ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাটা সযত্নে লেখা হলেও বাংলা ভাষায় উদাসীনতা
বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে বাংলার নম্বরটা কম দেখে ছাত্রের মা হঠাৎ এক গুরুতর প্রশ্ন করে বসলেন, “স্কুলে কেন বেঙ্গলিটা পড়ায় না ইংলিশে?” – কবি অপূর্ব দত্তের ‘বাংলা টাংলা’ কবিতার এই শেষ পংক্তিটি যেন আজকের সময়ের এক জীবন্ত দলিল। সময়ের স্রোতে ধাক্কা খেতে খেতে আমরা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যে সময়ে এ প্রশ্ন মোটেই আর অবাক করায় না আমাদের! পথে-ঘাটে এখন ইংরেজি বলাই দস্তুর।
ইদানীং বাংলা ভাষা যেন দেওয়ালে টাঙানো কোনো এক আদ্যিকালের পুরোনো ছবির মতো। বছরে ওই একটিবার ‘ভাষা দিবস’ উপলক্ষে তাকে দেওয়াল থেকে নামিয়ে খানিক ফুল-মালা দিয়ে, আবার দেওয়ালে তুলে রাখা হয়। আজকের প্রজন্মের বাবা-মায়েরা কি সত্যিই বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করান ছেলে-মেয়েদের? নাকি তাঁরা বিশ্বাস করেন, সন্তানরা কথায় কথায় ইংরেজি বলতে না পারলে স্মার্টনেস থাকে না এ যুগে! পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার মানুষেরা কি নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে এমন অনীহা দেখান? বাংলা জুড়ে বাংলা ভাষার দুরাবস্থা এখন রোজকার জীবনে খুবই পরিচিত ঘটনা। বুদ্ধিজীবী মহলে বাংলা ভাষার অবহেলা নিয়ে আলাপ আলোচনা, বিতর্ক তুঙ্গে অথচ তাতে কি বদলাচ্ছে সামগ্রিক চিত্রটা?
ইতিহাস বলে, ছোটোবেলায় পাঠশালায় যাওয়ার সময় পথের দু’ধারের মাইলফলক দেখেই নাকি সংখ্যা চিনেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সেই একই কায়দায় আজকের দিনে যদি কোনও শিশু কলকাতা মেট্রোতে বাংলা শেখার চেষ্টা করে তাহলে সম্ভবত তার বাংলা শিক্ষার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কলকাতা মেট্রো রেলের বিভিন্ন স্টেশন বা রেকে ব্যবহৃত বাংলা বানানের করুণ দশা দেখলে এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। প্ল্যাটফর্মে বা ট্রেনের ভিতরে বাংলা বানানের বহরে ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসা অবাধ্য ছাত্রকেও সহজেই হার মানিয়ে দিয়েছেন মেট্রো কর্তৃপক্ষ। উত্তরে দক্ষিণেশ্বর থেকে দক্ষিণে কবি সুভাষ পর্যন্ত অধিকাংশ স্টেশনে লেখা বাংলা ভাষা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে, চোখ কপালে উঠতে পারে আপনারও। বেশিরভাগ স্টেশনেই যা বানান লেখা হয়েছে তা দেখলে যে কেউ সহজেই ভুলতে বসতে পারেন আসল বানানটাই।

নিত্যদিন যাতায়াতের পথে বাংলার গর্ব খোদ কলকাতা মেট্রোতেই এমন অজস্র বাংলা বানানে ভুলের বহর দেখে লজ্জায় মুখ ঘোরাচ্ছেন বহু সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী। কেউ কেউ আবার ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করছেন আসল বানানটি। যেকোনও মেট্রো স্টেশনের গেট থেকে শুরু করে প্ল্যাটফর্ম বা রেকের ভিতরে যাত্রীদের সুবিধার জন্য তিনটি ভাষায় লেখা থাকে বিভিন্ন নাম এবং নির্দেশিকা। তবে প্রায় অধিকাংশ স্থানে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাটা সযত্নে লেখা হলেও উপেক্ষিত শুধু বাংলা ভাষাই। প্রথম প্রথম দেখলে মনে হতে পারে নেহাতই কোনও বিক্ষিপ্ত একটি ভুল বা সাধারণ বানান ভুল। কিন্তু দমদম থেকে নিউ গড়িয়া যাত্রা করলে চোখে পড়বে একই ভুল বানান ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় সমস্ত জায়গায়। নিত্যযাত্রী পৌলমী সেনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “বাংলা নিয়ে আমাদের অনীহা যেন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আসলে আজকাল বানান নিয়ে কেউই বিশেষ ভাবে না, পাশেই ইংরেজি আর হিন্দি ভাষার ব্যাখ্যা দেখে বাংলাটা আঁচ করে নেয়। বাঙালি হিসেবে এটা সত্যিই লজ্জার।”
‘দুই কামরার সংযোগস্থলে দাঁড়ানো নিষেধ’ — যেখানে ‘সংযোগ’ বানানটাই ভুল। ‘প্রবীণ নাগরিক’, ‘দাহ্য ও বিস্ফোরক’, ‘বিপজ্জনক’, ‘পাশাপাশি’, ‘গুটখা’, ‘পরিত্যক্ত’ ইত্যাদি অজস্র বানান ভুলে যে কেউ আঁতকে উঠতে পারেন, তাতে সন্দেহ নেই। বছরের পর বছর ধরে এমনই অজস্র ভুল বাংলা বানান ব্যবহার হয়ে আসছে কলকাতা মেট্রোর বিভিন্ন স্টেশন এবং কামরায়। এছাড়া যদি আধুনিক বানানবিধির (সংসদ অথবা বাংলা অকাদেমি) প্রসঙ্গ আনা হয় তবে তো কোনো কথাই নেই। তবে কি এসবই বাংলা ভাষার প্রতি মেট্রোরেলের উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ? প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
কলকাতা মেট্রোর লোকো পাইলট সুব্রতবাবু বঙ্গদর্শনকে জানান, “মেট্রো পরিষেবার ক্ষেত্রে এই সমস্ত দিক এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সংস্থা দেখে থাকে, কিন্তু ক্রস চেক করার লোক নেই। তাড়াহুড়ো করে টাঙিয়ে দিলেই হল। তার ওপর আবার একবার টাঙানোর পর দ্বিতীয়বার পরিবর্তনের কথা বললে তো আর কথাই নেই! হচ্ছে, হবে এই করে বছরের পর বছর ঘুরে যায়!”

ইস্ট–ওয়েস্ট মেট্রোর নতুন শাখা শিয়ালদহ স্টেশনেও দেখা গেল গোড়ায় গলদ। এখানে স্টেশনগুলির যে নাম বাংলায় লেখা হয়েছে তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বানান ভুল। ঝাঁ চকচকে স্টেশন, এসি কামরা, লাইট, ফ্যান, মনিটর কোথাও কিছুতে কমতি নেই, অথচ আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলা ভাষাটিই। কোথাও ‘স্টেশন’ হয়ে গেছে ‘স্টেশান’, কোথাও ‘সল্টলেক স্টেডিয়াম’ বানানে ‘য়’-এর জায়গায় ‘য’। এখানেই শেষ নয়। ‘প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে গিয়েছে ‘প্যাটফর্ম’। ট্রেনের ‘ছাদে’ উঠবেন না লিখতে গিয়ে লেখা হয়েছে ট্রেনের ‘ছাতে’ উঠবেন না। শুধু কলকাতা মেট্রো নয়, লোকাল অথবা এক্সপ্রেস ট্রেনেও বাংলা বানানের দুর্দশার শেষ নেই। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় নেট দুনিয়ায় তোলপাড় পড়েছিল ‘তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস’ বানানের বিভ্রান্তিতে। যদিও তাড়া খেয়ে তড়িঘড়ি বদল হয়েছে সেই ভুল বোর্ডটি।

রেলের যে বাংলাটা ঠিক আসেনা, এ যেন চোখে আঙুল দিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেরাই বুঝিয়ে দেয়। সাজগোজ আর প্রযুক্তির দিকে নজর দিতে গিয়ে বাংলা বানানের শিক্ষা যে তলানিতে এসে ঠেকেছে একথা নতুন করে বলে দিতে হয় না। তবে এ দায়ভার কি শুধুই রেল কর্তৃপক্ষের? নাকি এ দায় বাঙালি জাতির? আজকের রেলের বানান নিয়ে উদাসীনতা কি বাঙালির বাংলা ভাষার প্রতি সামগ্রিক উপেক্ষারই ফলশ্রুতি নয়?
অমর্ত্য সেন যতই বলুন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই আমাদের বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যতই দাবি করুন, ‘আমি তো স্কুলে বাংলায় পড়েছি, কোনও ক্ষতি হয়নি তো’। আসলে একটা কৃত্রিম আশঙ্কার গভীরে আমরা সবাই নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি। বাংলা ভাষা আমাদের বিদেশ যাওয়া সুনিশ্চিত করতে পারবে তো? আমাদের উচ্চ জীবিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক তুল্যমূল্য এমন এক দাঁড়িপাল্লায় ঝুলছে, যার তুলাদণ্ডটি ধরা আছে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বনেদিয়ানায়। অথচ মাতৃভাষার শিকড় দুর্বল হয়ে গেলে আমাদের বাণিজ্যে লক্ষ্মীর বসতি অসম্ভব। ইংরেজির প্রতি এই অতিরিক্ত প্রীতি অভিভাবক শ্রেণির মধ্যে আত্মশ্লাঘা বাড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই শ্লাঘায় বাড়ির ছোটো শিশুটির মধ্যে ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়ার, কিংবা ‘অপু–দুর্গা’র ট্রেনগাড়ি দর্শনের দৌড় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের ‘পথের পাঁচালি’ থেকে। কোনো এক সীমাহীন যান্ত্রিকতার জন্ম হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। অথচ ২০১১ সালের জনগণনা রিপোর্ট বলছে, ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার ভাষা কিন্তু বাংলা। কিন্তু হায়, তা সত্ত্বেও সে আজ কেবলই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তাই ইউনেস্কোর তরফে ২০১০ সালে বাংলা ‘পৃথিবীর সব চেয়ে মিষ্টি ভাষা’-র স্বীকৃতি পেলেও তার ব্যবহারে ভারতীয় নবীন বাঙালি প্রজন্মের বৃহদাংশের এত অনীহা দেখে আশঙ্কাই হয়, এই বুঝি বাংলা ভাষাকে তারা কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিল।
*মতামত লেখকের নিজস্ব