কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা : রাঢ়বাংলার সোনালি গল্প ও বাঙালির ঐতিহ্য

খাঁটি কাঁসার নকশাকাটা রেকাবি

রক সংহিতায় বলা হয়েছে, ‘কানসিয়ম বুদ্ধিবর্ধকম’, যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় “কাঁসায় বুদ্ধি বাড়ে”। এ কথা নেহাত মিথ্যে নয়! আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, খাদ্যবস্তু কাঁসার সংস্পর্শে এলে জীবাণুমুক্ত হয় ও তাতে পুষ্টিগুণ বাড়ে। ফলে কাঁসার বাসনে নিয়মিত খাদ্যগ্রহণ করলে, তা একাধারে হজমশক্তি বৃদ্ধি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক ও শারীরিক ধকল কমাতে সাহায্য করে। এমনকী, কাঁসার পাত্রে আট ঘণ্টার বেশি জমিয়ে রাখা জল মানবশরীরের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন আকারের, নকশা কাটা উজ্জ্বল কাঁসার বাসন বহুকাল থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহার হয়ে আসছে। (কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা)

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অন্ততপক্ষে খাবার রাখবার পাত্র হিসেবে ফাইবার বা প্লাস্টিকের বদলে কোনো ধাতু, বিশেষত কাঁসার ব্যবহার করতে।

রোজকার জীবনে প্লাস্টিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নানা ধরনের প্রাণঘাতী অসুখ যেমন ক্যানসার, স্ট্রোক, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস প্রভৃতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব থেকে বাঁচতে, চিকিৎসকেরা যথাসম্ভব প্লাস্টিক বর্জন ও প্রাকৃতিক উপাদানগুলি গ্রহণের পরামর্শ জানান। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অন্ততপক্ষে খাবার রাখবার পাত্র হিসেবে ফাইবার বা প্লাস্টিকের বদলে কোনো ধাতু, বিশেষত কাঁসার ব্যবহার করতে। (কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা)

এ কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, কাঁসার তৈজসপত্রে পঞ্চব্যঞ্জন পরিবেশন রুচি ও ঐতিহ্যের পরিচয় দেয়। কাঁসা এক বিশেষ প্রকার সংকর ধাতু, যা তৈরি হয় ৭৮ শতাংশ তামা এবং ২২ শতাংশ টিন মিশিয়ে। এই দুই ধাতুকে নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশিয়ে, ৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলেই পাওয়া যায় খাঁটি কাঁসা। আর পশ্চিমবঙ্গে সবথেকে উৎকৃষ্ট মানের কাঁসার সামগ্রী তৈরি হয় বাঁকুড়া জেলার কেঞ্জাকুড়া নামক একটি ছোটো গ্রামে। (কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা)

বাঁকুড়া শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে, দ্বারকেশ্বর নদের তীরে কেঞ্জাকুড়া গ্রাম। এক সময়ে এখানে ঘরে ঘরে ছিল কাঁসার বাসন তৈরির ছোটো ছোটো কারখানা, প্রায় সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি। হাজারেরও বেশি কারিগর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাঁসার সামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কেঞ্জাকুড়ার কাঁসার বাসনের জগৎজোড়া সুনাম তৈরি হয়েছিল অল্প সময়েই। বাংলা, এমনকী ভারতের বাইরেও রপ্তানি হত বাসনগুলি। কেঞ্জাকুড়া ছাড়াও বাঁকুড়া জেলার মগরা, হেলনা-শুশুনিয়া, গোগড়া, জিড়রা, মুরগাঁথোল, গুন্নাথ, বিক্রমপুর, পুখুরিয়া, লক্ষ্মীসাগর, লালবাজার (মলিয়ান), শ্যামনগর (মলিয়ান), চাবড়া (ওন্দা), অযোধ্যা, খাগড়া, চুয়ামসিনা ও বেশ কয়েকটি জায়গায় কাঁসাশিল্পের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। (কেঞ্জাকুড়ার কাঁসা)

বাঁকুড়া শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদের তীরে অবস্থিত কেঞ্জাকুড়া গ্রাম। এক সময়ে এখানে ঘরে ঘরে ছিল কাঁসার বাসন তৈরির ছোটো ছোটো কারখানা, প্রায় সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি।

বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় কেঞ্জাকুড়ার কাঁসাশিল্পী আনন্দবাবু বলেন, “কাঁসার পাত্র তৈরির কাজ রীতিমত পরিশ্রমসাধ্য। প্রথমেই চুল্লিতে কাঁচামাল (তামা এবং টিন) গলিয়ে তাকে জমাট কাঁসার বিস্কুটে পরিণত করা হয়, যার আকৃতি খানিকটা বাটি সাবানের মতো। এই কাঁসার বিস্কুটটিকে তারপর রোলিং মেশিনে ঢুকিয়ে কাঁসার পাত তৈরি করা হয়। পাতটিকে আগুনে পুড়িয়ে, কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মনমতো আকার দেওয়া হয়। পরিশ্রমসাধ্য হওয়ার কারণে বর্তমানে অনেক সময়েই মেশিনের ব্যবহার করা হয়। পছন্দসই আকৃতি পাওয়ার পর সেটিকে ফের আগুনে পুড়িয়ে, ঠাণ্ডা জলে চুবিয়ে রাখা হয়; এই পদ্ধতির নাম ‘টেম্পারিং’। তামা বা অন্য ধাতুর চাইতে কাঁসা অনেকাংশে ভঙ্গুর। তাই ‘টেম্পারিং’-এর প্রয়োজন পড়ে। এরপর আসে ‘সারফেস কাটিং’-এর পালা। পোড়ানোর ফলে কাঁসার উপরের পরতটি কালো হয়ে যায়। ‘সারফেস কাটিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে ভিতরের চকচকে পরতটি বের করে আনা হয়। সেটি প্রয়োজনমতো পালিশ করে, নানান ডিজাইন বা আলপনা আঁকা হয় বাসনটির উপর।” 

নানা আকৃতির থালা এবং বাটি তৈরি করে থাকেন কেঞ্জাকুড়ার শিল্পীরা। তবে বছর দুই ধরে তাঁরা তৈরি করছেন কাঁসার ‘গুয়া শা’ (Gua sha)। এটি এক বিশেষ ধরনের ‘ফেস ম্যাসাজার’ যা মুখমণ্ডলের বাড়তি মেদ কমাতে ও ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে সাহায্য করে। আনন্দবাবুর কথায়, “যে কোনো খাঁটি ধাতুর বিভিন্ন গুণাবলী থাকে। অর্থাৎ, কেউ চাইলে সোনা অথবা রূপার গুয়া শা-ও তৈরি করতে পারেন। তবে তা ব্যয়বহুল। তুলনায় কাঁসা অনেকটাই সাশ্রয়ী। তাই আজকাল কাঁসার গুয়া শা-র চাহিদা বাড়ছে। কারিগর হিসেবে আমরা এখানেই থেমে নেই। চেষ্টা করে চলেছি যাতে আগামী দিনে কাঁসা দিয়ে আরও নানা রকমের সামগ্রী প্রস্তুত করা যায়।”

কাঁসার গুয়া-শা

বর্তমানে স্বাস্থ্যসচেতনার জেরে হোক কিংবা অন্দরসজ্জার জন্য, নতুন করে কাঁসার ব্যবহার হচ্ছে। কাঁসার বাসন ওজনে ভারী,  পরিষ্কার ও সংরক্ষণ যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। তাছাড়া, অন্যান্য সমকক্ষ ধাতুর চাইতে এর মূল্যও খানিকটা বেশি। অন্যদিকে, হু হু করে বেড়ে চলেছে কাঁচামাল ও কয়লার দাম। ফলে কোভিড মহামারীর প্রায় চার বছর পার হয়ে গেলেও কেঞ্জাকুড়ার এই  শিল্পটি আগের জৌলুস ফিরে পাচ্ছে না। “প্লাস্টিক বা ফাইবারের বাসন অধিক ব্যবহারের ফলে ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকে। এ কথা জানবার পরেও মানুষ কাঁসার বাসন কেনেন না কিছুটা দামের কারণে, নয়তো রক্ষণাবেক্ষণে সময়ের অভাবে। দুই ক্ষেত্রেই আমরা নিরুপায়। আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা শুধুমাত্র এটুকুই যে, সাধারণ মানুষ কাঁসা ব্যবহারের গুণাবলী সম্পর্কে জানুক।” খানিক আপসোসের সঙ্গে জানান আনন্দবাবু।

কেঞ্জাকুড়ায় তৈরি হওয়া উচ্চমানের কাঁসার সামগ্রী এখন পাওয়া যাচ্ছে কলকাতার বিপণি দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ। বিবিধ আকৃতির বাসন থেকে শুরু করে সুদৃশ্য ‘গুয়া শা’ অবধি, প্রতিটি জিনিসেই যেন লেগে রয়েছে গ্রামবাংলার কারিগরির নিখাদ নির্যাস।

Written by