সঙ্গতে ছিলেন তবলিয়া শ্রী মৈনাক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তানপুরায় শ্রীমতী পৌলমী চক্রবর্তী
সমস্ত যন্ত্র কিংবা কণ্ঠে অধিষ্ঠিত সুর-স্বর লহরী কখনই সক্ষম নয় স্নায়ু ক্ষরণে, রক্ত রঞ্জনে অথবা মনের কব্জায়। কারণ নিমগ্নতা, অনুভব, সাধনা -এসবকিছু সকলে ধারণ করতে পারে না, যে সব যন্ত্রী অথবা যন্ত্র তা ধারণ করতে পারে সেসব প্রকৃতিই আলাদা; আলাদা করে চেনা-বোঝা-উপলব্ধির। ঝড়ের নাদ, সমুদ্রের মীড়, মেঘের অংশস্বর, পাখির সুরাঙ্গ… প্রকৃতির নানা শব্দ-ভাব-লয় অন্তঃস্থ করে, ধ্বনিকম্পাঙ্ক ধারণে, আরোহণ-অবরোহণের মূর্ছনায় সেই ‘আলাদা করে চেনা-বোঝা-উপলব্ধির’ ইন্দ্রজাল বুনলেন সরোদ বাদক অনিকেত চক্রবর্তী। গত ২৬ অগাস্ট, সন্ধে ৬টায় তাঁর সুর-ভাব-লয়ে ভেসে গিয়েছিল কলকাতার হো চি মিন সরণির আইসিসিআর-এর সত্যজিৎ রায় প্রেক্ষাগৃহ।
মিঞাঁকি মল্লারের ইলম্ (বিদ্যাসিদ্ধি) বড়ো কঠিন। সকলের হাতে বসে না। একে একে আলাপ, জোড়, ঝালা এবং মধ্যলয়ে গাট। মনের ভাষা ছুঁয়ে ফেলছে আঙুল। অনিকেত ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় নিয়ে কনসার্টের শুরুই করেন এই মল্লার রাগটি দিয়ে। শুরুতেই কঠিন এক কাজ। তারপর ১২মিনিট ধরে রাগ খাম্বাজ। তিনি যে মাইহার ঘরানার অন্যতম উপযুক্ত উত্তরসূরী তা টের পাওয়া যাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে এবং যাঁদের কথা না বললেই নয়, তাঁরা হলেন তবলিয়া শ্রী মৈনাক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তানপুরায় শ্রীমতী পৌলমী চক্রবর্তী। পুরো কনসার্ট জুড়ে তাঁদের যথাযথ সঙ্গত অনিকেতের বাদনশৈলীকে নির্মেদ গঠন দিয়ে চলে। 
সাংগীতিক পরিবারেই অনিকেতের জন্ম (১৯৮৮ সালে)। মায়ের কাছেই প্রথম তালিম তারপর ১১ বছর বয়সে পণ্ডিত অলোক লাহিড়ীর কাছে সরোদ শেখা শুরু। ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার দূরদর্শনে বাজান। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ নেন পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্তের কাছে, যাঁর কাছে এখনও তালিম নিয়ে চলেছেন অনিকেত। কিংবদন্তি উস্তাদ ভি. বালসারা, উস্তাদ আশিস খান এবং পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। এপর্যন্ত সরোদ বাদনের জন্য দেশে-বিদেশে বহু প্রসংসা, সম্মাননা, পুরস্কার পেয়েছেন। অনিকেত ন্যাশনাল স্কলারশিপ হোল্ডার এবং রেডিও গ্রেডেড সরোদ শিল্পী। ২০০১ সালে সর্বভারতীয় সংগীত ও সংস্কৃতি পরিষদ থেকে পেয়েছেন সেরা প্রতিভার পুরস্কার। ২০০৫-এ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত একাডেমির পক্ষ থেকে তরুণ প্রতিভার সম্মাননা পেয়েছেন। ‘মনমঞ্জরী ইনস্টিটিউট অফ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ’ তাঁকে দিয়েছে উস্তাদ ধ্যানেশ খান স্মৃতি পুরস্কার (২০১১ সালে), উস্তাদ আলী আকবর খান স্মৃতি পুরস্কার (২০১২ সালে)।
অনিকেতের ‘ওয়েভ অফ সরোদ’ কনসার্টটি আয়োজিত হয়েছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR)-এর ইস্ট জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে। উপস্থিত ছিলেন তাঁর গুরু, ‘মনমঞ্জরী ইনস্টিটিউট অফ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ’-এর কর্ণধার, মাইহার ঘরানার প্রখ্যাত সরোদিয়া পণ্ডিত রণজিৎ সেনগুপ্ত ও শ্রীমতী শিরিন সেনগুপ্ত নাথ। রণজিৎ সেনগুপ্তই সম্ভবত ভারতবর্ষের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আলি আকবর খাঁ এবং রবিশংকরের উপর বিরল দুটি বিষয়ে পিএইচডি করেছেন।
উস্তাদ আলি আকবর খাঁ বলেছিলেন, “অন্তত দশ বছর সংগীত সাধনা করলে নিজে তৃপ্তি পেতে শুরু করবে। বিশ বছর সাধনা করলে তুমি তোমার শ্রোতাদের তৃপ্তি দিতে পারবে। সাধনা ত্রিশ বছর অতিক্রম করলে হয়তো তোমার গুরু তৃপ্ত হতে পারেন; কিন্তু ঈশ্বরকে তৃপ্ত করার জন্য তোমাকে আরো আরো অপেক্ষা করতে হতে পারে …”। অনিকেত বোধহয় সেই সাধনাই করে চলেছেন।