
“আপনার ওই বিটকেল হর্নটা পাল্টিয়ে সাধারণ, সভ্য হর্ন না-লাগানো পর্যন্ত রজনী সেন রোডে ও-গাড়ির প্রবেশ নিষেধ।” – জটায়ুর গাড়ির কান ফাটানি হর্ন শুনে এমনই ফতোয়া জারি করেছিলেন প্রদোষ মিত্তির ওরফে ফেলুদা। কাহিনির নাম গোরস্থানে সাবধান।
দইওয়ালা, ফেরিওয়ালার হাঁক-ডাক, টানা রিকশার ঝুমঝুমি, ফিটনের টকবক, পাখির কুজনের মহানগরে এখন শুধুই নানান ধরনের গাড়ির কর্কশ হর্নের সাম্রাজ্য। কিন্তু ফেলুদার মতো ফতোয়া দেওয়ার উপায় নেই নাগরিকদের। ফলত শব্দ দূষণ ভোগ করতে হচ্ছে। এমন এক শহরে সম্পূর্ণ উল্টো এক ভাবনা ভেবেছেন বাংলা ব্যান্ড ভূমি-র অন্যতম প্রাণপুরুষ তথা গায়ক সৌমিত্র রায়। গাড়ি চালানোর সময় তিনি হর্ন বাজান না। বিগত ১৬ বছরে গাড়ি চালানোর সময় তিনি একবারও হর্ন বাজাননি। অবাকই হতে হয়! ব্যস্ত শহর, মানুষজন সবাই ছুটছেন গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে আর সৌমিত্রবাবু সে শহরেই গাড়ি চালাচ্ছেন বিনা হর্নে (No Horn Campaign)। একদিন, দুদিন নয়, ১৬ বছর ধরে…। ২০০৯ সালের মার্চ থেকে তিনি হর্ন বাজান না।
বাংলা ব্যান্ড ভূমি-র অন্যতম প্রাণপুরুষ তথা ভোকালিস্ট সৌমিত্র রায়। গাড়ি চালানোর সময় তিনি হর্ন বাজান না। বিগত ১৬ বছরে গাড়ি চালানোর সময় তিনি একবারও হর্ন বাজাননি। ২০০৯ সালের মার্চ থেকে তিনি হর্ন বাজান না।
রাস্তাঘাটে যানজটে অনেক গাড়ির চালক অধিকাংশ সময়ে অকারণেই হর্ন বাজাতে থাকেন। মহানগরের শব্দ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ এই প্রবণতা। কিন্তু উল্টো পথে হেঁটে সংগীতশিল্পী সৌমিত্র রায় কেন হর্ন না-বাজানোর মতো অভিনব পন্থা বেছে নিলেন? বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার হর্ন বাজাতে ইচ্ছে করেনি। বিদেশে প্রচুর ঘুরেছি, সেখানে হর্ন বাজালে সামনের লোক বা উল্টো দিকে যেই থাকুন, তিনি অপমান মনে করেন। অপমানিত হন। এটা মাথায় ছিল। ওখানে তো হর্ন ছাড়াই চলে। তাহলে আমার দেশে হর্ন বাজাবো কেন? ভিড় হলে স্লো যাব। যত স্লো যেতে হয় যাব। দেখেছি লোক সরেও যায়। আমি বিক্রমগড়ের গলিতে যখন গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করতে যাই, তখনও লোক থাকে। তাঁরা সরে যায়। আমায় হর্ন বাজাতে হয় না।” তাঁর আরও সংযোজন, “আমি হর্ন বাজাবো না। ব্যস্! সোজা কথা।”

খোদ তিনি ময়দানে নেমেছেন এবং উপায় বাতলে দেখিয়েছেন, কীভাবে কিছুটা হলেও কলকাতা শহরের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অন্তত শহরবাসীর সাধ্যে যেটুকু সম্ভব। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নিজে সে পথ অবলম্বন করেছেন।
হর্ন না-বাজানোর ঘটনা লক্ষ করেছিলেন তাঁর মা। ছেলের এই কাজে খুশি হন তিনি, উৎসাহিতও করেন। হর্ন না-বাজানোকে ঘিরে একাধিক ঘটনাও ঘটেছে সৌমিত্রবাবুর জীবনে। কখনও অল্পের জন্য বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন, আবার কখনও নিছক মজা করেছেন। তেমন কিছু অভিজ্ঞতার কথাও শুনিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, “একবার অভিষিক্তা মোড়ে, একটা গাড়ি রোল করে, ব্যাক করে একেবারে আমার গাড়ির কাছে চলে এল, আরেকটু হলেই লাগবে! তখন আমি কাচ নামিয়ে চিৎকার করছি, স্টপ স্টপ স্টপ…। কিন্তু ভদ্রলোক শুনতে পাননি। আরেকটু হলে লেগে যেত। আমি ব্যাক করতে পারছি না আমার পিছনে আরেকটা গাড়ি ছিল।” এমন পরিস্থিতিতেও হর্ন বাজাননি তিনি।
আরেকটি ঘটনা। বললেন, “তখন আমার স্যান্ট্রো (গাড়ি) ছিল। ফ্যামিলি আমার সঙ্গে ছিল। আমি মজা করতে খুব ভালোবাসি। খুব জ্যাম, জ্যাম বলতে মানুষের ভিড়। জায়গাটা গড়িয়াহাট হবে। তখন আমি মাথা বের করে বলছি, দাদা সরে যান আমি কিন্তু গাড়ি চালাতে জানি না। যে যার মতো ওখান থেকে হাওয়া হয়ে গেল। হর্ন বাজাতে হল না। কয়েকজন হাসছিল, চিনতে পেরেছিল।”
সহ নাগরিকদের কাছে তাঁর আবেদন, “হর্ন বাজাবেন না। শব্দ দূষণ কমবে।” সেই সঙ্গে আরও বলেন, “আমাকেও এসি চালিয়ে, কাচ তুলে গাড়ি চালাতে হয়। বাইকগুলো, বাসগুলো এত হর্ন বাজায় বিরক্ত লাগে তখন। কেউ হর্ন বাজালে আমি জিজ্ঞাসা করি, কী হল এত হর্ন বাজিয়ে? তাঁকে হয়তো আমি সাইড দিয়ে দিয়েছি, এগিয়ে গেছে। এগিয়ে সিগন্যালে দেখা হল। জিজ্ঞাসা করি, কী লাভ হল? এটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চালকেরা। কীসের তাড়া ওদের কে জানে? এদের ফাইন করা উচিত। বেশি অঙ্কের ফাইন করা উচিত। আমার মনে হয় ওনার ড্রাইভেন গাড়ির ক্ষেত্রে হর্ন বাজানোর হার কম।”
সমস্যা থাকলে তার সমাধানও থাকে। এটাই জগতের নিয়ম। কিন্তু সমস্যার প্রেক্ষিতে সমাধান করতে হবে গোছের নীতি বাক্যে আটকে থাকেননি সৌমিত্র রায়। খোদ তিনি ময়দানে নেমেছেন এবং উপায় বাতলে দেখিয়েছেন, কীভাবে কিছুটা হলেও কলকাতা শহরের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অন্তত শহরবাসীর সাধ্যে যেটুকু সম্ভব। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নিজে সে পথ অবলম্বন করেছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছে থাকলে কলকাতার মতো জনবহুল শহরের ব্যস্ত রাস্তাতেও বিনা হর্নে গাড়ি চালানো সম্ভব। এখানেই রয়েছে এক অদ্ভুত সমাপতন। সৌমিত্র রায়, তাঁর সুর ও স্বর দিয়ে মানুষকে আনন্দ দেন। মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর গান শোনে আবার তিনিই নীরবতার পাঠ শেখাচ্ছেন সহ নাগরিকদের। যাতে অহেতুক গাড়ির হর্নের মতো কর্কশ শব্দে পথচলতি সহ নাগরিকরা সমস্যায় না পড়েন। নাগরিক সচেতনতার এহেন উদ্যোগকে কুর্নিশ জানাতে হয়।

