শেষ থেকে আবার শুরুর পথে উত্তর কলকাতার ‘আইকনিক’ সারকারিনা থিয়েটার

শহরের একমাত্র সার্কুলার রিভলভিং এরিনা থিয়েটার

নবীনচন্দ্র ১৮৩৫ সালের কলকাতা শহরে, এক রাতে দু’লক্ষ টাকা খরচা করেছিলেন, একটা নাটক ‘নামাতে’! সারা রাত ধরে চলেছিল ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’। সমসাময়িক সময়ে আমরা সারারাতব্যাপী নাটক পরিবেশন করতে দেখেছি মনীশ মিত্রের থিয়েটার গ্রুপ কসবা ‘অর্ঘ্য’-কে। কলকাতা থিয়েটার পাগল, চুন বালি খসে হাড়গোড় বেরিয়ে এলেও ‘থিয়েটার’ এই শহরের মজ্জায় মজ্জায় আজও একইভাবে অনুরণিত হয়, তা আরও একবার প্রমাণ হতে চলেছে। শেষ থেকে আবার শুরুর পথে উত্তর কলকাতার ‘আইকনিক’ থিয়েটার—অমর ঘোষের ‘সারকারিনা’।

স্টার, মিনার্ভা বা রঙমহল-এর মতো পুরোনো থিয়েটার ছিল না সারকারিনা তবে, আশি-নব্বইয়ের দশকে রীতিমত ‘সেনসেশন’ ছিল। সারকারিনা-স্রষ্টা অমর ঘোষ নিজে এক কালে ছিলেন ফিজিক্সের শিক্ষক, অ্যামেচার আর্কিটেক্টও। কিন্তু থিয়েটার ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। নিজে প্রচুর নাটকও লিখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, থিয়েটার আসলে এক চোখ-ধাঁধানো দেখনদারি, শোম্যানশিপ। তাই নিজে এমন সব নাটক লিখতেন, যেগুলোর অভিনয় সম্ভব ছিল শুধু সারকারিনার মতো ‘ম্যাজিকাল’-থিয়েটারেই।  অমরবাবু নিজের বসতবাড়ির নীচতলাটা পালটে ফেলেছিলেন আস্ত একটা থিয়েটারে। ১৯৭৬ সালে ‘তুষার যুগ আসছে’ পালার হাত ধরে কলকাতার থিয়েটার পাড়ায় আত্মপ্রকাশ ঘটে সারকারিনার। শহরের একমাত্র সার্কুলার রিভলভিং এরিনা থিয়েটার। অমরবাবুর কথায়, “সার্কুলার এরিনার সন্ধি করে নামকরণ হয়েছিল সারকারিনা”। সেসময় থিয়েটার-পাড়ার অন্য হলগুলির সঙ্গে সারকারিনার রমরমাও তুঙ্গে উঠেছিল। সারকারিনার সেরা ম্যাজিক ছিল একটা সুইচ—চোঙার মতো দেখতে একটা কাচের বাক্সের মধ্যে লাল-রঙা একটা লিভার। স্টেজের চার পাশে গোল করে ঘিরে থাকত একটা গ্যালারি। আর স্টেজের ঠিক তলায় ছিল বিরাট একটা গর্ত। একটা সিন শেষ হতেই, স্টেজটা ঝপ করে সেঁধিয়ে যেত সেই অদৃশ্য গর্তে, আর খানিক পরেই উঠে আসত একেবারে অন্য একটা রঙচঙে ঝকঝকে সিন, একদম নতুন সেট, নতুন সিনের অ্যাক্টরদের নিয়ে। এ ভাবেই কাজ করত সারকারিনার ম্যাজিক।

হাতিবাগানের বড় রাস্তা থেকে পুব দিকে বিডন স্ট্রিট বরাবর হাঁটতে হাঁটতে একটু খোঁজাখুঁজি করলেই দেখা মিলবে সারকারিনার। ভাঙাচোরা, হলদে রঙের একটা বাড়ি। বহুদিন ধরেই দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতো নাট্যব্যক্তিত্বরা কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এই থিয়েটারটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০০৩ সালে তাঁরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে থিয়েটারটি ‘লিজ’ নিয়ে নিজেদের পরিচালিত নাটক পরিবেশন করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, বিভিন্ন কারণ বশত সাড়া পাননি তাঁরা। পরে দেবেশ বাবু পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের কাছে আবেদন জানান সারকারিনাকে ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এবং অবশেষে, তাঁর আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন এই কাজে অগ্রসর হয়। বিভিন্ন মিটিং-এ কমিশনের আলোচনায় উঠে আসে উত্তর কলকাতার প্রেক্ষাগৃহটির রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি। তাই, এই শহর আর দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অন্যান্য থিয়েটার-কর্মী, থিয়েটার-প্রেমীরা  নতুন রূপে হলেও আরও একবার ফিরে পাবেন পুরোনো সারকারিনাকে। 

   

তথ্য সূত্র:-

টাইমস অফ ইন্ডিয়া

আনন্দবাজার পত্রিকা

Post Tags
Developed by DXDasia