জুটিও কিন্ত একেবারে রাজকীয় ভোজ।

বর্তমানে পিৎজা, বার্গার বা মোমো এসে যতই বিশ্বায়ন ঘটাক না কেন, লুচির আভিজাত্য বা বিভিন্ন পদের সঙ্গে তার ভার্সেটাইল জোটবদ্ধনকে কোনভাবেই স্হানচ্যুত করতে পারেনি। বরং বাংলার বাইরে বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে লুচি জাতীয় মান অর্জন করেছে।

লুচির জনপ্রিয়তা নিয়ে একখানা আস্ত বই লেখা যাবে। লুচিভক্তদের তালিকায় কে নেই? বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বিদ্যাসাগর মশাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ পছন্দ ছিল সন্ধ্যার জলখাবারে লুচির সঙ্গে মধু। বিদ্যাসাগর মশাই ভালোবাসতেন বাসি লুচি খেতে। শরৎচন্দ্রের লুচির প্রতি অনুরাগ তাঁর প্রতিটি উপন্যাসের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর উপন্যাসের সব নায়িকারা যত্ন করে লুচি ভাজতে পটু। শ্রীকান্ত যখনই রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা করতে যেত তখনই রাজলক্ষী তাঁকে লুচি ভেজে যত্ন করে পরিবেশন করতো। বিভূতিভূষণের উপন্যাস “ইচ্ছামতী”-তে তিলুর খোকা প্রথমবার লুচি খেয়ে ভারী আশ্চর্য হয়ে গেছিলো। সেই দৃশ্যটিতে বাঙালির লুচিপ্রেমের কথাই যেন তুলতে ধরতে চেয়েছেন লেখক বিভূতিভূষণ। আবার ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর হাজারি ঠাকুর তাঁর লুচি ভাজার বিশেষ হাতাটি লুকিয়ে রাখতেন খড়ের চালে। এই সমস্ত তথ্য বা কাহিনি এবং    সাহিত্যিকদের রচনায় লুচির প্রতি ভালবাসাই কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে বারবার। 

আর একটা ঘটনা না বললে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমাদের ছোটোবেলায় জন্মদিনের নেমন্তন্ন মানেই লুচি, ঘুগনি আর পায়েস। বাড়িতে লুচি খেলেও জন্মদিন বাড়ির লুচির স্বাদ যেন ছিল এক্কেবারে আলাদা। একবার আমাদের পাড়ায় এক হিন্দুস্থানি পরিবারে ছেলের জন্মদিনের সন্ধ্যায় লুচি আর মাংসের নিমন্ত্রণ ছিল। সেদিনের সেই সন্ধ্যায় মাংসের সঙ্গে লুচির অন্যবদ্য যুগলবন্দি এতটাই মনলোভা ছিল, যে আজ এতবছর পরেও স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবার যেন সেই স্বাদকোরকে ফিরে পেলাম। বর্তমানে পিৎজা, বার্গার বা মোমো এসে যতই বিশ্বায়ন ঘটাক না কেন, লুচির আভিজাত্য বা বিভিন্ন পদের সঙ্গে তার ভার্সেটাইল জোটবদ্ধনকে কোনভাবেই স্হানচ্যুত করতে পারেনি। বরং বাংলার বাইরে বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে লুচি জাতীয় মান অর্জন করেছে। তাহলে এ কথা বলাই যায় যে, বিশ্বায়ানের যুগেও লুচির কৌলিন্য এখনও ম্লান হয়নি বরং আর বেড়েছে। আর এই কারণেই আশা করা যায়, বাঙালির লুচির প্রতি ভালবাসা আগামী প্রজন্মও একইভাবে বয়ে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকে।
 

Developed by DXDasia