সাইকেলে ট্রান্স আফ্রিকা পাড়ি দিয়েছিলেন বাংলার অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়

হিমালয় ভালোবেসে তাঁর নেশা ও পেশার জগৎ পাহাড়ময়

২০১২। হঠাৎই অনিন্দ্য ওরফে রাজাকে দেখা গেল সাইকেল চালিয়ে চলেছেন আফ্রিকা মহাদেশের মধ্য দিয়ে।  হিমালয়-গুরু এইচ ডব্লিউ টিলম্যানই তাঁকে টেনে নিয়ে গেল। ১৯৩২-৩৩ সালে তিনিও তো একটা সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল নিয়ে আফ্রিকা মহাদেশ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। স্বীকার করলেন, অনেকটা তাই, এ সফর ট্রিবিউট টু টিলম্যান। আর পাহাড় পাহাড় পাহাড় – একটু একঘেয়েও লাগছিল। তাই চাঁদের পাহাড়ের দেশে বিষুব রেখা থেকে মকরক্রান্তি রেখা ছুঁয়ে দেখার যাত্রা। বলা যায় ভারত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ছুঁয়ে এলেন এক একক অভিযানে। 

সে পথে পার হয়েছেন কেনিয়ার উচ্চভূমি, গ্রেট রিফ, মাসাই স্তেপ, ঐতিহাসিক বন্দর শহর দার-এস-সালাম। পাড়ি দিতে হয়েছে নিকুমি ন্যাশনাল পার্ক কিংবা সাও হিলের অরণ্য। লিভিংস্টোন মাউন্টেনস-ভিক্টোরিয়া ফলস-বুশম্যান ল্যান্ড পেরিয়ে ট্রান্স কালাহারি হাইওয়ে ধরে অবশেষে  পৌঁছেছেন আটলান্টিকের তীরে নামিবিয়ার ওয়ালভিস বে-তে। মহাদেশের পাঁচটি দেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। ২০১২ সালের ২৪ জুন শুরু হয়েছিল এই সফর। কেনিয়ার এক গ্রাম নানউকি থেকে। প্রায় ৫৩৩৩ কিমি পাড়ি দিয়ে ৬৯ দিনের যাত্রা শেষ হয় ২ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে সাইকেল চালিয়েছেন ৪৯ দিন এবং ৪৫০০ কিমি।   

পাহাড়-সাগর-গভীর অরণ্য-মরুভূমি-বুশম্যান-মাসাইদের দেশে একটি সাত গিয়ারের সাইকেল নিয়ে যাত্রা। ভুল বললাম। বলা যাক দ্বিচক্র অভিযান। সঙ্গে স্টোভ, টেন্ট আর প্রয়োজনীয় টুকিটাকি। ভয় দেখিয়েছিল অনেকেই। বলেছিল, এ পথে বিপদ রয়েছে। খুব কম হলে সাইকেল কেড়ে রেখে দেবে। সফরের পদে পদে আসল অভিজ্ঞতা অজস্র মানুষের বন্ধুত্ব। তারা কেউ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ নিমন্ত্রণ করে নিয়ামা আর উগালির ভোজ দিয়েছেন। কখনও সঙ্গে ছিল ছোটো ছোটো সিপা মাছ। নিয়ামা মানে বিফ আর উগালি ভুট্টার আটা। গরম জলে মাখা মণ্ড। সাধারণ মানুষ তাঁরা। সে রান্নায় কোনও মশলাদারি নেই। তবে, আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি ছিল না। উগালিকেই যাত্রাপথে স্টেপল ফুড বানিয়ে নিয়েছিলেন অনিন্দ্য। কখনও স্রেফ পাঁউরুটি। মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু মাংস। স্বল্প বাজেটের অভিযাত্রী। একবার একটু সাধ হয়েছিল ভালোমন্দ খাবার। সে অভিজ্ঞতাটা শোনা যাক। একদিন নামিবিয়ায় এক রিসর্টে মুখ বদলানোর সাধ হল। ডিনারের অর্ডার দিয়ে দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর একটু খোঁজ নিতে জানা গেল, দাম সেখানকার কারেন্সিতে দেড়শো ডলার বা সাড়ে আটশো টাকা। পত্রপাঠ বাতিল করতে হল অর্ডার। বদলে স্যুপ-পাঁউরুটিও মিলল না। চুপচাপ বই নিয়ে বসে পড়লেন। ভাবছেন জল দিয়ে পেট ভরাবেন কি না। এমন সময় রিসর্টেরই এক মহিলা একটা বড় প্যাকেট তার সামনে নামিয়ে রাখলেন। বললেন, খেয়ে নাও। খুলে দেখা গেল এলাহি কারবার। মুরগির ঠ্যাং, শুয়োরের পাঁজর, আপেল…। পয়সা? না, পয়সা তিনি চাননি। উলটে, প্রবল শীত থেকে বাঁচার জন্য একটি কম্বলও দিলেন।

তাঁর আফ্রিকা অভিযানের এই অভিজ্ঞতা বন্দি করেছেন দুই মলাটে। বইটির নাম, ‘অতএব আফ্রিকা।’

হিমালয় ভালোবেসে তাঁর নেশা ও পেশার জগৎ পাহাড়ময়। হিমালয় তো বটেই, অ্যাডভেঞ্চারের টান তাকে নিয়ে গিয়েছে কখনও আল্পসে, কখনও গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এমনকি তানজানিয়ায়। হিমালয় আসলে তার রক্তের টান। পরিবারের একজন যেন। আড়াই বছর বয়সে প্রথম হিমালয় যাত্রা। আক্ষরিক অর্থেই বাপ-জ্যাঠার কাঁধে চেপে। সেটা ১৯৭৩ সাল। সেবার ছিল পারিবারিক গোমুখ যাত্রা। জ্যাঠা সুজল মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত পর্বতারোহী। দার্জিলিং হিমালয়ান ইন্সটিটিউটে তেনজিং নোরগের কাছে যাঁর পর্বতারোহনের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ। সে বাড়ির ছেলে শেষ পর্যন্ত চাকরির মায়া ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন হিমালয়ান এক্সপিডিশন গাইডের পেশা। ১২ বছর যাবৎ বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে কখনও শিবলিঙ কখনও, কামেট কখনও বা নন্দাদেবী ইস্ট। আরও হরেক শৃঙ্গে শৃঙ্গে আরোহন। বছরে পাঁচ-ছ’মাস তাই হিমালয়েই কাটে তাঁর।

আগামী দিনে আরও সফল অভিযানের জন্য অনিন্দ্যকে বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে আগাম শুভেচ্ছা। 

(ছবিসূত্র- অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের ফেসবুক প্রোফাইল) 
 
        
 

Developed by DXDasia