দুর্গাপুজোর বিশ্ব ‘হেরিটেজ’ স্বীকৃতি বাংলাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে

এই উৎসবের সর্বজনীনতা বাংলাকে সার্বিক ভাবে ‘বিশ্ব-বাংলা’য় রূপান্তরিত করলো

বুধবার দুপুরে সুদূর প্যারিসেই যেন শোনা যাচ্ছিল ঢাকের আওয়াজ – বাঙালির জন্য গর্বের খবর। ডিসেম্বরেই অকাল বোধন। ইউনেস্কো হেরিটেজ তালিকায় স্থান পেল বাঙালির প্রধান উত্সব দুর্গাপুজো। এই উৎসবের সর্বজনীনতা বাংলাকে সার্বিক ভাবে ‘বিশ্ব-বাংলা’য় রূপান্তরিত করলো। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে হেরিটেজ সুরক্ষা সংক্রান্ত আন্তঃসরকার কমিটির ১৬ তম অধিবেশন হচ্ছে। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে দুর্গাপুজোকে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, বলিভিয়ার মতো বিশ্বের মাত্র ৬ দেশের উৎসব এখনও পর্যন্ত ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হল বাংলার দুর্গাপুজো

দুর্গাপুজো হল কলকাতা তথা বাংলার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সংহতি ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। জাতি-ধর্মে-বর্ণে বাঙালির দুর্গাপুজো সর্বজনীন। এছাড়াও এই পুজোকে কেন্দ্র করে অসামান্য শিল্পের বিকাশ হয়, তৈরি হয় কম-বেশি তিন হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি। ইউনেস্কোর সিলমোহরে তারই স্বীকৃতি মিললো এবার।

এর আগে সেপ্টেম্বরে, পশ্চিমবঙ্গের তরফে পর্যটন দফতর কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে রাজ্যের প্রস্তাবকে সমর্থন করে কেন্দ্র এবং বিষয়টি ইউনেস্কোর কাছে পেশ করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার ইউনেস্কোর নয়াদল্লি অফিসের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে এই স্বীকৃতির কথা নিশ্চিত করা হয়। ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, “দুর্গাপুজোকে ধর্ম ও শিল্পের সর্বজনীন মিলন ক্ষেত্রের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসাবে দেখা হয় এবং সহযোগী শিল্পী ও ডিজাইনারদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসাবে দেখা হয়। এই উৎসব শহুরে এলাকায় বড়ো আকারের পালিত হয় এবং মণ্ডপগুলির পাশাপাশি উল্লেখ্যযোগ্য হল বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাক এবং দেবীর আরাধনা।” উৎসব চলাকালীন সব শ্রেণি, ধর্ম এবং জাতিগত বিভাজন ভেঙে দর্শকদের ভিড়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই গোটা প্রক্রিয়াই ভীষণভাবে প্রশংসিত হয়েছে ইউনেস্কোর দরবারে।

২০১৮ সাল থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় সরকারি উদ্যোগে উৎসবের শেষে কলকাতায় বিসর্জন কার্নিভালের সূচনা হয়। কলকাতায় বিভিন্ন সংগঠনের ছোটো ছোটো বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মহিলাদের অংশগ্রহণ এই উৎসবে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে বলে মন্তব্য করেছে ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী উৎসবের হেরিটেজ তকমা পাওয়ার ফলে কলকাতার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে গেল, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। অতীতে এই পুজোকে কী ভাবে পর্যটনের আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে বহু পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের পর্যটন সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এই সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন, ‘২০১৮ সালে রাজ্য এই স্বীকৃতির আবেদন করেছিল। এই প্রথম এশিয়া মহাদেশের একটি উৎসবকে এমন সম্মান দেওয়া হল।’রাজনৈতিক মতবিরোধ ও পূর্বে দুর্গাপুজো নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলেও, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র শীর্ষ নেতারা বাংলাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করে বলেন, ‘কলকাতার দুর্গোৎসবের এই স্বীকৃতি প্রত্যেক ভারতীয়র কাছে গর্বের। কলকাতার দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য গুরুত্ব পেয়েছে।’

উল্লেখ্য, শেষবার ২০১৭ সালে কুম্ভমেলাকে এই হেরিটেজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এবং তার আগে ২০১৬ সালে যোগচর্চাকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়৷ তারও আগে ২০১৪ সালে পাঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী পিতল এবং তামার কারুকাজ সাংস্কৃতিক হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়েছিল। ২০১৩ সালে মণিপুরের সংকীর্তন অনুষ্ঠানের গানকে হেরিটেজের স্বীকৃতি দিয়েছি ইউনেস্কো৷ ২০১০ সালে স্বীকৃতি পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার ছৌ লোকনৃত্য। ওই একই সঙ্গে স্বীকৃতি পেয়েছিল কেরলের মুদিয়েত্তু লোক নৃত্যনাট্য এবং রাজস্থানের কালবেলিয়ে লোকগীতি। এর পাশাপাশি কুটিয়াত্তম সংস্কৃত থিয়েটার, রামলীলা, বৈদিক জপের ঐতিহ্য এবং লাদাখের বৌদ্ধ নাম-জপও এই স্বীকৃতি পেয়েছে।

Post Tags
Developed by DXDasia