কলকাতার বাঘ-বাড়ি থুড়ি নদীয়া হাউজের কিস্‌সা

কৃষ্ণনগরের রাজার বাড়িতে বড়ো হল দু’খানা রয়েল বেঙ্গল টাইগার

সে এক মস্ত বাঘের ডেরা। উহুঁ, একটা নয়। একাধিক বাঘ। তাও আবার দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ত রাজপথে। এমনিতে কলকাতায় বাঘের ঘোরাফেরা ছিল বৈকি। চৌরঙ্গীতে গোরা সাহেবের দল নাকি বাঘ মারতে যেত। তবে, সেসব তো ঢের যুগ আগের গল্প। কিন্তু এই ধরুন, ১৯৫৮-৫৯ সালে বেকবাগানের মুখে আপনি হঠাৎ শুনলেন ‘হালুম’ গর্জন। ‘দ্য রয়াল বেঙ্গল টাইগার’ ডাক ছাড়ছে। আর থমথম করছে গোটা পাড়া। কী ভাবছেন? গল্পকথা? আজ্ঞে না, এমনটা বাস্তবেই ঘটত। কলকাতার ‘নদীয়া হাউজে’ রাজত্ব করত পেল্লায় দুটি বাঘ। স্যামসন ও ডিলাইলা। সেই থেকে বাড়িটির নামও হয় বাঘ-বাড়ি।

রাস্তার এপারে মডার্ন হাই স্কুল, ওপারে ডি আই ক্লাব বা ডালহৌসি ইনস্টিটিউট। যা আগে ছিল প্রখ্যাত ব্যারিস্টার অমিয়নাথ চৌধুরীর বাড়ি। তার পাশেই বিশাল বড়ো গেটের আড়ালে নদীয়া হাউজ। বাড়িটির পশ্চিমে ঝাউতলা রোড (বর্তমান নাম সৈয়দ আমির আলি এভিনিউ), দক্ষিণে ব্রাইট স্ট্রিট, আর পূর্বদিকে শিকারি কুমুদনাথ চৌধুরীর বাড়ি। কালাহান্ডিতে শিকারে বেরিয়ে মৃত্যু হয়েছিল যাঁর। কলকাতার আনাচেকানাচে এমনভাবেই মিশে থাকে ফেলে আসা কাল। নতুনের গাঢ় প্রলেপেও কীভাবে যেন আজও টিকে আছে তারা।

ইতিহাসের গন্ধে গন্ধেই বৈশাখী দুপুরে নদীয়া হাউজের দরজায় কড়া নাড়া। প্রবেশের অনুমতি মিলল খানিক পরে। বাইরে তখন হাড়-জ্বালানো গরম, গাড়ির উদ্ধত চিৎকার, হন্তদন্ত মানুষ। সেসব চৌহদ্দি পেরিয়ে নদীয়া হাউজে প্রবেশের পর মনে হল একটা অন্য পৃথিবী। শান্ত, নিশ্চুপ। দৈবাৎ দু-একটি পাখির ডাক। সে সীমানায় প্রবেশ ইস্তক চোখ ঝলসে যায় ভেনাস মূর্তি থেকে শুরু করে নয়ন-জুড়োনো ঝাড়বাতি দেখে। সূর্যের আলোয় ঝকঝম করে উঠছে তাদের রোশনাই। দেওয়ালে টাঙানো শিকারের অসংখ্য চিহ্ন। হরিণ থেকে শুরু করে হিংস্র পশু। যেন টাইম মেশিনে চড়ে পৌঁছে গেছি ‘এক যে ছিল রাজা’দের আমলে। 

তাতে অবিশ্যি ভুল নেই। রাজা তো বটেই। কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের বাস এই নদীয়া হাউজে। সাক্ষাৎ হল সেই রাজপরিবারেরই বংশধর শ্রীমণীশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। মেঝে থেকে শুরু করে প্রায় সিলিং ছুঁয়ে যাচ্ছে কলকাতার প্রাচীন আমল। তারই মাঝে বসে মণীশবাবু। আমার ফোল্ডিং-চেয়ার দেখা চোখে সামনের চেয়ারকে সিংহাসন ভাবতে তাই দ্বিধা হয় না। তাঁরই মুখে শুনলাম নদীয়া হাউজের ইতিবৃত্ত। আর শুনলাম, স্যামসন ও ডিলাইলার গল্প। বাঘদুটি এসেছিল খোদ মধ্যভারত বা মধ্যপ্রদেশ থেকে। যে-সে ভাবে না। একেবারে দত্তক সন্তানের মতো তাদের আগমন ঘটেছিল এই নদীয়া হাউজে।

অবশ্য ‘মেরি ভিল’, ‘গুড হোপ ভিল’ এইসব নানান নামকরণ ও বেশ কিছুবার মালিকানা বদলের পরে এই বিশাল বাড়ি পাকাপাকিভাবে এসে পৌঁছায় কৃষ্ণনগরের রাজপরিবারের হাতে। বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্যের জগতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই রাজপরিবারের। শিবনাথ শাস্ত্রী ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’-এ লিখছেন, “…বিক্রমাদিত্যের রাজসভা না থাকিলে যেমন আমরা কালিদাসের অপূর্ব কীর্তি পাইতাম না, তেমনি গুণগ্রাহী কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভা না থাকিলে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল পাইতাম না।” প্রসঙ্গত, রামতনু লাহিড়ীর সঙ্গেও বেশ সদ্ভাব ছিল কৃষ্ণনগরের রাজপরিবারের। 

কলকাতার নদীয়া হাউজের বাসিন্দা ছিলেন কৃষ্ণনগরের মহারাজা, সঙ্গীতজ্ঞ ক্ষৌণীশচন্দ্র। সংযুক্ত বাংলার গভর্নরের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দলের সঙ্গেও ছিল গভীর অন্তরঙ্গতা। তাঁর উপস্থিতিই ঐতিহাসিক করে তোলে এই বাড়িকে। এরপর কৃষ্ণনগরের মহারাজা সৌরীশচন্দ্র বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে তোলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের খ্যাতিমান ছাত্র ছিলেন তিনি। কলকাতার ইতিহাস, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যের হদিশ ছিল তাঁর নখদর্পণে। পাশাপাশি তাঁর মতো চোস্ত শিকারি নাকি ভূভারতে ছিল না। তাঁর শিকারের সেই অসামান্য গল্প শোনালেন তাঁরই বংশধর।

১৯৫৮ সালে খোদ মধ্যপ্রদেশ সরকার ডেকে পাঠান সৌরীশচন্দ্রকে। একটি নরখাদক বাঘকে নিকেশ করতে হবে। প্রায় ন-টি প্রাণ ততক্ষণে পৌঁছে গেছে সেই গ্রেট রয়াল বেঙ্গল টাইগারের উদরে। অথচ সৌরীশবাবুও টানা পনেরো দিন মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল চষে সেই বাঘটির হদিশ পেলেন না। তিনি ঠিক করলেন কলকাতা ফিরে আসবেন। কিন্তু সেদিনই আরেকটি মানুষ প্রাণ হারায় সেই নরখাদকের হাতে। এইবার স্পট করা গেল বাঘটাকে। মাচানে উঠে গুড়ুম। কিন্তু, সেবারের সাফল্য খুশি করল না সৌরীশচন্দ্রকে। 

শিকারের ক্ষেত্রে একটি মতাদর্শ মেনে চলতেন তিনি। কোনো স্ত্রী- পশুকে হত্যা করতেন না। আসন্ন প্রসবা হলে তো নয়ই। কিন্তু, এবার তিনি মারলেন বাঘিনীকেই। আর মাতৃহীন হয়ে রইল তার দুটি সন্তান। কোথায় থাকবে তারা? আর অন্যত্র থাকলেও যদি তেমন যত্ন না হয়? অগত্যা, সেই মাতৃহীন দুটি সন্তানকেই দত্তক নিয়ে কলকাতার এই বাড়িতে লালনপালন করেছিলেন তিনি। পুরুষ বাঘটির নাম দেওয়া হয়েছিল স্যামসন, আর স্ত্রী- ডিলাইলা। স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে অন্য কোনো রক্ষীর দরকার পড়ত না সেইসময়। ‘হিংস্র’, জংলি দুটি প্রাণীও নদীয়া হাউজের সঙ্গে আত্মীয়তার গভীর সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। 

যদিও পরবর্তীকালে অনেক আইনি জটিলতায় বাঘদুটির সেখানে থাকা মুসকিল হয়ে উঠেছিল ক্রমশ। সেই যন্ত্রণার কথাও শুনলাম মণীশবাবুর মুখে। কারণ, এ তো শিকারের ঘটনা নয়। ভালোবেসে যত্নে লালন করা। তাদের নিয়েও টানাটানি খুবই তীব্র মানসিক সংকটে ফেলেছিল পরিবারের সকলকে। সেদিনের সেই বাঘ-বাড়ি আজও বাঘ দুটির স্মৃতি আঁকড়ে বসে আছে।

আর রয়েছে বাড়ি ভর্তি পুরোনো আসবাব, অপূর্ব সব ঝাড়বাতি, প্রাচীন ধারালো অস্ত্র, কোনোটা বা লাঠির আড়ালে বন্দুক, শিকার-করা পশুদের দেহাবশেষ ও আরো কত কী। তবে, এই সমস্ত রাজকীয়তার মধ্যেও বাড়িটির আসল সৌন্দর্য ওই বাঘদুটির স্মৃতি। রাজবাড়িতে হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকার গল্প তো অজানা নয়। কিন্তু, তারপরেও স্যামসন ডিলাইলার এই গল্প অবাক করে। আমরা খৈরি বাঘের গল্প শুনেছি, কিন্তু কলকাতার ভিতরেও যে স্যামসন-ডিলাইলা ছিল আদরে, আত্মীয়তায় জড়িয়ে—জানতাম না। পুরোনো কলকাতার, ক্ষয়ে আসা কলকাতার এমন অনেক কিছুই আমরা জানি না সেইভাবে। আজো… 

তথ্যসূত্র : ১) বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী, নদীয়া হাউজ, কলকাতা

ছবি: নদীয়া হাউজ, কলকাতা

Post Tags
Developed by DXDasia