৩৩টি ছবির জন্য ১৮০টি গান রেকর্ড করে গিনেস বুকে নাম তুলেছিলেন বাপ্পি লাহিড়ী

আশি-নব্বইয়ের দশকের বাংলা গানে নতুন জোয়ার এনেছিলেন বাঙালির আইকন ‘বাপ্পিদা’

সুরের আকাশে মেঘ জমেছে ভীষণ। এক হারানো সময়ের সাক্ষী হচ্ছি আমরা। গতকালই চলে গেছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (Sandha Mukherjee) , এখনও শোকের ছায়া কাটেনি। তার মধ্যেই আজ সকালে চলে গেলেন এ দেশের অন্যতম ‘মিউজিক-ম্যাজিশিয়ান’ অলোকেশ লাহিড়ী ওরফে বাপ্পি লাহিড়ী (Bappi Lahiri)। ৬৯ বছরেই থেমে গেল তাঁর সুরের যাত্রাপথ। সংগীত জগতের আরও এক অপূরণীয় ক্ষতি। মুম্বইয়ের সিটি কেয়ার হাসপাতালে জীবনাবসান হয় তাঁর। গত একমাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বাপি। মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। গতকাল অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবার নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানেই অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় মৃত্যু হয় বাঙালির বাপ্পিদার।

১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) জলপাইগুড়িতে (Jalpaiguri) জন্মেছিলেন তিনি। তাঁর মা বাঁশুরি লাহিড়ী ও বাবা অপরেশ লাহিড়ীও সংগীত জগতের লোক ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীত ও শ্যামা সংগীত শুনে বড়ো হয়েছিলেন তিনি। মাত্র তিন বছর বয়স তবলা শিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। বাংলা ছবি ‘দাদু’-তে ১৯৭২ সালে সুর দেন তিনি। কিন্তু মন টেঁকেনি শহরে (City)। মায়ানগরীর হাতছানি তাঁকে ১৯ বছর বয়সে নিয়ে যায় মুম্বাই শহরে। কথায় বলে বাঙালি নাকি কাঁকড়ার জাত। সত্যিই বোধহয় তাই। মুম্বইয়ে প্রথম ব্রেক পান বাঙালি পরিচালক (Director) শমু মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই। অনেকেই জানেন না, কিশোর কুমার (Kishore Kumar) সম্পর্কে তাঁর মামা ছিলেন।

১৯৭৩ সালে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন মুম্বাইয়ে। বলিউডে তখন বাপ্পি লাহিড়ী নতুন সুরের পথ চেনাচ্ছেন। আর বাঙালির মননে শুরু হচ্ছে বাপ্পি জমানা। মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন যে সকল বাঙালি সংগীত শিল্পী, তার মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। আশির দশকে বলিউড মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির দিশা বদলে গিয়েছিল এই বাঙালির সুরেই। ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘শারাবি’, ‘অ্যাডভেঞ্চার্স অফ টারজান’, ‘ডান্স ডান্স’, ‘সত্যমেব জয়তে’, ‘কম্যান্ডো’, ‘শোলা অউর শবনম’-এর মতো পরপর সুপারহিট ছবির সংগীত মাতিয়ে তুলেছিল সুরের মহলকে। ২০২০ সালে ‘বাগি ৩’ ছবির ‘ভাঙ্গাস’ বাপ্পিদার কম্পোজ করা শেষ গান।

কিন্তু দিনের শেষে বাপ্পি লাহিড়ী আমাদের বাংলার (Bengal) ঘরের ছেলে। তাই বলিউড মাতানো বাঙালির বাংলা গানের পরিসরও নেহাত কম ছিল না। ৮০-৯০ দশকের বাংলা গানেও হিট নাম বাপ্পি লাহিড়ি।

“ইমন বলো বসন্ত বলো, তোমার জন্য সবই

বেহাগ বলো, বাহার বলো, ভৈরবী পূরবী।”

সত্যিই তাই, রাগাশ্রয়ী গানের (Song) পথে বাপ্পি লাহিড়ীর সুর যে চিরকালই অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল তা বোধহয় এভাবেই তিনি গানে গানে বলে গিয়েছিলেন সেদিন। আজও সেই সুরের ঘরাণা কানে ভাসে আমাদের। গায়ক হিসেবে কিংবা সংগীত পরিচালক হিসেবে বাঙালিকে কলার তুলতে শিখিয়েছিলেন তিনি। কখনও “মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে” অন্ধকার সরিয়েছেন আবার কখনও গানে গানেই জীবনের পাঠ দিয়েছেন, “মন্দ কিছু শুনো না, মন্দ কিছু দেখো না”। তবে বাংলা গানে (Bengali Song) বাপ্পি লাহিড়ীর সুরের মায়া শুধু এটুকুতেই ফুরিয়ে যায় না। “তুমি আমার নয়ন গো”, “শেষ ট্রামে দুজনাতে”, “চিরদিনই তুমি যে আমার”, “বলছি তোমার কানে কানে”, “তোমাকে লাগছে ভারি চেনা”, এর মতো মতো একের পর এক হিট গানে নব্বইয়ের বাংলা সিনেমার (Movie) প্রেমের কাহিনি বুনেছিলেন তিনি।

৩৩টি ছবির জন্য ১৮০টি গান রেকর্ড করে ১৯৮৬ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম তুলে নিয়েছিলেন। সময়টা ১৯৮৯ সাল, জোনাথন রসের লাইভ পারফরম্যান্সে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর আইকনিক গান “জিমি জিমি আজা আজা…”, ব্যবহার করা হয়েছিল হলিউড ছবি “You Don't Mess With The Zohan's”-এ। 

ডিস্কো স্টাইলে নিজের আলাদা অস্তিত্ব তৈরি করেছিলেন বাপ্পি লাহিড়ী, যদিও তাঁকে শুধু ‘ডিস্কো কিং’ বললে ভুল বলা হবে। রোম্যান্টিক গান (Romantic Song) থেকে শুরু করে ভজন, কাওয়ালি থেকে রাগাশ্রয়ী গান, সবেতেই ছিল তাঁর অনায়াস যাতায়াত। গজলও লিখেছিলেন তিনি। বাপ্পিদা মানেই এক অন্যরকম স্টাইল স্টেটমেন্ট। গলায়, হাতে সোনার চেন সঙ্গে কালো জামা আর কালো চশমা। বাপ্পিদা বলতেই এই পরিছিত ছবিটা বাঙালির মনে চির উজ্জ্বল।

“যুগে যুগে আমি তোমারই”, – এই গানের সুরেই লেখা হয়ে থাকবে বাংলার সঙ্গে তাঁর বহুযুগের সম্পর্কের কথা। ঝলমলে সেই বাঙালি আজ আর নেই। আচমকাই এক সমাপতন। সুরের তরী বেয়ে এতক্ষণে তিনি অন্য বসন্তে। হয়তো সেখানেই এখন জমজমাট আসর বসিয়েছেন লতা এবং সন্ধ্যার সঙ্গে। যোগ দিয়েছেন পূর্বসূরিরাও। জানি, সেই সুরের পরশ আর স্পর্শ করবে না ইহজগতকে কিন্তু রেখে যাওয়া সময়ের স্মৃতির টানে বাঙালির হৃদয়ে চিরদিন থেকে যাবেন, বাঙালির বাপ্পিদা।

Developed by DXDasia