
গাইতোন্ডে থেকে গণেশ হালুই এই পরিক্রমায় বাঁধন দাসের নাম সংযোজিত হতে যাচ্ছিল অচিরেই
ভারতবর্ষের অ্যাবস্ট্রাক্ট বা Non-Objective চিত্র নির্মাণেরর যে গুটিকয় চরিত্র, তার মধ্যে বাঁধন দাস নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ইঙ্গিত দিয়ে ছিলেন মৃত্যুর পূর্ববর্তী কাজেও। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে অকালে চলে যান তিনি । ১৯৬৬ তে কলকাতার Govt. Art College এর থেকে প্রথমে Painting এবং ৬৮ তে সেরেমিক্স নিয়ে তার পাঠক্রম শেষে করেন। তারপর সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক জীবনযাপন। বামপন্থায় বিশ্বাসী শিল্পীর দিন কাটত যুবউৎসবের পোস্টার আঁকা, মঞ্চ সাজানোতে। Govt. Art College-র মাস্টারমশাই হয়ে যোগদানের পর আরও নানান হুজুগ যুক্ত হয় তার সাথে। এই সব মিলিয়েই এক অতিজনপ্রিয় সাংগঠনিক চরিত্রের প্রকাশ দেখা যায় তাঁর মধ্যে। এলোমেলো জীবনযাপনের নানান সংঘর্ষ হয়তো তার শিল্পের ভিত্তি রচনা করে দেয়। ১৯৮০ পরবর্তী সময় থেকে প্রথমে বিক্ষিপ্তভাবে এবং ক্রমশ একনিষ্ঠভাবে তিনি ছবির জগতে প্রবেশ করতে থাকেন। শেষ দিকের ছবিতে যে ধ্যানগম্ভীর ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল তাতে ভারতের Non Objective শিল্পধারায় এ অন্যতম সংযোজন এর ইশারা পাওয়া যাচ্ছিল। Gaitonde থেকে Ganesh Haloi এই পরিক্রমায় বাঁধন দাসের নাম সংযোজিত হতে যাচ্ছিল অচিরেই। কিন্তু তার চলে যাওয়াতে গোটা শিল্পসমাজের আশাভঙ্গ হয়। মৃত্যুর পরে তাঁর কাজের হালহদিশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বাঁধন দাসের ভূমিকা শুধুমাত্র শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরিতে দুর্গোৎসবের প্রাণপুরুষ বলেই সীমাবব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
Touching the Tangible শীর্ষক যুগপৎ কলকাতা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্ট এবং শান্তিনিকেতনের নন্দনে অনুষ্ঠিত তাঁর পূর্বাপর কাজের প্রদর্শনীতে ওঁর আঁকিবুকি, ছবি এবং সেরামিক্স দেখে যারপরনাই বিস্মিত হওয়া গেল। ধন্যবাদ প্রাপ্য অবশ্যই চিত্রা এবং আশিস ঘোষের। সম্পর্কে আত্মীয় একদা ছাত্র এবং শান্তিনিকেতন নিবাসী আশিস অতি যত্নে বাঁধনবাবুর কাজগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন এতদিন।
মৃত্যুর প্রায় ১৫ বছর বাদে অধুনাবিস্মৃত কাজগুলো তাঁর জীবনযাপনের সূত্র হয়ে ধরা দেয়।
প্রাথমিক পর্যায়ের পেন্সিল, কন্টি, কাঠকয়লা এবং ভুষোকালির কাজগুলোর পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ শেষের দিকের কাজগুলো স্তম্ভিত করে দেয় আমাদের। প্রবল ঝঞ্ঝার পর ক্রমশ নৈঃশব্দ্য গ্রাস করে নেয় যেন আমাদের। অযুত আলোকবর্ষ পেরিয়ে এক কৃষ্ণগহ্বর থেকে আরেক কৃষ্ণগহ্বরে যাত্রা যেন। এই অন্তিম পর্যায়ে তিনি নিযুক্ত হয়েছিলেন Ceramics এর কাজে। গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের সেরামিক্স বিভাগের যে বর্তমান চাকচিক্য তা বাঁধনবাবুর কৃচ্ছ্বসাধনেই সম্ভব হয়েছে। ওঁর করা সেরামিক্স-র মুখোশগুলো পূর্বভারতে সেরিমিক্স চর্চার উদাহরণ স্বরূপ – একথা নির্দ্ধিধায় বলা চলে।
প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। প্রণবরঞ্জন রায়, সৌমিক নন্দীমজুমদার, আর শিবকুমার, তপন ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী এবং এই প্রতিবেদক নানান পরিপ্রেক্ষিতে বাঁধন দাস এবং তাঁর কাজের সালতামামি দিয়েছেন।
সমগ্র প্রদর্শনী অতি মূল্যবান বর্তমান সময়ের কাছে। তার পাশাপাশি তা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের কাছে নিয়ে যায় আমাদের যে এই কাজগুলির স্থায়ী সংরক্ষণের কী হবে? বাঁধন দাস শান্তিনিকেতনে এক শিল্পাবাস নির্মাণ করে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু গুটিকয় আত্মীয় বন্ধুদের আবেগ কি বাচিয়ে রাখতে পারবে তাঁকে?
