ব্যর্থতাকে আদল দিয়ে যেভাবে নিজেকে গড়েছেন শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত

মায়া-র আড্ডায় ভাগ করে নিলেন দীর্ঘ ৩৭ বছরের শিল্পযাপনের অভিজ্ঞতা

মূর্তি ভাঙা, প্রতিস্থাপন বা অপসারণের ইতিহাস আজকের নয়। একসময় কলকাতা জুড়ে এদিক-ওদিক চোখে পড়তো ব্রিটিশ-সময়ের অপূর্ব সব ভাস্কর্য। আজ তার বেশিরভাগই আমরা দেখতে পাই না কারণ, সেসব অপসারণ করে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল বাংলার মনীষীদের মূর্তি। ব্রিটিশ মূর্তিগুলোর পেডেস্টালেই বেমানানভাবে বসানো হয় সেগুলো। পেডেস্টাল যে ভাস্কর্যের ভিত্তি, একথা কেউ মনে রাখেনি। আবার, সত্তরের দশকে যখন শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে অশ্বারোহী নেতাজির মূর্তি বসানো হয়েছিল, তার জন্য অত্যাধুনিক পেডেস্টাল বানিয়েছিলেন ভাস্কর সুনীল পাল, যা কলকাতায় বিরল। শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত পরিকল্পিত তথ্যচিত্র কলকাতার মূর্তিকথা-তে এমনই রোমাঞ্চকর সব তথ্য জানাচ্ছিলেন প্রখ্যাত ভাস্কর বিমল কুণ্ডু।

মায়া আর্ট স্পেস-এর ১৫৭তম মায়া আড্ডার অতিথি ছিলেন পার্থ দাশগুপ্ত। নিতান্তই রুখাশুখা তাত্ত্বিক আলোচনা নয় বরং এই আড্ডা শেষত হয়ে উঠেছিল মূল্যবান সব অভিজ্ঞতা, স্মৃতিমালায় গাঁথা এক দ্যোতনা।

জনসাধারণের কাছে পার্থ দাশগুপ্ত একজন বিশিষ্ট পুজোশিল্পী। দুর্গাপুজোর ব্যতিক্রমী মণ্ডপ নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা এবং ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। শ্রম-অধ্যাবসায়ই তাঁকে এই ‘পপুলারিটি’ দিয়েছে। অবশ্যই এটা ইতিবাচক দিক কিন্তু, তাঁর শিল্পচর্চা কি দুর্গাপুজো-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ? অনেকেই অবগত নন যে, চিত্রকর, সেরামিক শিল্পী, ইন্সটলেশন শিল্পী, শিল্পশিক্ষক, শিল্পগবেষক –শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত-র নানাবিধ দিক আছে। এই দিকগুলি তাঁর জীবনে কিছুটা প্রাকৃতিকভাবে, কিছুটা ঘটনাচক্রে জুড়ে গেছে। এই নিয়েই তাঁর দীর্ঘ ৩৭ বছরের শিল্পযাপন। সেই যাপনের প্রাত্যহিক শিল্পচর্চার বহুমুখী অভিজ্ঞতাই তিনি ভাগ করে নিচ্ছিলেন এক সান্ধ্য-আড্ডায়।

গত ৪ ডিসেম্বর, বুধবার মায়া আর্ট স্পেস-এর ১৫৭তম মায়া আড্ডার অতিথি ছিলেন পার্থ দাশগুপ্ত। এদিন ড্রয়িং, সেরামিক, পুজো-নির্মাণ, গবেষণা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রদর্শন করেন তাঁর পরিকল্পনায় নির্মিত তথ্যচিত্র। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে উস্কে দিতে সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও শিল্প-ইতিহাসবিদ দেবদত্ত গুপ্ত।  নিতান্তই রুখাশুখা তাত্ত্বিক আলোচনা নয় বরং এই আড্ডা শেষত হয়ে উঠেছিল মূল্যবান সব অভিজ্ঞতা, স্মৃতিমালায় গাঁথা এক দ্যোতনা। শ্রোতারা উপভোগ করছিলেন, উজ্জীবিত হচ্ছিলেন, বার বার অকৃতকার্য হওয়া বিশিষ্ট এক শিল্পীর ঘুরে দাঁড়ানোর আখ্যানে। শুরু করেছিলেন গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজে তাঁর ‘ট্র্যাডেজি’ময় শিল্পশিক্ষা দিয়ে। বলছিলেন, কীভাবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বারবার অনুত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাঁকে ‘দাবায়ে রাখা যায়নি’।

ছোটোবেলাতে নিজে নিজেই ঠিক করে রেখেছিলেন আর্ট কলেজে পড়বেন এবং সেটা কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজেই। সেইমতো ১৯৮৫ সালে পরীক্ষাও দিলেন পশ্চিমী শিল্পধারার পেটিং-এ। অনুত্তীর্ণ হলেন। তখন নিয়ম ছিল ভর্তি হতে হবে ২০ বছর বয়সের মধ্যে। পার্থ’র হাতে তখন আরও একবছর সুযোগ ছিল। এর মধ্যেই পরিচয় শিল্পী বাঁধন দাস-এর সঙ্গে। প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য তাঁর পরামর্শ নিয়ে আউটডোর ড্রয়িং প্র্যাকটিস করে আবার পরীক্ষা দিলেন। আবারও অনুত্তীর্ণ। এবারে হতাশ হয়ে পড়লেন এই ভেবে যে আর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু, কোনও এক অমোঘ টানে গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজে পড়ার ইচ্ছেকে কোনওভাবেই দমাতে পারছিলেন না। দিনের পর দিন কলেজের সিঁড়িতে বসে থাকতেন। এই বসে থাকা লক্ষ্য করেছিলেন টেক্সটাইল বিভাগের পড়ুয়া নির্মল বসু। তাঁর পরামর্শেই সরাসরি অধ্যক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন পার্থ। সে যাত্রায় আবারও একটা সুযোগ পেয়ে যান। সেবছর টেক্সটাইল আর সেরামিক বিভাগে তেমন ভালো ছাত্র না পাওয়ায়, আবার প্রবেশিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

মায়া আর্ট স্পেস-এর ১৫৭তম মায়া আড্ডার অতিথি ছিলেন পার্থ দাশগুপ্ত। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে উস্কে দিতে সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও শিল্প-ইতিহাসবিদ দেবদত্ত গুপ্ত

তাঁর করা বাছাই কিছু নামাঙ্কন, অলংকরণ দেখাচ্ছিলেন

শেষ সুযোগটাও প্রায় হাতছাড়া করে ফেলছিলেন। টেক্সটাইলে পরীক্ষা দেওয়ার আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পরই তাঁর সঙ্গে বাঁধন দাসের আবারও দেখা। বাঁধন সদ্য বিদেশ থেকে ফিরেছেন গ্লাসের কাজ শিখে। পার্থকে বললেন, সেরামিকে পরীক্ষা দিতে। পার্থও বুঝতে পারেন, গন্ডোগোল বাঁধিয়েছেন তিনি। তাই, টেক্সটাইলে পরীক্ষা না দিয়ে গুরুর কথা মতো সেরামিকে পরীক্ষা দেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নেন। এবং নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। শেষপর্যন্ত তাঁর ইচ্ছেকে মান্যতা দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ এবং উত্তীর্ণদের নামের তালিকায় বিশেষ ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নাম। এইভাবে, বিড়ম্বনাকে সঙ্গে করেই তাঁর জীবনে এসে পড়েছিল সেরামিক। পরবর্তীতে সেই সেরামিকই তাঁকে নিয়ে গেছে ভারতে প্রথম সেরামিকস ট্রাইয়েনিয়ালে। এছাড়াও যোগদান করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থাপত্য প্রকল্পে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক সেরামিক প্রদর্শনীতে। সেরামিক নিয়ে বইও লিখেছেন।

প্রতিদিন নিয়ম করে ড্রয়িং নথিবন্ধ করেন খাতায়

কিছু গড়ার আগে নিজেকে গড়তে হয়। তবেই আকার পায় ভাবনা। ড্রয়িং, নামাঙ্কন, অলংকরণ, সেরামিক অথবা মণ্ডপ-পরিকল্পনা … পার্থ দাশগুপ্তকে শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছে আর্ট কলেজের সিঁড়িতে বসে থাকা দিনগুলো, তাঁর শিল্পশিক্ষার প্রতিটি ধাপ। মাস্টারমশাইরা, বন্ধুত্ব, যৌথতা, পরিবার, বিভিন্ন মাধ্যম বারবার তাঁর শিল্পসৃষ্টির পাথের হয়েছে। আসলে আড্ডার ছলে পার্থবাবু এদিন বোধহয় একটা কথাই বারবার বলতে চাইছিলেন, “অন্ধকারের উৎস-হতে উৎসারিত আলো/ সেই তো তোমার আলো/ সকল দ্বন্দ্ববিরোধ-মাঝে জাগ্রত যে ভালো/ সেই তো তোমার ভালো।”

Developed by DXDasia