‘টালোবাসা’-ই কি চন্দ্রবিন্দুর সর্বশেষ অ্যালবাম?
কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি পোস্ট প্রায় তোলপাড় ফেলে দেয়, বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দু (Bangla Band Chandrabindoo)-র নতুন অ্যালবাম ফিরছে এক যুগ পর। ২০১২ সালে মুক্তি পেয়েছিল চন্দ্রবিন্দুর নবম অ্যালবাম ‘নয়’। তারপর কেটে গেছে এতগুলো বছর। গত দু-আড়াই বছর ধরেই শোনা যাচ্ছিলো চন্দ্রবিন্দু অ্যালবাম নিয়ে ফিরছে, শেষ পর্যন্ত সে ফিরলো। প্রকাশিত হতে চলেছে চন্দ্রবিন্দুর দশম অ্যালবাম টালোবাসা (Talobasa)। তবে এই কামব্যাক শুধুই কামব্যাক নয়, শাহরুখ বা বিরাটের কামব্যাককেও হার মানাবে চন্দ্রবিন্দুর ফিরে আসা। চন্দ্রবিন্দুর দশম অ্যালবাম ‘টালোবাসা’ আসছে ফিজিক্যাল ফরম্যাটে, লিমিটেড এডিশন লং প্লেয়িং রেকর্ড হিসাবে। চন্দ্রবিন্দুর এভাবে ফিরে আসার গল্পটা ঠিক কেমন ছিল? ‘টালোবাসা’ নিয়ে বঙ্গদর্শন.কম যোগাযোগ করেছিল অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় (Anindya Chatterjee) এবং উপল সেনগুপ্ত Upal Sengupta)-র সঙ্গে। তাঁদের থেকেই শুনে নেওয়া যাক টালোবাসার গল্প।
এখন ক্যাসেট বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রয়েছে সিডি এবং নতুন করে আবার ফিরে আসছে রেকর্ড। আমাদের মনে হল সিডি না করে রেকর্ড করলে একটা চমকপ্রদ ব্যাপার হবে। বাংলা ব্যান্ডের লং প্লেয়িং রেকর্ড আর কেউ করেছে বলে আমাদের জানা নেই : উপল সেনগুপ্ত
এতগুলো বছর পরে, সিঙ্গেলসের যুগে হঠাৎ অ্যালবাম নিয়ে ফেরা কেন?
অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : সিনেমার গান, অন্যান্য কাজকর্ম, মিডিয়ার নানান কাজে মেতে উঠে আমাদের যে কারণটার জন্য গান গাইতে আসা, অরিজিনাল গান শোনানো, সেই জিনিসটাই আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। একটা সময় ছিল চন্দ্রবিন্দুর গোড়ার দিকে যখন আমি, উপল বা চন্দ্রিল, আমরা তিনজন খুব কম ব্যস্ত ছিলাম, শুধুমাত্র এই গানটুকু নিয়েই থাকতাম। সেই জায়গাটা আমাদের ব্যস্ততার কারণে কোথাও একটা হারিয়ে যাচ্ছিলো। আমাদের এত বড়ো সংখ্যক ফ্যান, তাদের একটা দুঃখের জায়গা ছিল চন্দ্রবিন্দুর নতুন অ্যালবাম না আসা। এর আগের অ্যালবাম ‘নয়’ ছিল একটি খুবই পরীক্ষামূলক অ্যালবাম। সেটাকে আমরা খুব জনমনোরঞ্জনকর অ্যালবাম হিসাবে তৈরি করিনি, সেটায় একটা অন্যরকম ভাষ্য ছিল। আমাদের এই দশ নম্বর অ্যালবাম ‘টালোবাসা’ নিয়ে বহুকালের প্রস্তুতি ছিল। আমাদের সারাজীবনের ইচ্ছা ছিল আমরা অরিজিনাল দশটা অন্তত অ্যালবাম করবো যাতে দশটা করে একশোটা অরিজিনাল অ্যালবামের গান আমাদের হয়। এটা নিয়ে আমরা অনেক ছোটোবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেছি, আলোচনা করেছি। সেদিক থেকে এই অ্যালবামটা আমাদের কাছে খুব স্পেশাল। অনেক দেরি করেছি জানি, এর জন্য আমাদের শ্রোতাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যালবামটা তৈরি করে ফেলেছি, শ্রোতারা শুনে যদি একটু ভালোবাসেন তাহলে খুব খুশি হবো।
উপল সেনগুপ্ত : আমরা অনেকদিন ধরেই অ্যালবাম করব, এই কথাবার্তা চলছিল। অ্যালবামের গানও তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গান তৈরির পরে অ্যারেঞ্জমেন্ট, রেকর্ডিং, মাস্টারিং, মিক্সিং নিয়ে তো একটা দীর্ঘ প্রসেস থাকে, সেইটা আর হয়ে উঠছিল না। এই হয়ে না ওঠার দুটো কারণ ছিল, একটা হল আমাদের অন্যান্য কাজে জড়িয়ে থাকা এবং অন্যটি আমাদের খুঁতখুঁতানি। একটার পর একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করছি, পছন্দ হয়নি, আবার বদলাচ্ছি, এই করতে করতে পুরো ব্যাপারটাই পিছিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে পরের বছর, পরের বছর করতে করতে এতগুলো বছর চলে যায়। এখন সবাই একটা বা দুটো করে গান ইউটিউবে ছেড়ে দেয়, কিন্তু আমাদের তো ন-টা অ্যালবাম হয়ে গেছে, স্বপ্ন ছিল সেঞ্চুরি রিচ করার। দশ নম্বর অ্যালবাম আমাদের একশো পার করাবে অ্যালবামের গান হিসাবে। একশো ছাড়ানোর একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা আর কোনো ব্যান্ড এই মুহূর্তে করেছে বলে আমার জানা নেই।

‘টালোবাসা’ অ্যালবামটির একটি কালেক্টার্স এডিশন পাওয়া যাবে ফিজিক্যাল ফরম্যাটে, লং প্লেয়িং রেকর্ড হিসাবে। প্রথমত এই ফিজিক্যাল ফরম্যাট কেন? এবং দ্বিতীয়ত লং প্লেয়িং রেকর্ডই কেন?
অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : ছোটোবেলায় আমাদের গান শোনা শুরু হয় এলপি রেকর্ডে, তারপর একটা সময় ক্যাসেট এল। ক্যাসেট আসায় রেকর্ডের বাজারটা পুরো চলে গেল। তারপর আবার সিডি চলে এল। আমাদের এই এত বড়ো পথ চলায় বারবার ফরম্যাট পরিবর্তন হয়েছে। এটা জীবনের খুব আশ্চর্য সমাপতন, যেখান থেকে আমাদের শুরু, সেখানে আবার ফিরে আসতে হয়। সে ভালোবাসাই হোক বা অন্য কিছু, সবই আসলে একটা বৃত্তের মতো, যেটা সবসময় আমরা বুঝতে পারি না। এখন রেকর্ড নিয়ে আবার সারা পৃথিবীতে হইচই শুরু হয়েছে। আমাদের মনে একটা ইচ্ছাও ছিল, যদি আমাদের একটা রেকর্ডও হয় আর কী, এটা আসলে একটা স্বপ্নের মতো। এই ভাবনাটা আরও বেশি উস্কে দিয়েছে উপল, ব্যক্তিগতভাবে ও প্রচণ্ড উদ্যোগী ছিল এই রেকর্ডটি করার ব্যাপারে।
আমাদের গান, বাজনা, বেঁচে থাকা সবই খুব ছোটো ছোটো কিছু ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল। ওটুকু নিয়েই আমাদের জীবন কেটে যায়। সেই ছোটো ছোটো ইচ্ছেরই একটা হল এই লং প্লেয়িং রেকর্ড। অনেক বন্ধু এটা বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে কৌশিকের কথা বলতে হয়, সে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে থাকে, ও আমাদের খুব সাহায্য করেছে। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটা রেকর্ড হোক যা গুণমানে এবং টেকনোলজিতে সবার থেকে এগিয়ে থাকুক, সেই পুরো ব্যাপারটা ভারতে মোটামুটি ভালো হলেও বিদেশের মতো অতটা ভালো হয় না। এই রেকর্ডগুলো সম্পূর্ণ বাইরে থেকেই তৈরি হয়ে আসছে, এর মাস্টারিং হয়েছে ইউকে-তে, পাবলিশ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে সেদিক থেকে এই সাড়ে তিনশোটি রেকর্ড সত্যিই একটি লিমিটেড এডিশন কালেক্টার্স আইটেম।
আমাদের এই দশ নম্বর অ্যালবাম ‘টালোবাসা’ নিয়ে বহুকালের প্রস্তুতি ছিল। আমাদের সারাজীবনের ইচ্ছা ছিল আমরা অরিজিনাল দশটা অন্তত অ্যালবাম করবো যাতে দশটা করে একশোটা অরিজিনাল অ্যালবামের গান আমাদের হয় : অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়
উপল সেনগুপ্ত : এই যে আমরা দশ নম্বর অ্যালবাম করলাম, সেটা ফিজিক্যাল ফরম্যাটে না থাকলে এর কোনো মানে হয় না। ডিজিটাল ফরম্যাটে অ্যালবাম ব্যাপারটা ঠিক ওভাবে হয় না। এখন ক্যাসেট বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রয়েছে সিডি এবং নতুন করে আবার ফিরে আসছে রেকর্ড। অনেক বিদেশি ব্যান্ড আবার রেকর্ড প্রকাশ করছে। তখন আমাদের মনে হল সিডি না করে রেকর্ড করলে একটা চমকপ্রদ ব্যাপার হবে। বাংলা ব্যান্ডের লং প্লেয়িং রেকর্ড আর কেউ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। প্রথম দিকের কিছু ব্যান্ডের ইপি রেকর্ড ছিল, এলপি ছিল বলে মনে হয় না। আর যদিও বা কারোর থেকে থাকে, তাহলেও কামব্যাক হিসাবে এই রেকর্ড যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মার্কেটিং অ্যাঙ্গেল থেকেও এমন কিছু একটা করার দরকার পড়ে যেটা নিয়ে লোকজন কথা বলবে, হইচই করবে, একটু অবাক হবে। তখন খোঁজখবর নিয়ে, কতটা খরচা লাগবে সেসব জেনে রেকর্ডের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একটা সমাধানে আসা যায়।
২০২২ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেস্ট মিলিউ-তে প্রথমবারের জন্য কোনো পাবলিক পারফরম্যান্সে ‘টালোবাসা’ গানটি গায় চন্দ্রবিন্দু। এই গানটিই নতুন অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক। তবে আর কী কী গান থাকছে এই অ্যালবামে? অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এই ব্যাপারে এখনই পরিষ্কার করে কিছু বলতে চাননি, তবে তিনি জানান, এই অ্যালবামে পুরোনো ‘চন্দ্রবিন্দু’ ফ্লেভারের একটা মিক্স পেতে চলেছে শ্রোতারা। অন্যদিকে উপল সেনগুপ্ত বলেন, আরও দু-একটি গান এই অ্যালবামে আছে ‘টালোবাসা’ ছাড়া, যেগুলি বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা গাইছি। তার মধ্যে ‘প্রধানমন্ত্রী প্লিজ’ গানটির কথা আলাদাভাবে বলা যায়। আমরা কনসার্টে এই গানগুলি ইচ্ছে করেই গাওয়া শুরু করি যাতে অ্যালবাম প্রকাশের সময় দশটি একদম আনকোরা অপরিচিত গান শ্রোতাদের কাছে না পৌঁছে কিছু পরিচিত গানও যেন থাকে।
১৯৯৭ সালে প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের ২৭ বছর পর তারা আজ দশম অ্যালবামের দোরগোড়ায়। সম্ভবত এটি হতে চলেছে চন্দ্রবিন্দুর শেষ অ্যালবাম। কিন্তু শ্রোতারা যদি কখনও আবার নতুন অ্যালবামের জন্য অনুরোধ করেন? মুখ ফেরাতে পারবে চন্দ্রবিন্দু? সে উত্তর দেবে সময়।