বাংলার সেরামিক্স শিল্পীরা এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সারা পৃথিবীতে

সেরামিক্স শিল্পে একই সঙ্গে ভাস্কর্য এবং চিত্রকলার সংমিশ্রণ দেখা যায়

সেরামিক্স শিল্প মৃত্তিকাবাহন। এ শিল্পের মাটিতেই প্রাণ, মাটিতেই পুষ্টি। পরিভাষায় সেরামিক্স বলতে আমরা পোড়ামাটি বুঝি। আবার টেরাকোটা মানেও পোড়ামাটি। ফলে এটা সহজেই অনুমেয় যে নরম মাটিতে নির্মাণ করে, তাপপ্রয়োগে তা মজবুত করে যা কিছু সৃষ্টি হয় তা সবই সেরামিক্স গোত্রের। তাই বাড়ি তৈরির মাটির ইট, ঘরছাওয়ার টালি থেকে শুরু করে পাতকুয়োঁর বেড়ি, বিদ্যুৎরোধী সরঞ্জাম, গৃহসজ্জা সামগ্রী, পুতুল, মূর্তিভাস্কর্য এ সবই সেরামিক্স মাধ্যমের অন্তর্গত। মৃত্তিকাবাহিত।

শিল্পভাষা প্রকাশের আদি মাধ্যম মাটি। তবে মাটি দিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু নির্মাণ করতে গেলে প্রকৃত শিক্ষা লাগে। এই বাংলায় সেরামিক্স শিল্প প্রতিষ্ঠান মোটে দু’টি। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি সেরামিক্স প্রকরণ কৌশল শেখানোর বিজ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র।

শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম কলকাতার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়,  শান্তিনিকেতনের কলাভবন ও শিল্পসদন। দু’য়ের মধ্যে বয়স এবং কর্মভারে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়, কলকাতা, প্রবীণতার দাবি রাখে। 

এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা শিল্পীকুল বর্তমানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ভারতে ও বহির্ভারতেও। এই নব্বই দশক অবধিও হিন্দিবলয়ের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। সে দাপট এখন অনেকটাই স্তিমিত। এর জন্য অবশ্য বহুশ্রম দায়ী। বয়সে প্রবীণ হলেও সরকারি আর্ট কলেজের সেরামিক্স বিভাগ এই সেদিন পর্যন্ত অতি নিষ্প্রভ ছিল। একটি কাঠের বাক্সে মমি সংরক্ষণের মতো গুটিকয় পেয়ালা, ফুলদানি, কলমদানি বর্তমান অবন গ্যালারির দ্বারপ্রান্তে শোভা পেত। বিভাগীয় মাস্টারমশাইরা যখন অবসরের দোরগোড়ায় তখন এই বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের আকুতিতে সাড়া দিলেন বাঁধন দাস। মূলত তারই চেষ্টায় আজকের এই বাংলায় সেরামিক্স শিল্পচর্চা সাবালক হয়েছে। বাঁধন দাস, সেরামিক্স বিশারদ ছিলেন না। বিজ্ঞানভিত্তিক সেরামিক্স চর্চায় বিশেষ আগ্রহীও ছিলেন না। কিন্তু, আশ্চর্যভাবে যা ছিল তা হল, ওঁর বিষয়টিতে ভালোবাসার ও বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গ করার তাগিদ ছিল। যার ফলে সেরামিক্স পটারির ডিপার্টমেন্টে তাঁর দিনরাত উপস্থিতি প্রাণসঞ্চার করেছিল। 

নব্বই-এর শেষ দিক থেকে যে সব ছাত্ররা এই বাংলায় সেরামিক্সচর্চায় লিপ্ত হয়েছিল পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে গত কুড়ি বছরেরও উপর তারা এই সেরামিক্স নিয়েই পড়ে আছে। কেউ উচ্চশিক্ষার্থে কলাভবনে গেছে, কেউ আমেদাবাদে এন.আই.ডি-তে। কেউ বহির্বিশ্বে এবং বেশ কিছু ছাত্র কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজেই উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করেছে। পেশাবদল করেছে খুবই সামান্য কয়েকজন। যার ফলে এই বাংলায় কর্মক্ষম পাঁচ প্রজন্মের সেরামিক্স শিল্পীদের দেখা মেলে। পরবর্তীরাও এগিয়ে আসছেন বিপুল ভাবে। 

একেবারে প্রথম প্রজন্মের প্রভাস সেন, রঘুনাথ সিংহ, অজিত চক্রবর্তীদের স্মরণ করে পরবর্তী প্রজন্মের টিঁকে থাকা নাম উল্লেখ করলাম। ১৯৮৯-’৯২ সালের ব্যাচ অনিত্য রায়, গৌতম দাস, প্রতিবেদক পার্থ দাশগুপ্ত (আমি এখনও পেশাবদল করিনি তাই নাম গোপনের উদারতা দেখালাম না। তাতে ইতিহাস বিকৃত হত), পার্থ দে। ১৯৯২-’৯৫ – চন্দন দাঁ, স্বপন জানা, মুক্তা দে, পল্লব দাস, মনোজ দাস, মনোজ প্রজাপতি, জয়া বোড়ো। ১৯৯৫-’৯৮- দেবাশিস দাস, দীপঙ্কর কর্মকার, আশিস চৌধুরী, দেবজিৎ চক্রবর্তী, পায়েল প্রসাদ, জয়ন্ত প্রসাদ, জয়ন্ত চৌধুরী প্রভৃতি। ১৯৯৮ থেকে প্রায় সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন সুদেব মণ্ডল, কৃষ্ণগোপাল গুছাইত, গার্গী ঘোষ, স্বরূপ নন্দী, অভিজিৎ ঘোষ, শুভ্রা দাস, সঞ্জয় সামন্ত, চিত্তরঞ্জন সাহা, মৌসুমি রায় এবং একেবারে হালফিলে শিবরাম দাস, অর্ণব মান্না, শুভজিৎ মণ্ডল, ফাল্গুনি সামন্ত, সর্বান চৌধুরীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন চতুর্দিকে। মাটিকে কেন্দ্র করে যাবতীয় গোল, গোলাকার এবং গোলাকৃতি আকারকে টপকে গিয়ে একেবারে ভিন্ন স্বাদের সেরামিক্সের কাজ বাংলাতে দেখা যাচ্ছে।  এবং সারা ভারতের অতিগুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তা মাথা তুলছে অবিরত। 

যার ফলশ্রুতি হিসাবে এই উদাহরণটি যথেষ্ট বলে মনে হয় – বিগত ১২ বছরে এই বাংলায় জাতীয় প্রদর্শনী থেকে ভাস্কর্য বিভাগে পুরস্কার জুটেছে চারটি। তার মধ্যে তিনটি সেরামিক্স। প্রাপক প্রসূন ঘোষ, দেবাশিস দাস ও শুভজিৎ মণ্ডল। ভারতের আরও একটি অন্যতম সেরামিক্স শিল্পচর্চা কেন্দ্র ‘দিল্লি ব্লু পটারি’। ভারতে সেরামিক্স শিল্পচর্চার ভগীরথ বলে স্বীকৃত। তারা প্রতি বছর ভারতের শ্রেষ্ঠ সিরামিক্স শিল্পী ও শিল্পকর্ম নির্বাচন করে ও সম্মানিত করে। সেই আঙিনাতে বাংলার জয়ধ্বজা উড্ডীন। বিগত কয়েক বছরে সম্মানপ্রাপক বাংলার দু’জন আশিস চৌধুরী ও কৃষ্ণগোপাল গুছাইত। 

সেরামিক্স শিল্পের যাত্রাপথ স্বকীয়। একই সঙ্গে এখানে ভাস্কর্য এবং চিত্রকলার সংমিশ্রণ দেখা যায়। শুধুমাত্র ভাস্কর্য বা তৈজস নির্মাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর সামগ্রিক রূপ ধরা পড়ে না। একই রাগিণী সেতারে বাজলে একরকম এবং সরোদে বাজলে অন্যরকম। এই অন্যরকম অনুভূতিটাই একে স্বকীয় করেছে। মাটির মিশ্রণে, প্রকরণে ও স্পর্শগুণে।     

Developed by DXDasia