
হুগলি জেলার ছোট্টো গ্রাম বন্দীপুর। সেখানকার মিত্র-হালদার পাড়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি পরিবারের বসবাস। তাঁরা সকলেই জাতিতে হাড়ি। সমাজের দৃষ্টিতে ‘নিম্নবর্ণ’, প্রান্তিক। গ্রামবাসীদের অধিকাংশই মূলত দিনমজুর, বিভিন্ন অসংগঠিত কর্মক্ষত্রে (যেমন রং মিস্ত্রী, প্লাই বা কাঠের কাজ) যুক্ত। তবে, একসময় গ্রামের অনেকেই বাঁশের ঝুড়ি, চুপড়ির মত বিলুপ্তপ্রায় কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বলাই বাহুল্য, প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যত বেড়েছে, পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর চাহিদা পাল্লা দিয়ে কমেছে। তাই, বাধ্য হয়ে গ্রামের কুটিরশিল্পীরা ঝুড়ি-চুপড়ি বোনা ছেড়ে দেন। কিন্তু সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, পুরোনো অভ্যাস ছাড়তে পারেননি দিলীপ রায়। বর্তমানে তিনি একা হাতেই গ্রামের কুটিরশিল্পটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যত বেড়েছে, পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর চাহিদা পাল্লা দিয়ে কমেছে। তাই, বাধ্য হয়ে গ্রামের কুটিরশিল্পীরা ঝুড়ি-চুপড়ি বোনা ছেড়ে দেন। কিন্তু সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, পুরোনো অভ্যাস ছাড়তে পারেননি দিলীপ রায়।
দিনের যে কোনও সময়ে চলে যান বন্দীপুর মিত্রপাড়া, দেখতে পাবেন এক উন্মুক্ত দেবীদালানের পাশে এক অশত্থ গাছের তলায় বসে কাজ করে চলেছেন এই শিল্পী। লেখাপড়া তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। বাবার হাত ধরে এই কুটিরশিল্পে প্রবেশ ও কাজে হাতেখড়ি। তাঁর কথানুযায়ী, তাঁর বাবার সময়ে এমনকী তাঁর সময়ের গ্রামের একটি বিরাট অংশ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এই পেশায় আর কেউ আসতে চাইছে না। তিনি আরোও জানান, আগে গ্রামে এত কৃষিকাজ হতো না, ফলে চাষের কাজে ব্যবহারের জন্য ঝুড়ি-চুপড়ির চাহিদাও ছিলো না। বর্তমানে প্রায় বেশিরভাগ জমিই তিন-ফসলা, চাষও হচ্ছে। ফলে, ঝুড়ি-চুপড়ির চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু দিলীপবাবুর কথায়, বিক্রি বাড়লেও শিল্পের প্রতি কারোর কদর নেই।
ঝুড়ি বা চুপড়ি তৈরি করতে সবার প্রথমে বাঁশ নির্বাচন করতে হয়। তারপর উপযুক্ত বাঁশ নিয়ে যুতসই আকারে চেরাই করা হয়। চেরাই করা বাঁশের অংশগুলো দিয়েই বুননের কাজে নিমজ্জিত হন এই শিল্পী। ঝুড়ির জন্য একরকম সাইজ, আর চুপড়ির জন্য আরেকরকম। দিনে দু’টি পূর্ণাঙ্গ সাইজের ঝুড়ি তিনি বানাতে পারেন। সঙ্গে একটি চুপড়ি। দিলীপবাবুর নির্দিষ্ট কোনও দোকান নেই। কেউ অর্ডার দিলে সাপ্লাই দেন, নয়তো তাঁর কাজের সম্ভার নিয়ে বসের কাছেরই এক বাজারে।
দিলীপবাবুর কথায়, “এখন মানুষ আবার পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর দিকে ঝুঁকছে। বাজার আগের থেকে যথেষ্ট ভালো হবার সম্ভাবনা সত্ত্বেও বর্তমান প্রজন্মের তীব্র অনীহা এই পেশার প্রতি। আমার নিজেরই তিন ছেলে, তিনজনই পেশায় রং মিস্ত্রী অথবা অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত। কেউ এই পেশায় আসতে চায়নি। ওরা হয়তো ভাবে, এই পেশায় থাকলে শুধু দিন গুজরান হয়, ভবিষ্যৎ নেই।” কথাপ্রসঙ্গে উঠে এলো, বর্তমানে তাঁদের পাড়ায় ত্রিশ-চল্লিশটি পরিবারের বসবাস। তাঁর বয়সী বেশিরভাগই কখনও স্কুলে যাননি। এখনকার প্রজন্ম স্কুলে গেলেও বেশিরভাগই ক্লাস ৯-১০ এর বেশি পড়ে না। অর্থাৎ বেশিরভাগই স্কুলছুট। বর্তমান প্রজন্ম এই কুটিরশিল্পকে “ছোটো কাজ” হিসেবে দেখে। এছাড়াও তিনি জানালেন যে এই কাজে শারীরিক শ্রম অনেক বেশি। এবং তার সঙ্গে প্রয়োজন প্রবল ধৈর্য, একাগ্রতা। এত পরিশ্রমের পর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ফলস্বরূপ বর্তমান প্রজন্মের তীব্র অনীহা সৃষ্টি হয়েছে এই পেশার প্রতি।
এই কাজে শারীরিক শ্রম অনেক বেশি। এবং তার সঙ্গে প্রয়োজন প্রবল ধৈর্য, একাগ্রতা। এত পরিশ্রমের পর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, ফলস্বরূপ বর্তমান প্রজন্মের তীব্র অনীহা সৃষ্টি হয়েছে এই পেশার প্রতি।
এই পেশায় কাজ করতে এসে দিলীপবাবুর প্রায় ৩৫ বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত। তিনি নানান সময়ের সাক্ষী। কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাদী দুনিয়াতে সরকারি সহায়তা ছাড়া কোনও কুটিরশিল্পই বেশিদিন টিকতে পারে না। কারণটা স্পষ্ট, অসম লড়াই। বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে ক্ষুদ্র পুঁজির লড়াই বেশিদিন চলতে পারে না। দিলীপবাবু অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান, একবারই বামফ্রন্ট আমলে ১০০০ টাকার মতো সহায়তা পেয়েছিলেন। এরপর, আর কোনও সরকারি সহায়তাই তিনি পাননি।

এই সব কারণেই বর্তমান প্রজন্মের তীব্র অনীহা। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে “ঝুড়ি ও চুবড়ি” বুননের মতো অতি প্রাচীন এই কুটিরশিল্পকে বিলুপ্তির দোড়গোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে। শিল্পী অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান – তাঁর পর এই এলাকায় আর একটিও এই পেশার লোক থাকবে না। যখন তিনি এ-কথাগুলো বলছিলেন তাঁর চোখ তাকিয়ে ছিলো দূর কোনো ভবিষ্যতের দিকে – এই অকালের মাঝে, যার কোনো আশারূপ উত্তর খোঁজাও যেন বৃথা…

