বঙ্গ সাহিত্য সমাজ : বেনারসে ১৬০ বছরের পুরোনো বাঙালি লাইব্রেরি

মানুষ মূলত পরিযায়ী হয় জীবিকার টানে। বেনারসের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক অবশ্য ঠিক সেটা নয়। কালক্রমে তাঁরা সেখানে পণ্ডিতি বা ব্যবসা করেছে বটে, কিন্তু তা কাশীকে নিজের দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের ঠিকানা হিসেবে নিশ্চিত করে তোলার জন্য। ঠিক কবে থেকে বাঙালি কাশীকে নিজের দ্বিতীয় বাসস্থান হিসেবে পছন্দ করে এসেছে এর সত্যিই কোনও কালক্রম নেই; অনেকেই পালযুগের কাছাকাছি সময়ে ফিরে যান, কিন্তু তারও আগে যে কাশীর সঙ্গে বঙ্গপ্রদেশীয় অধিবাসীদের সম্পর্ক ছিল না এমন ধারণা করা নিছকই ছেলেমানুষীসুলভ আচরণ হবে। আর তাই হয়ত যতবার কাশী বিদেশিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে ততবারই অনেকের মতন বাঙালিরাও সুপ্রাচীন এই নগরীকে নতুন করে গড়ে তুলতে নিজের অবদান রেখেছে। অবশ্য এসব ইতিহাসের কথা, বর্তমানের অবস্থা কী? এই প্রশ্নটি ছিল বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত ভট্টাচার্য-এর প্রতি। (বেনারসের বঙ্গ সাহিত্য সমাজ)

১৮৬৬ সালে স্বাধীনভাবে শুরু হওয়া বঙ্গ সাহিত্য সমাজ, পাঁচ দশক পর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বারাণসী শাখারূপে পরিগণিত হয় স্বর্গীয় ব্যোমকেশ মুস্তাফি মহাশয়ের প্রস্তাবে। ক্রমশ সদস্য ও বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নানান জায়গায় স্থানান্তরিত হতে হতে বর্তমান বাড়িতে পরিষদের কার্যালয় ও গ্রন্থসংগ্রহ তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায় গত শতাব্দীর শেষ দশকে।

আড্ডা গড়ে উঠল বঙ্গ সাহিত্য সমাজ-বারাণসীর জঙ্গমবাড়ী ঠিকানার ঘরে। বাটীর নাম, তারাচরণ সাহিত্যাচার্য স্মৃতি ভবন। কৌতূহলী পাঠক যদি গুগলে এই ঠিকানা অন্বেষণ করতে যান, তাহলে হতাশ হতে হবে। তাই বলে এ-কোনও কাল্পনিক স্থানও নয়। প্রায় ১৬০ বছর আগে, এরকমই এক আড্ডায় স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায়-এর তত্ত্বাবধানে স্বর্গীয় গোপালচন্দ্র পাকড়াশী মহাশয়ের বাটীতে এক ক্ষুদ্র সমাজ স্বরূপে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ, আর সঙ্গে ছিল ১৫৫টি বইয়ের একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থ সংগ্রহ। অবশ্য সংখ্যায় সামান্য বলে মনে হলেও, তন্মধ্যে দানস্বরূপ পাওয়া ৬৫টি গ্রন্থের সঙ্গে বিদ্যাসাগর মহাশয়, বামাসুন্দরী দেবী, অমৃতলাল মিত্র প্রমুখের নাম জড়িয়ে আছে। তবে এই সমাজ গঠনের মুখ্য প্রেরণা ঠিক কী ছিল? ভাষার প্রতি কাশীস্থ বাঙালির অমনোযোগ ও প্রাদেশিক সরকারের ঔদাস্য। (বেনারসের বঙ্গ সাহিত্য সমাজ)

নতুন বইয়ের গন্ধে আমোদিত হওয়া কৈশোর সদ্য বিগত হওয়া প্রজন্মের স্মৃতিতে আজও মলিন হয়ে যায়নি। আবার পুরোনো বইয়ের ধুলো ঘাঁটার মধ্যেও যে এক নেশা আছে, একথাই বা অস্বীকার করতে পারেন কোন বইপ্রেমী! ভবনের টিমটিমে আলোর ঘরে মুরাকামির অ্যা স্ট্রেঞ্জ লাইব্রেরির কথা মনে পড়ে। ভূতের মতন পুরোনো পাঠকদের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই। তাঁদের ফিঙ্গার প্রিন্টের সঙ্গে হস্তরেখা মিশে গিয়ে নিয়তির দরজায় কড়া নাড়ে। (বেনারসের বঙ্গ সাহিত্য সমাজ)

১৮৬৬ সালে স্বাধীনভাবে শুরু হওয়া বঙ্গ সাহিত্য সমাজ, পাঁচ দশক পর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বারাণসী শাখারূপে পরিগণিত হয় স্বর্গীয় ব্যোমকেশ মুস্তাফি মহাশয়ের প্রস্তাবে। ক্রমশ সদস্য ও বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নানান জায়গায় স্থানান্তরিত হতে হতে বর্তমান বাড়িতে পরিষদের কার্যালয় ও গ্রন্থসংগ্রহ তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায় গত শতাব্দীর শেষ দশকে। অতীতে কোনও এক অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ এই সংগঠনের কর্তব্য হিসেবে “বিশ্বের সকল সাহিত্যের মধ্য হইতে বিভিন্ন যুগের অমূল্য রত্নরাজি সংগ্রহ করিয়া একত্র করা”-র কথা বলে গিয়েছিলেন। (বেনারসের বঙ্গ সাহিত্য সমাজ)

– বেনারসে বর্তমান বাঙালির সংখ্যা প্রায় লাখ আড়াই।
– আর মোট জনসংখ্যা?
– সরকারিভাবে তা প্রায় কুড়ি থেকে বাইশ লক্ষ।
– বাঙালির সংখ্যা আগে কেমন ছিল?
– শেষ পাঁচ দশকে প্রায় অর্ধেকে এসে ঠেকেছে!
– আর সমাজের বর্তমান সক্রিয় সদস্য সংখ্যা?
– তাও প্রায় ২৫০।

বেনারসের সোনারপুরা থেকে বাঙালিটোলা অবধি বাঙালির বাসস্থানের ইতিহাস কয়েক দশক আগে পর্যন্তও অনুমার্গণীয় ছিল। আজ ডেমোগ্রাফি বেশ খানিকটা পাল্টেছে। ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অজস্র বই বাড়িগুলির উত্তরাধিকারীর অমনোযোগ ও যত্নের অভাবে এসে পৌঁছেছে তারাচরণ সাহিত্যাচার্য স্মৃতি ভবনের ঠিকানায়। আর তাই ইতিহাস, কাব্য, উপন্যাস, ধর্মগ্রন্থ, সংগীত, নাটক, সাময়িক পত্রিকা প্রভৃতি বর্গে বিভাজিত প্রায় কুড়ি হাজার বই সম্বলিত এই লাইব্রেরি বর্তমানে একটি শোধ সংস্থান হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বাড়ির একতলায় রয়েছে বই, দোতলায় সাময়িক পত্র ও পুঁথির সংগ্রহশালা। সেখানেই রয়েছে আদি বঙ্গদর্শনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। বাঙালির পশ্চিমযাত্রার এক ডায়াস্পোরিক যাপনেতিহাস।

ইতিহাস, কাব্য, উপন্যাস, ধর্মগ্রন্থ, সংগীত, নাটক, সাময়িক পত্রিকা প্রভৃতি বর্গে বিভাজিত প্রায় কুড়ি হাজার বই সম্বলিত এই লাইব্রেরি বর্তমানে একটি শোধ সংস্থান হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বাড়ির একতলায় রয়েছে বই, দোতলায় সাময়িক পত্র ও পুঁথির সংগ্রহশালা। সেখানেই রয়েছে আদি বঙ্গদর্শনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

বর্ষায় আমাদের ঘাটগুলি গিয়েছে ডুবে। স্বপ্নের বীজটুকু আর প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো একটি বই যা কেউ কোনওদিন ইস্যু করেননি তা নিয়ে অতএব বাড়ি ফিরে আসি। জানি না পাঠক ‘বেঙ্গলি ইন্টেলিজেন্টসিয়া’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত কিনা! গঙ্গাস্রোতের আবহে নিশির মতন পিছু ডাকে উত্তর ঔপনিবেশিক চৈতন্য। একটি পুরোনো বাড়ি, তাতে টিমটিমে আলোর ঘর, ‘হর হর মহাদেব’ উচ্চারণে প্রতিরোধে সামিল হয়েছে আধুনিকতার বিরুদ্ধে? ট্যাবে নোটিফিকেশনে ভেসে ওঠে চ্যাটবট। তাকে এই গ্রন্থাগারের কথা বলি। এই নিথর, কৃত্রিম বট অপ্রত্যাশিত এক অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস নিয়ে হাজির হয় সামনে। নতুন কোনও ডেটাসেটের আশায়? বই থেকে ই-বই, তা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে প্রবেশ করে যাওয়া এই আমরা যারা ইতিমধ্যেই আত্মপক্ষ সমর্পণ করে ফেলেছে আগামী প্রজন্মের ব্যবহারের কাছে, পুনরায় ভেসে ওঠে কাশী নামকরণের পিছনে থাকা জ্ঞানের প্রকাশিত হওয়ার দর্শন।

আড্ডায় আমাদের সঙ্গে ছিলেন আশিসবাবুও। তাঁর পরিবার তিনপ্রজন্ম ধরে বেনারসনিবাসী। আদি বাড়ি খুলনায়। আজও পরিবারে কারুর বিবাহের প্রয়োজনে ভাগীরথী অববাহিকায় আত্মীয় খোঁজেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় বেশ খানিকটা হতাশ তিনি। বলেন, আমরা হলাম ‘উপ’ বুঝলে, পশ্চিমবঙ্গ নামক সংস্কৃতির নক্ষত্রকে ঘিরেই আমাদের যাবতীয় ব্যবসায়। নিজের রাজ্যে বাঙালির উন্নতি না হলে প্রবাসীরা তাঁদের বাঙালিত্বকে আঁকড়ে থাকবে কী করে!

প্রজন্মের নিরিখে অপেক্ষাকৃত নবীন সুব্রতবাবু সসম্মানে এর বিরোধিতা করেন। তিনি বরং আশাবাদী। বলেন, মূল নিবাস থেকে না হলেও প্রবাস থেকেই উঠে আসবে এমন কোনো নেতৃত্ব, যা আগামীদিনে বাঙালির অস্মিতাকে সত্যি অর্থেই নতুন করে পথ দেখাবে।

সুব্রতবাবু এই গ্রন্থাগারের বর্তমান অভিভাবকসম, লাইব্রেরির একটি ডিজিটাল ক্যাটালগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন। ব্যস্ততার মধ্যে তিনি নিজের হাতেই চেষ্টা করেছেন কিছুটা, কিন্তু সহযোগী কেউ হলে বিশেষ সুবিধে হয়। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই তিনি গড়ে তুলতে চান অগভীর পাঠের বিরুদ্ধে, ক্রমশ সারাংশ নির্ভর হতে চাওয়া যাবতীয় অভ্যেসের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ। সন্ধে ছয়টা থেকে আটটা অবধি। রোববার লাইব্রেরি খোলা।

___________
প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তিদের মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব। ছবি লেখক।

Written by