বাঁকুড়ার রাজগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা গামছা থেকে মুখ ফেরাচ্ছে তাঁতিদের নতুন প্রজন্ম

রাজগ্রামের গামছার বহুল ব্যবহার ছিল জেলা এবং জেলার সীমানা পেরিয়ে রাজ্যে, দেশের বাজারে

সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী (Shibram Chakraborty) নাকি একবার গামছা (Gamchha) পরে জল তুলছিলেন এমন সময় এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, ‘আপনি এত বড়ো বংশের ছেলে, আপনার বাবা এত বড়ো লোক, আপনি কিনা একটা গামছা পরে এভাবে জল তুলছেন?’

শিবরাম বললেন, ‘বাপ তুললেন, বংশ তুললেন, তাতেও হল না শেষে গামছা তুলে অপমান করলেন?’

শিবরাম তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে উত্তরটা দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু গভীর ভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর উত্তরের সঙ্গে আলগোছে জুড়ে ছিল সরস প্রতিবাদ। গামছাকে তাচ্ছিল্য করার প্রতিবাদ। বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা গামছা ঠিক কবে থেকে এবং কেন এমন হেয় করার বস্তু হয়ে উঠল, তা গবেষণা করলেই ধরা পড়ে যাবে। ধরা পড়বে বাঙালির মানসিক, সাংস্কৃতিক, রুচির অবক্ষয়ের ইতিহাস। অতীতে গামছার ব্যবহারিক প্রয়োগ, বিশেষত গ্রামীণ জনজীবন জুড়ে মানুষের যে জীবনাচার তার কথা, কাব্যে, গানে, গল্পে, ধাঁধা, প্রবচনে সর্বত্রই গামছা তার মহিমা নিয়ে উচ্চকিত! অথচ সেই গামছাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল মেহনতি মানুষ ওরফে ‘নিম্নবর্গ’-র প্রতীক। STATUS বা সামাজিক ঠাটবাট গামছা বাদ দিয়ে অচিরেই জায়গা করে দেয় ‘উচ্চবর্গ’ তোয়ালে (Towel)-কে।  

গামছা মূলত তাঁতশিল্প পণ্যের একটি। তবে শুধু গ্রাম বাঙলার তাঁতিরাই নয় বাঙালি মণিপুরি, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো ইত্যাদি উপজাতি জনগোষ্ঠীর দক্ষতা জ্ঞান কল্পনার রঙ দিয়ে হাতের বুননে তৈরি করে এই শিল্পপণ্যটি। এই বস্ত্রটির ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে এক একটি জনপদের মানুষের সহস্র বছরের সঞ্চিত আবেগ, দক্ষতা, স্মৃতি ও ঐতিহ্য ও জ্ঞান পরম্পরা। এগুলো কেবলই সুতোর পরে সুতো দিয়ে বোনা কোন যেন তেন পণ্য নয়, বরং ক্ষেত্র বিশেষে পরম মমতা ও ভালবাসার এক একটি উজ্বল স্মারক।

তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।
সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে।

রবীন্দ্রনাথ সহজপাঠের (প্রথম ভাগ) এই পদ্যটিতে (আমাদের ছোট নদী) বঙ্গসমাজের যে ছবিটি তুলে ধরেছিলেন, তা আজ একেবারে হারিয়ে না গেলেও সার্বিক ভাবে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ বদলে গিয়েছে। বাংলাদেশের ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল গামছাকে পৌঁছে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক স্তরে। এছাড়াও দুই বাংলাতেই গামছা দিয়ে তৈরি পরিধান আজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি কাঁপাচ্ছে। তবে এখানেও সেই ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রথা চলছে। সরকারি অনুদান, ইত্যাদি সাহায্য জীবনযাপনে সাময়িক স্বচ্ছলতা আনলেও, যাঁদের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়, সেই তাঁতিদের অর্থনৈতিক অবস্থার সামগ্রিক উন্নতি হয়নি। বিশেষত অতিমারী চলাকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতশিল্পীদের দুরাবস্থার কথা উঠে এসেছিল সংবাদ মাধ্যমে।

বাঁকুড়ার (Bankura) রাজগ্রামে (Rajgram) সারি সারি হস্তচালিত তাঁতে তৈরি হত শাড়ি, বিছানার চাদর, গামছা৷ রাজগ্রাম জুড়ে ছিল প্রায় ৩০০টি ছো্টো-বড়ো গামছা তৈরির কারখানা৷ গামছা তৈরির উপর নির্ভর করেই রাজগ্রামের তাঁতিদের জীবন-জীবিকা চলত। কিন্তু এখন সময় বদলেছে ৷ তিনশো তাঁত থেকে বন্ধ হতে হতে এখন ঠেকেছে ৫০-এ৷ সেগুলিতেও প্রতিদিন কাজ হয় না। যাঁরা একটু পুঁজিপতি, তাঁরাই সপ্তাহে দু-তিনদিন কাজ করান। আর বাকিদের সকালবেলা তাঁতঘর খুলে ঠাকুরকে ধূপ, ফুল-বাতাসা দিয়ে ফের বন্ধ করে দেওয়া- এটাই রোজনামচা৷ সুতোর দাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া এবং পাওয়ারলুমের ব্যবহার ক্রমশ ছবিটি বদলে দিয়েছে ৷ কম সময়ে, অল্প শ্রমিক দিয়ে যন্ত্র যত তাড়াতাড়ি এবং যে খরচে একটি গামছা তৈরি করতে পারছে, তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না হস্তচালিত তাঁতের শিল্পীরা৷ তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই পেশা থেকে সরে আসতে চাইছেন তাঁরা৷ তার সঙ্গেই ছিল আবার করোনার ঠেলা৷ সব মিলিয়েই ধুঁকছিল গ্রামবাংলার প্রাচীন এই জনপদটি৷

এক দশক আগেও রাজগ্রামের গামছার বহুল ব্যবহার ছিল জেলা এবং জেলার সীমানা পেরিয়ে রাজ্যে, দেশের বাজারে। কিন্তু সেসব আজ অতীত। বর্তমানে হাতে বোনা গামছার জায়গা নিয়ে নিয়েছে আধুনিক যন্ত্রে তৈরি গামছা, তোয়ালে৷ আজ এই গামছা কাজে লাগে শুধুমাত্র ঠাকুর পুজোয় কিংবা বিয়েতে তত্ত্ব সাজাতে৷ কিন্তু করোনার প্রভাবে কার্যত লকডাউনের জেরে নমো নমো করে হচ্ছিল বিয়েবাড়ি, উপনয়ন, অন্নপ্রাশনের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান। পুজো-পার্বণের অনুষ্ঠানও প্রায় বন্ধই ছিল বলা চলে৷ করোনায় লকডাউনে পরিবহণ খরচও বেড়েছিল৷ তাই গত দু’বছরে কাঁচামালের দাম বেড়েছে আরও৷

ইচ্ছা করে ও পরাণডারে
গামছা দিয়া বান্ধি, ইচ্ছা করে।
ইচ্ছা করে ও পরানডারে
গামছা দিয়া বান্ধি
ইচ্ছা করে…

এ ইচ্ছা আর কারো করে বলে মনে হয় না। রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘গঙ্গা’ (১৯৬০) ছবির এই গানটি লিখেছিলেন ও সুর দিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী, গেয়েছিলেন পঙ্কজ মিত্র। এই লোকগানটির মতো গামছাকে কেন্দ্র করে যে লোকসংস্কৃতি, তা আজ নেই। বাঁকুড়ার ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা রাজগ্রামের গামছা-বুনন শিল্প আজ হারিয়ে যাওয়া মুখে। এই প্রজন্মের কেউ আর এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে রাজি নয়। প্রচণ্ড পরিশ্রম, চাহিদা নেই, পুঁজির অভাব- সব মিলিয়েই মুখ ফিরিয়েছে নতুন প্রজন্ম। তাঁদের অনেকেই লেখাপড়া শিখে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। খালি বয়স্করা বাপ-ঠাকুরদা সৃষ্ট এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পকে আঁকড়ে ধরে বসে রয়েছেন ভালো দিন ফেরার আশায়।

তথ্যসূত্রঃ

বাঁকুড়া, ফেসবুক পেজ
etvbharat.com
sobkhabar.com

Developed by DXDasia