“ভিয়েতনামের মেকং নদীর ব-দ্বীপে জল পরিশোধনের ব্যবস্থা করেছি আমরা”

বিজ্ঞানকর্মী অনিরুদ্ধ দে’র সঙ্গে কথোপকথনের অন্তিম পর্ব

প্রচারের বৃত্তে না এসে প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে কীভাবে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো যায়, সেই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরলস গবেষণা করে চলেছেন ‘বিজ্ঞানকর্মী’ অনিরুদ্ধ দে। দেশীয় পদ্ধতিতে বানিয়ে ফেলেছেন রিক্সা-অ্যাম্বুলেন্স, সোলার গিজার, সোলার ড্রায়ার, নতুন ধরনের ওয়াটার পিউরিফায়ার এবং আরও অনেক বিচিত্র সব যন্ত্র। সেই আশ্চর্য মানুষটি এই প্রথমবার গণমাধ্যমে মুখ খুললেন ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিনিধি শ্রেয়ণের কাছে। আজ রইল তাঁর সাক্ষাৎকারের অন্তিম পর্ব।

 

•    আপনি তো ছোটোবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের মডেল তৈরি করতেন। তারপর সেগুলোকে মানুষের কাজে লাগানো শুরু করলেন কবে থেকে এবং কীভাবে?

পড়াশোনা শেষ করে আমি যখন পেশার জগতে আসি, তখন আমার মনে হল, মডেল তৈরিটা আর যথেষ্ট নয়। ছোটোবেলায় মডেল বানাতে ভালো লাগত, ওটা হবি ছিল তখন। এবার উপলব্ধি হল, মানুষের কাজে লাগানোর জন্য আমাকে কিছু করতে হবে। তখন ৯০-এর দশকের শুরু। মানুষের কাজে লাগে, সেরকম মডেল বানানো তখন থেকে শুরু করলাম। এটাকে অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স বলা হয়। গ্রিন হাউজ এফেক্টের কথা আমরা ছোটোবেলায় পড়েছি ফিজিক্সে। সেই গ্রিন হাউজ এফেক্টকে কাজে লাগিয়ে আমরা সোলার কুকার বানাতে পারি, সোলার ড্রায়ার বানাতে পারি, সোলার ওয়াটার গিজার বানাতে পারি। এইভাবেই সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কয়েকটা যন্ত্র তৈরি করলাম।

•    জল পরিশোধন নিয়ে কাজ শুরু করলেন কীভাবে? 

জল পরিশোধন করার পদ্ধতিগুলো যদি নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে তো মানুষের কোনো লাভ হয় না। সেই ভাবনা থেকে কমিউনিটি লেভেলে জল পরিশোধক তৈরি করেছি আমরা। আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম যে কমিউনিটিতে কী কী ধরনের সমস্যা আসতে পারে। তারপর ডোমেস্টিক লেভেলেও কাজ করেছি। ডাব্লুএইচও ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট বলে একটা অ্যাচিভমেন্ট দেখবার পর জানিয়েছিল, ঘরের মধ্যে জল পরিশুদ্ধ করে তাকে নিরাপদে কোথাও স্টোর করে রাখাই একমাত্র বিকল্প। আমরা সেই কাজটা শুরু করেছিলাম ২০০৩ সালে। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ডোমেস্টিক ওয়াটার পিউরিফায়ার। আমাদের মনে হয়েছিল, কোনো একটা পরিবারে যদি এই কাজটা করতে দেওয়া হয়, সাধারণ যে কোনো মানুষ এটাকে খুব সুচারুভাবে করতে পারবে, এতটাই সহজ। এটার মডেলকে অনুসরণ করে জল পরিশোধনের কাজ করা গেছে ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই।

•    ভারতের বাইরে আপনাদের জল পরিশোধনের কাজ সম্পর্কে একটু জানতে চাই।  

বাংলাদেশে সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে জলে আর্সেনিকের সঙ্গে স্যালাইনিটির একটা সমস্যা রয়েছে। সেখানে আমরা সক্ষম হয়েছি ৭৫% স্যালাইনিটি কমাতে। সেই মডেলটাকেই আমরা নিয়ে গেলাম ভিয়েতনামে। ওখানকার মেকং ব-দ্বীপ অঞ্চলে এই কাজটা হাতেকলমে করে দেখালাম। ওরা ছাপ্পান্নটা প্যারামিটার চেক করার পরে আমাদের অ্যাপ্রুভ করেছিল। একটা মডেল তৈরি করে মানুষের কাছে যাওয়া, ব্যবহারকারীদের থেকে ফিডব্যাক নেওয়া, ব্যবহারের কোনো অসুবিধে হলে সমাধানের রাস্তায় হাঁটা – এইভাবেই কাজ করে চলেছি। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা মানে শুধু হাইটেক সায়েন্স বুঝলেই হবে না। পদ্ধতিটাকে বুঝতে হবে, মানুষকেও বোঝাতে হবে, আমরা চেষ্টা করছি সেই লাইনেই চলার। 

 

•    আদিবাসীদের উন্নয়ন, রক্তদান শিবিরের মতো আরও অনেক সামাজিক কাজকর্ম করে থাকে ‘প্রিজম’। আদিবাসীদের নিয়ে আপনার ‘বাঙালির চিমটি’ নামের লেখাটিও পড়েছি। এই কাজগুলো কি বিজ্ঞানচর্চার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কোনো প্রয়াস? 

আসলে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বাইরে কিছুই নয়। পুরোটাই একটা ইনটিগ্রেটেড অ্যাপ্রোচ। আগে ‘প্রিজম’-এর অপরেশনাল এরিয়াটা বলি। এতক্ষণ যে সব কথাগুলো বললাম, যেমন জল পরিশোধনের কথা, এগুলো বেশির ভাগই ক্লায়েন্ট বেসড। যদি কেউ চায় তাহলে আমরা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে দিতে পারি। আবার ধরুন, আমাদের একটা মডেল রয়েছে – ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’। আমরা সারা বাংলা এবং ভারতকে বোঝাতে চাই, সদিচ্ছা থাকলেই বৃষ্টির জল ধরে রাখা সম্ভব। আমরা করে দেখিয়েছি, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ৪১% ভৌম জল আমরা সারা বছরে ব্যবহার করি, আর আর বাকি ৫১% জল আমরা ব্যবহার করি বৃষ্টির জল ধরে রেখে তার থেকে। হিসেবটা যদি এভাবে রাখি, তাহলে আরও বাড়াতে পারব। ‘প্রিজম’-এর এইসব পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গাগুলোর মধ্যে একটা গোবরডাঙাতে আছে, একটা বসিরহাটে। বসিরহাটের কাছে সংগ্রামপুরে আমাদের জৈব কৃষির কাজ হয়, সেখানকার অনেক চাষিকে সেগুলো হাতে কলমে শেখানো হয়, এবং তারা সেগুলোকে প্র্যাকটিস করে। এছাড়া আলিপুরদুয়ারের বন্ধ চা বাগানগুলোতে আমাদের কাজ হয়। সেখানে যাদের নিয়ে কাজ হয়, তারা সবাই ওখানকার আদিবাসী মহিলা। তাদের মধ্যে ওঁরাও বেশি, আর আছে মেচ, খাড়িয়া, মুন্ডা মেয়েরা। সেখানকার আদিবাসী পরিবার, চা বাগানের কুলি-কামিনদের নিয়ে আমরা কাজ করি। সুতরাং, তাদের চাহিদাগুলোও আমাকে বুঝতে হয়, তাদের সমস্যাগুলোকে সমাধান করার কথা ভাবতে হয়। সেখানে সবার প্রথমে আমরা যে বড়ো কাজ করেছি, তা হল, আদিবাসীদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। তাদের বলা হল, আমরা মডেল বানিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের বিনা পয়সায় তো দিতে পারব না, তবে ভর্তুকিতে দেব। আমরা অন্যদের থেকে যে দাম নিই, সেই দামে তোমাদের দিচ্ছি না। তোমাদের থেকে দাম নিচ্ছি শুধু আমাদের খরচটুকু মেটানোর জন্য। এই টাকাও একবারে দিতে পারেন না অনেকে। তখন ইনস্টলমেন্টের মাধ্যমে টাকা নিলাম। ১০০% খরচ উঠে এল তাতে। এই কাজের ফলে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেল আদিবাসী সমাজে। তারা সেই মডেল ব্যবহার করে চলেছে ২০১১ সাল থেকে কোনো সমস্যাই নেই।

•    উত্তরবঙ্গে বিজ্ঞানের প্রসারে ‘প্রিজম’ আর কী কী করেছে?

আমরা আদিবাসীদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রিন স্কাউটিং শুরু করেছি। উদ্দেশ্য, তাদের পরিবেশরক্ষার পাঠ দেওয়া। সেই গ্রিন স্কাউটিং-এর মধ্যে আছে প্রায় ২ হাজার বাচ্চা। আগে প্রত্যেক মাসে একটা করে ক্যাম্প করতাম। এখন প্রতি দু’মাসে একটা করে ক্যাম্প করছি। ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের একটা কর্মসূচি আছে, যার নাম ‘বিজ্ঞান প্রসার’। এই ‘বিজ্ঞান প্রসার’-এর যে নেটওয়ার্ক আছে, তার সঙ্গে এদেরকে যুক্ত করে দেওয়া হল। গোটা আলিপুরদুয়ার জুড়ে আমরা নিজেদের ১৪টা বিজ্ঞান ক্লাব তৈরি করেছি। প্রত্যেক মাসে সেগুলোতে অনুষ্ঠান হয়। কোনো মাসে সাপে কামড়ানোর ওপর হচ্ছে, কোনো মাসে ফার্স্ট এইড নিয়ে হচ্ছে, তো কোনো মাসে হচ্ছে জৈব খাবারের ওপর। এইভাবেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আমাদের জীবন। 
 

Developed by DXDasia