বিশ্বকাপের রাশিয়ায় বাঙালি খাবার

খোদ বিশ্বকাপের দেশে খাবারের প্লেটে পরিবেশন করা হচ্ছে বাংলার ভাত-ডাল, মাছের ঝোল

গোল…গো…ল…ল…ল। মাঝরাতে যদি এধরনের আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে যায়, চমকাবেন না। এমনটা হামেশাই ঘটবে আগামী প্রায় এক মাস। ফুটবল পাগল বাঙালির ঘরে ঘরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে রাত জাগার পালা। রাস্তায় রাস্তায় উড়ছে প্রিয় দেশের পতাকা। আবার কোথাও চায়ের দোকানও সেজে উঠেছে প্রিয় টিমের জার্সির রঙে। আড্ডার ঠেক, অফিস ক্যান্টিন, বাসে ট্রামে, রাস্তঘাটে সর্বত্র একটাই আলোচনা– ফুটবল, ফুটবল। এইভাবে বাংলার মানুষ যখন ফুটবলাক্রান্ত ঠিক সেইসময় সুদূর রাশিয়ায়, খোদ বিশ্বকাপের দেশে খাবারের প্লেটে পরিবেশন করা হচ্ছে বাংলার ভাত-ডাল, মাছের ঝোল, মাছের কোর্মা, মাংসের শিঙাড়া আর মিষ্টি। এ যেন রাশিয়ায় বসে বাংলার স্টাইলে বিশ্বকাপ দেখার আনন্দ।

ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির এক অন্যধরনের আবেগ ও উন্মাদনা। আর এই উন্মাদনাকেই সুদূর রাশিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন বাংলার দম্পতি প্রদ্যুৎ মুখার্জি ও সুমনা মুখার্জি। এমনিতে, যে দেশে বিশ্বপকাপ হচ্ছে, সেখানে ফুটবল জ্বর তো থাকবেই। কিন্তু প্রদ্যুৎ-সুমনার পরিবেশন করা এই উন্মাদনার চরিত্র খাঁটি বাঙালি। ফলে, বিদেশ ফুটবল দেখতে গিয়েও বাঙালিরা পাচ্ছেন ঘরের রান্নার স্বাদ। শুধু বাংলারই নয়, থাকছে ভারতে অন্যান্য রাজ্যের রান্নাও। মস্কোর অত্যন্ত পরিচিত ও সম্ভ্রান্ত এলাকার এই রেস্টুরেন্টকে এখন ‘মিনি ভারত’ও বলা চলে, বিশেষত বিশ্বকাপের মরসুমে।  

কলকাতার রাজাবাগান অঞ্চলের বাসিন্দা প্রদ্যুৎ মুখার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন রাশিয়ার টুলা স্টেট ইউনভার্সিটিতে। তখন অবিভক্ত রাশিয়া। পড়াশুনা করতে গিয়েই প্রথম প্রেমে পড়েন বিখ্যাত লেখক লিও টলস্টয়ের জন্মভিটে টুলা’র। এই অঞ্চলকে ভালোবেসে প্রদ্যুৎ এখানেই শেষপর্যন্ত থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু করেন নিজের ব্যবসা। তারপর ২০০১ সালে খিদিরপুরের বাসিন্দা সুমনাকে বিয়ে। তারপর থেকে রাশিয়াই এই দম্পতির স্থায়ী বাসা।

বিয়ের পর প্রদ্যুৎ ও সুমনার লড়াই ছিল বিদেশে মাটিতে ব্যবসার ভিত্তি দৃঢ় করার। প্রদ্যুৎ প্রথমে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে ডিলারশিপের কাজ নেন। এই পথ মোটেও খুব সহজ ছিল না। স্ট্রাগল চলছিলই। অবশেষে তাঁরা ২০১২ সালে ‘টক অব দ্য টাউন’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন। কয়েক বছরের মধ্যে ‘ফিউশন প্লাজা’ নামে আরেকটি রেস্টুরেন্ট। কিছুদিনের মধ্যেই, দুটি রেস্টুরেন্টই রাশিয়ার মানুষের মন জয় করে নেয়। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই দম্পতিকে।

এ-বছর ফুটবল বিশ্বকাপ রাশিয়ায়। বিভিন্ন দেশের মতো, ভারত তথা বাংলা থেকেও অনেক ফুটবলপ্রেমিক পাড়ি দিয়েছেন সে-দেশে। বিদেশেও ভারতীয়রা যাতে দেশীয় খাবারের স্বাদ পেতে পারেন, সে-কথা মাথায় রেখে সুমনা ও প্রদ্যুৎ তাঁদের রেস্টুরেন্টের মেনুতে রাখছেন নানা ভারতীয় পদ। আর বাঙালিদের জন্য ভাত-ডাল-মাছের ঝোল তো আছেই!

দেখতে-দেখতে রাশিয়ায় সাতাশ বছর হয়ে গেল প্রদ্যুৎ-সুমনার। দেশ ছেড়ে অনেকদূর, তবু শিকড় কি ভোলে মানুষ? তাই কয়েকবছর অন্তরই চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতাকে ফিরে পেতে চেয়েই হয়ত মাথায় এসেছিল দুর্গাপুজো করার পরিকল্পনা। খোদ মস্কোয়। ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই নেশা এই বঙ্গদম্পতির। তাই, প্রদ্যুৎ-সুমনার চেষ্টাতেই বিগত কয়েকবছর ধরে মস্কোতে দুর্গাপুজো হচ্ছে হইহই করে।

রাশিয়াতেও এইভাবেই একটুকরো বাংলা গড়ে ফেলেছেন প্রদ্যুৎ-সুমনা।

Developed by DXDasia