
আজ যাঁর জীবনের কথা বলতে বসেছি- লীলা মজুমদার, তিনি তো আমাদের সবার ছেলেবেলা জড়িয়ে রয়েছেন, কাজেই আজ আগে তাঁর ছেলেবেলা, তাঁর পূর্বপুরুষদের কথা একটু ঝালিয়ে নিলে বেশ হবে কিন্তু! তারপর তাঁর প্রসঙ্গে বাকি কথায় আসব এখন।
সে এক ভারী সুন্দর দেশ। আম-কাঁঠালের বন-জঙ্গলে ঘেরা, আঁকাবাঁকা পথ-ঘাট, ইয়াব্বড়ো সব পুকুর-দীঘি, পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদী। সব মিলিয়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ জায়গা ওপারবাংলার মৈমনসিংহ জেলার মসুয়া গ্রাম। সেখানকার মানুষগুলোও ভারী অমায়িক। কেউ কারো ক্ষতি করে না, একে অপরের দুঃখ-কষ্টে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়, উৎসবের সময় সবাই একসঙ্গে হইহল্লা করে, গরিব লোক, ধনী লোক এসবের বালাই-ই নেই। এই মসুয়া গ্রামেই এসে ঘর বেঁধেছিলেন রামনারায়ণ। তাঁর পদবী তখন মজুমদার। এই রামনারায়ণের আগের ন’পুরুষ ছিলেন রামসুন্দর দেব- ইনি আজ থেকে শ’চারেক বছর আগে পনেরশো আশি থেকে ষোলশ সালের মধ্যে এক সময় নদিয়া জেলার চাকদহ অঞ্চল থেকে কোনও কারণে চলে আসেন ময়মনসিংহের শেরপুর পরগণা বলে একটি জায়গায়। প্রথমে এই শেরপুরের জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করতেন রামসুন্দর। পরে তাঁর কাজের গুণে তিনি স্বয়ং জমিদারের সুনজরে এলে পর, জমিদার মশাই তাঁকে যশোদলের জমিদার রাজা গুণিকচন্দ্র বা গুণীরাম রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই জমিদারের বোনের সঙ্গে রামসুন্দরের বিয়ে হয় এবং তিনি জায়গির লাভ করে যাকে বলে একেবারে ফুলে ফেঁপে ওঠেন।

জন্ম কলকাতাতে হলে কী হবে- তাঁর আশৈশব জড়িয়ে রয়েছে পাকদণ্ডীর আঁকা-বাঁকা পথ, পাইনের জঙ্গল আর পাহাড়-ঘেরা শিলং শহর। গোড়ার দিকে তাঁরা থাকতেন শিলং-এর লাবানপাড়া বলে একটা জায়গার ব্রাহ্ম মন্দিরের ওপরের একটা ছোটো বাড়িতে।
এই যে, আজ যে রায়পরিবারকে আমরা চিনি, জানি- সেই রায়পরিবারের আদি পুরুষ হিসেবে ধরা হয় এই রামসুন্দর দেবকে। এখন কথা হচ্ছে, অনেকেরই খটকা লাগতে পারে রায়পরিবারের আদি পুরুষের পদবী রায়চৌধুরী বা রায় না হয়ে দেব হল কেন? তাহলে ব্যাপারটা খুলে বলি। এই রামসুন্দর দেব তাঁর জীবনের গোড়ার দিকে বিহার প্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন। তখন তাঁদের পদবী মোটেই দেব ছিল না। নামের শেষে তাঁরা লিখতেন দেও। তাহলে কী দাঁড়াল? দেও থেকে দেব, তারপর দেব থেকে এই পরিবার কালের গতিতে নানান উপাধী পেলেন। যেমন- মজুমদার, যেটি ব্যবহার করতেন রামনারায়ণ, তাছাড়া খাসনবিশ, রায়চৌধুরী, রায় একে একে যুক্ত হল। এই রামনারায়ণের পরের এক বংশধর ছিলেন কৃষ্ণজীবন। তাঁর দুই ছেলে- বিষ্ণুরাম আর ব্রজরাম। এই ব্রজরামের পরের তিন প্রজন্ম হলেন- রামকান্ত, লোকনাথ তারপর কালীনাথ। কালীনাথ অংকে দারুণ দক্ষ ছিলেন। জরিপের কাজকর্ম জানতেন ভালো। তাতেই তাঁর আয় ছিল। পাশাপাশি আরবি-ফারসি ভাষায় তাঁর অসামান্য দক্ষতার কারণে লোকে তাঁকে মুন্সী শ্যামসুন্দর নামে ডাকতেন। কালীনাথ ও তাঁর স্ত্রী জয়তারা দেবীর মোট আটজন সন্তান। প্রথমজন সারদারঞ্জন, তারপর একে একে গিরিবালা, কামদারঞ্জন ওরফে উপেন্দ্রকিশোর, ষোড়শীবালা, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন সবার শেষে মৃণালিনী। কামদারঞ্জনকে দত্তক নেন কালীনাথ বা মুন্সী শ্যামসুন্দরের এক জ্ঞাতি ভাই হলধর- যিনি হরিকিশোর নামে পরিচিত ছিলেন। হরিকিশোরের তখনও কোনও সন্তানের জন্ম হয়নি। কাজেই কামদারঞ্জনকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করে তিনি তাঁর নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে নতুন নামকরণ করলেন উপেন্দ্রকিশোর। পরে অবিশ্যি হরিকিশোরের তিনটি সন্তান জন্মলাভ করে- নরেন্দ্রকিশোর, মনোরমা ও সুরবালা।
যাই হোক, এই যে মুন্সী শ্যামসুন্দর বা কালীনাথের আট ছেলেমেয়ের কথা বললাম, তাঁদের মধ্যে সপ্তমজন অর্থাৎ প্রমদারঞ্জন পাঁচবছর বয়েসে তাঁর বাবাকে হারান, কাজেই ছোটো ভাইকে প্রায় বাপের স্নেহ আর কড়া শাসনের মধ্যে দিয়ে মানুষ করেন বড়দাদা সারদারঞ্জন। প্রমদারঞ্জন গোড়ায় মৈমনসিংহ জেলা স্কুলে পড়েন তারপর কলকাতায় এসে প্রথমে মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে এফ এ পাশ করে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ভর্তি হন। ১৮৯৭-৯৮ সাল নাগাদ তিনি সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে যোগদান করেন। ছেলেবেলা থেকে তিনি ছিলেন ডানপিটে- সে ব্যাপারটা তাঁর সারা শরীরে অজস্র কাটা-ছেঁড়ার দাগ দেখলেই টেরপাওয়া যেত। হ্যাঁ, শুধু তো ডানপিটে নয়- সঙ্গে ছিল অগাধ সাহস। সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে যোগদান করে প্রায় এক বছর তিনি দেরাদুনে ট্রেনিং নেওয়ার সময় ঘোড়ায় চড়া আর বন্দুক চালানোয় হাতটি পাকিয়ে ফেলেন। তারপর তো গোটা কর্মজীবনে তিনি যে কত দুর্গম জায়গায় গিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। চাকরির একেবারে শেষ দিকে তিনি রায়সাহেব ও রায়বাহাদুর খেতাবও পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর এই বর্ণময় কর্মজীবনের গল্প তিনি লেখেন তাঁর ‘বনের খবর’ বইতে।
১৯০৫ সালে প্রমদারঞ্জনের বিয়ে হয় সুরমা দেবীর সঙ্গে। এই সুরমা দেবী তাঁর ছেলেবেলা থেকেই মানুষ হয়েছেন প্রমদারঞ্জনের মেজদাদা উপেন্দ্রকিশোরের কাছে। অবিশ্যি এর পিছনে একটা গল্প আছে। উপেন্দ্রকিশোর তদ্দিনে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। তাঁর ধর্মপ্রচারের এক সহকর্মী রামকুমার ভট্টাচার্য ওরফে রামকুমার বিদ্যারত্ব প্রচারের কাজে পূর্ববঙ্গ, আসাম, উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। এদিকে রামকুমারের স্ত্রী জ্ঞানদা দেবী তাঁর তিন কন্যা সুরমা, সুষমা ও রমা এবং এক পুত্রকে নিয়ে বেশ সমস্যার মধ্যে দিয়ে একলা দিন কাটান। তা একবার হল কী, রামকুমার প্রচারের কাজে পূর্ববঙ্গে যাবার তোড়জোড় করছেন, এদিকে স্ত্রী জ্ঞানদা দেবীর তাতে মোটেই সায় নেই। কিন্তু রামকুমার তো তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। শেষমেশ তিনি ঢাকা গেলেন। এর কিছুদিন বাদে খবর এল জ্ঞানদা দেবী ও তাঁর শিশুপুত্র ঠোঁটের ব্রণ বিষিয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। এমন পারিবারিক বিপর্যয়ে রামকুমার অত্যন্ত ভেঙে পড়লেন । কাজকর্মে আর কোনও মন নেই তাঁর। হঠাৎ একদিন তিনি তাঁর বড়ো মেয়েকে ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের হোস্টেলে ভর্তি করলেন, মেজো মেয়ে সুরমাকে উপেন্দ্রকিশোরের জিম্মায় রাখলেন আর ছোট মেয়ে রমাকে পাঠালেন শিবনাথ শাস্ত্রীর কাছে। আর তিনি সংসার-ধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্ম নিয়ে চললেন হিমালয়ে। পরবর্তীকালে স্বামী রামানন্দ ভারতী নামে তিনি পরিচিত হন ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘হিমারণ্য’ লেখাটির ধারাবাহিক প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। ১৯০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কাশীতে তাঁর আশ্রমে তিনি চিরকালের মতো চোখ বুজলেন।

গোল্ড মেডেল নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরিজি সাহিত্যে এম এ করলেন লীলা তারপর তো সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ। প্রথমে দার্জিলিং-এর মহারানী গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে যুক্ত হলেন লীলা। সেখানেই দ্বিতীয়বারের জন্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হল তাঁর।
যাই হোক, যে গল্পে ছিলাম সেখানে ফিরি। প্রমদারঞ্জন আর সুরমা বিয়ের পর পাকাপাকি ভাবে চলে যান শিলং শহরে। সেটিই তখন প্রমদারঞ্জনের কর্মস্থল। টানা চোদ্দ বছর শিলং-এ কাটিয়েছেন তাঁরা। এই সময়কালেই একে একে জন্ম হয় প্রমদারঞ্জন-সুরমার আটটি সন্তান। অবিশ্যি তাঁদের বেশিরভাগেরই জন্ম কলকাতায় মেজজ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোরের সুকিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে এবং পরে ১০০ নং গড়পার রোডের বাড়িতে। আটজন সন্তানেরপ্রথমজন প্রভাতরঞ্জন রায়- যিনি ছিলেন অংকে গোল্ড মেডালিস্ট, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এরপর বড়ো মেয়ে সুলেখা রায়। ইংরিজির অধ্যাপিকা ছিলেন, গোখেল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন একটা সময়। তারপর তো লীলা রায়, বিয়ের পর লীলা মজুমদার- যাঁর কথাই আজ বলতে বসেছি। আসব, তার আগে লীলার বাকি ভাই-বোনেদের পরিচয়টা দিয়ে নিই। লীলার পর তাঁর দন্তচিকিৎসক ভাই কল্যাণরঞ্জন রায়। এরপর পঞ্চম সন্তান অমিয়রঞ্জন- ইনি ছিলেন গোড়ার দিকে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। তারপর সরোজরঞ্জন, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে সরকারি চাকরি করতেন। সপ্তম সন্তান যতিরঞ্জন ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন, আপন খেয়ালে থাকতেন নিজের পড়াশুনো নিয়ে। কিন্তু অকালেই চলে যান! প্রমদারঞ্জন আর সুরমার অষ্টম তথা কনিষ্ঠ সন্তান লতিকা রায়, বিয়ের পর লতিকা নাগ শ্রীশিক্ষায়তন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন বেশ কিছুকাল। লীলা তাঁকে আদর করে ডাকতেন হাবু বলে।
“পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ছিল আমার মায়ের বাড়িটি। …এমন সুন্দর, এমন আরামের, এমন নিরাপত্তার জায়গা এ জগতে আজ অবধি তৈরি হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।”
লীলার জন্ম ১৯০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতাতে, মেজ জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোরের সুকিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে। তবে, জন্ম কলকাতাতে হলে কী হবে- তাঁর আশৈশব জড়িয়ে রয়েছে পাকদণ্ডীর আঁকা-বাঁকা পথ, পাইনের জঙ্গল আর পাহাড়-ঘেরা শিলং শহর। গোড়ার দিকে তাঁরা থাকতেন শিলং-এর লাবানপাড়া বলে একটা জায়গার ব্রাহ্ম মন্দিরের ওপরের একটা ছোটো বাড়িতে। পাহাড়ের ঢালের উপর এই বাড়ির চারদিকে ছিল ইউক্যালিপটাসের ঝোপ। এই বাড়িটি সম্বন্ধে লীলা পরবর্তীকালে তাঁর ‘আর কোনোখানে’ বইটিতে এখানে কিছুদিন কাটিয়ে তাঁরা আরেকটি বাড়িতে উঠে গেলেন, যার নীচ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে যেত পাহাড়ি নদী। এই নদীর উপর ছিল লাল রঙা কাঠের পুল যার অপরদিকের খোলা মাঠে সাহেবরা দেদার টেনিস, গলফ, ক্রিকেট খেলত। এই বাড়িতেই লীলার তৃতীয় ভাই অমিয়রঞ্জনের জন্ম। সেদিন একটা কান্ড হয়েছিল। লীলা তিরিক্ষি মেজাজে তাঁদের বাড়ির বুড়ি কাকমি উবিনকে গন্ধরাজ গাছের আড়ালে ছাতাপেটা তো করেইছিলেন, এমন কী খিমচে দিতেও ছাড়েননি। কোথায় রেগে-মেগে কাই হবেন- তা তো নয়, দূর থেকে এই ব্যাপারটি দেখে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন বাবা প্রমদারঞ্জন!
এরপর দীর্ঘ এগারো বছর শিলং-এর যে বাড়িটিতে সপরিবার বাস করেন প্রমদারঞ্জন, তার নাম ছিল হাই উইন্ডস। এ-বাড়িতে থাকাকালীনই বছর ছয়েক বয়েসে লীলা ভর্তি হলেন শিলং-এর লরেটো কনভেন্ট স্কুলে। দিব্যি কাটছিল তাঁদের দিনগুলো। মাঝে-সাঝে ছুটি-ছাটায় তাঁরা কলকাতায় এসে উঠতেন উপেন্দ্রকিশোরের সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে। এমনই এক ছুটির সময় লীলারা কলকাতায় এসেছেন। সেটা ১৯১৩ সালের পয়লা বৈশাখের দিন। লীলার আর তাঁর দিদি সদ্য হাতের সোনার চুড়ি পেয়েছেন। তার চকচকে রূপে দুই বোন মুগ্ধ। এমন সময় তাঁদের মেজো জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোর হাসতে হাসতে দোতলার ঘরে উঠে এলেন, হাতে একটা সদ্য ছাপা পত্রিকার প্রথম সংখ্যা, নাম- ‘সন্দেশ’। এই যে সন্দেশ পত্রিকার শুরু, এখানেই লীলার প্রথম লেখার হাতে খড়ি। বড়দা সুকুমার রায়ের আদেশে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘লক্ষ্মী ছেলে’ নামে লীলার প্রথম গল্পটি।

ভাইপো সত্যজিৎ ও তাঁর কবি বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন ১৯৬১ সালের মে মাসে আবার ‘সন্দেশ’ পুনঃপ্রকাশ করলেন আর তার প্রথম সংখ্যা থেকেই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে লাগল লীলা মজুমদারের টংলিং উপন্যাসটি।
সেটা ১৯১৫ সালের কথা। শিলং-এ থাকতেই হঠাৎ একদিন একটা গোলাপী টেলিগ্রাম এল। লীলার মা সুরমা দেবী সেই টেলিগ্রামটি পড়ে আর একটি কথাও না বলে একটানা পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইলেন। সবাই জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছে? জানা গেল লীলার মেজো জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোর মাত্র বাহান্ন বছর বয়েসে ডায়বেটিসে ভুগে স্বর্গে চলে গেছেন! এর বছর চারেক বাদে ১৯১৯-এ লীলা তাঁর বাবা-মা, ভাই-বোনেদের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে এলেন। প্রথমে এসে উঠলেন উপেন্দ্রকিশোরের নিজের নকশা করা ১০০ নং গড়পার রোডের ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ লেখা বাড়িতে। সে বাড়ির কর্তা তখন উপেন্দ্রকিশোরের বড়োছেলে সুকুমার। তিনিই তখন তাঁর বাপের প্রতিষ্ঠা করা ছেলেমেয়েদের সচিত্র পত্রিকা সন্দেশ-এর সম্পাদক এবং ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’-এর কাজকর্মও মূলত দেখেন তিনিই। বড়দা সুকুমারের সম্পাদনায় হইহই করে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সন্দেশ’, কত ভালো-ভালো সব লেখা, ছবি প্রকাশিত হয় সেখানে। লীলা প্রতিমাসের ‘সন্দেশ’ পড়বার জন্য মুখিয়ে থাকে। বিকেলের দিকে বাড়িতে কালিদাস নাগ থেকে শুরু করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অমল হোম, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রমুখ সব গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা আসেন বড়দা সুকুমারের কাছে।
কিছুদিন ও-বাড়িতে কাটিয়ে সপরিবার প্রমদারঞ্জন চলে এলেন দক্ষিণ কলকাতার জাস্টিস চন্দ্রমাধব রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে। সেখানে আসার পরপরই লীলা ভর্তি হয়েছেন সেন্ট জন ডায়াসেশন স্কুলে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী লীলার ছিল তুমুল বই পড়ার নেশা। সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাই হোক কি ব্রাউনিং, টেনিসনের কবিতা হোক- হাতের কাছে যা পেতেন গোগ্রাসে গিলতেন বিভিন্ন বই-পত্রিকার লেখা। অমন সুন্দর পাহাড়ি শহর শিলং থেকেচলে আসার সময় মন খারাপ যেমন হয়েছিল, তেমনই কলকাতায় এসে সন্দেশ পত্রিকা, বড়দা সুকুমারের বিভিন্ন উদ্যোগ, নতুন ইস্কুল, সেখানকার নতুন বান্ধবীরা- সব মিলিয়ে সুন্দর দিনগুলো কাটছিল । হঠাৎ একদিন খবর এল বড়দা সুকুমার নাকি মারা গিয়েছেন! ঠিকই- কালাজ্বরে ভুগছিলেন তিনি, শরীর স্বাস্থ্যও বিচ্ছিরি রকমের ভেঙে গিয়েছিল তাঁর, কিন্তু তিনি যে চলে যাবেন, এমনটা তো কেউ কখনও ভাবেনইনি। ১০০ নং গড়পার রোডের গোটা বাড়িটা এক লহমায় কেমন পালটে গেল! কোথায় সেই আগের হইচই, আনন্দ-ফূর্তি! বড়দা চলে যাবার পর মণিদা সুবিনয় ‘সন্দেশ’, ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’-এর হাল ধরলেন কোনও রকমে। কিন্তু, এতও ঋণের বোঝা তিনি খুব বেশিদিন বইতে পারলেন না। একদিন বাড়ি, ব্যবসা সব নিলাম হয়ে গেল। ও-বাড়ির সদস্যরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়েগেলেন। বড়দা সুকুমারের স্ত্রী সুপ্রভা তাঁর একরত্তি ছেলে মানিক ওরফে সত্যজিৎকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন তাঁর দাদার বাড়িতে।

১৯৬৩ সাল থেকে টানা ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই চল্লিশটা বছর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার মলাটে গিয়েছে লীলা মজুমদারের নাম। লীলার কথায় শিশু সাহিত্যের সেবায় নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি।
ইতিমধ্যে ম্যাট্রিকে দ্বাদশ স্থান অধিকার করে ডায়াসেশন কলেজেই আই এ ও বি এ পড়তে ভর্তি হয়েছেন লীলা । ঠিক এই সময়েই খবর এল ইউ রায় অ্যান্ড সন্স-এর নতুন মালিক সুধাবিন্দু বিশ্বাস ও লীলার মণিদা সুবিনয় রায়চৌধুরীর যৌথ সম্পাদনার ‘সন্দেশ’ আবার প্রকাশিত হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে এই দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘সন্দেশ’-এই প্রকাশিত হল লীলার নিজের আঁকা ছবি সমেত ‘দিন দুপুরে’ গল্পটি। এসবের পাশাপাশি গোল্ড মেডেল নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরিজি সাহিত্যে এম এ করলেন লীলা তারপর তো সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ। প্রথমে দার্জিলিং-এর মহারানী গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে যুক্ত হলেন লীলা। সেখানেই দ্বিতীয়বারের জন্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হল তাঁর। বেশ কয়েক বছর আগে প্রথম দেখেছিলেন তাঁকে। লীলার অটোগ্রাফ খাতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে দিয়েছিলেন-
“নামের আখর কেন লিখি/ নিজের সকল কাজে?/ পারিস্ যদি প্রেমের আখর/ রাখিস জগৎ মাঝে।”
(১লা আশ্বিন, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
পরবর্তীকালে সেই অটোগ্রাফ খাতাতেই রবীন্দ্রনাথ আবার লিখলেন-
“আঁধারের লীলা আকাশে আলোক-লেখায়,/ ছন্দের লীলা অচল মৃদঙ্গে,/ অরূপের লীলা রূপের রেখায় রেখায়,/ অতলের লীলা চপল তরঙ্গে।”
(৫ই চৈত্র, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই দ্বিতীয়বারের সাক্ষাৎই লীলাকে এক বছরের জন্য নিয়ে গেল শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর শিশুবিভাগের শিক্ষকতা করতে। সেটা ১৯৩১ সাল। লীলার এই শান্তিনিকেতনে যাওয়ার ব্যাপারে মোটেই সায় ছিল না বাবা প্রমদারঞ্জনের। কিন্তু, জেদ ধরেছেন লীলা, তিনি তো যাবেনই। শান্তিনিকেতনে এসে একে-একে আলাপ হল। অনেক গুণীজনেদের সঙ্গে। পাশাপাশি মনের মতো বান্ধবীও জুটে গেল। পূর্ণিমা ঠাকুর লীলার ডাকে বুবু, দুজনে মিলে রবীন্দ্রনাথকে একদিন রেঁধেও খাওয়ালেন। লীলা আর পূর্ণিমার হাতে রাঁধা ডালফেলা, কী একটা ভাজা, লাউঘন্ট, পেঁয়াজ-পাঁচফোঁড়ন দিয়ে পার্শে মাছ, শশার রায়তা আর পেঁয়াজের পায়েস খেয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- “ভালোই হয়েছে। কিন্তু আমি একটার সময় খেতে বসি। দেড়টায় নয়। পাকা রাঁধুনিরা শুধু রান্নার দিকে খেয়াল রাখে না, সময়ের দিকেও রাখে…”
ইতিমধ্যে ১৯৩৩ সালে লীলা নিজের পছন্দে দন্ত চিকিৎসক সুধীর কুমার মজুমদারকে বিয়ে করলেন। ব্যাস্, এই বিয়েকে কেন্দ্র করেই লীলা আর তাঁর বাবা প্রমদারঞ্জনের মধ্যে সারা জীবনের সম্পর্কে ছেদ পড়ল। গোঁড়া ব্রাহ্ম প্রমদারঞ্জন কোনও মতেই হিন্দু বাড়িতে মেয়ের বিয়ে মেনে নিতে পারলেন না। এদিকে লীলাও তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়! তবে লীলার বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাজির ছিলেন। এর ঠিক এক বছর বাদে ১৯৩৪-এ লীলার প্রথম সন্তান পুত্র রঞ্জনের জন্ম হল। আর এর বছর কয়েক বাদে কন্যা কমলা এলো কোল আলো করে। তখন তাঁরা ৩০ নং চৌরঙ্গী রোডের ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠে এসেছেন- এই বাড়িতে কেটেছে তাঁর জীবনের তেত্রিশটা বছর।
একদিকে যেমন চলছে ঘর-সংসারের কাজ, অন্যদিকে লেখালিখিও চলছে সমান ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে, শৈল তালে। ১৯৩৯ সালে রামধনু কার্যালয় থেকে চক্রবর্তীর আঁকা প্রচ্ছদসহ প্রকাশিত হল লীলা মজুমদারের প্রথম বই- ‘বদ্যিনাথের বড়ি’। এর কিছুকাল পর কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রংমশাল’ পত্রিকার ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হল ‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’ (১৯৪৪) ও ‘ভয় যাদের পিছু নিয়েছে’ (১৯৪৬)। এই লেখাটির নাম পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়ে ‘গুপির গুপ্তখাতা’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এর ঠিক বছর দুয়েক পর ১৯৪৮-এ ভাইপো সত্যজিতের ইচ্ছায় ও তাঁরই আঁকা অলংকরণ সমেত সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত হল লীলার- ‘দিন দুপুরে’ বইটি। না, এরপর আর তিনি থামেননি- একের-পর-এক লিখে গিয়েছেন অজস্র ছোট গল্প, স্মৃতিকথা, উপন্যাস, রম্যরচনা। এমনকী, ১৯৫২ সালে আকাশবাণীতে যোগদানের সময়েও তিনি লেখার কাজটা সমান তালে চালিয়ে গিয়েছেন। ভাইপো সত্যজিৎ ও তাঁর কবি বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন ১৯৬১ সালের মে মাসে আবার ‘সন্দেশ’ পুনঃপ্রকাশ করলেন আর তার প্রথম সংখ্যা থেকেই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে লাগল লীলা মজুমদারের টংলিং উপন্যাসটি।

১৯৬৩ সালে বেতার থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে লীলা সত্যজিতের সঙ্গে ‘সন্দেশ’ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হলেন। তদ্দিনে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদক পদ থেকে সরে গিয়েছেন। ১৯৬৩ সাল থেকে টানা ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই চল্লিশটা বছর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার মলাটে গিয়েছে লীলা মজুমদারের নাম। লীলার কথায় শিশু সাহিত্যের সেবায় নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালে লীলা মজুমদারের স্মৃতিকথা ‘আর কোনোখানে’-এর জন্য পেলেন রবীন্দ্র পুরস্কার। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নয়টি বছর টানা শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছিলেন তিনি। সে বছরই স্বামী ডাঃ সুধীর কুমার মজুমদারের প্রয়াণ ঘটে। এই মানসিক কষ্টকেও দূরে ঠেলেছিলেন কেবলমাত্র লেখালিখির মধ্যে থেকেই। বছর দুয়েক বাদে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন আচার্য্য রাজীব গান্ধীর হাত থেকে গ্রহণ করলেন ‘দেশিকোত্তম সম্মান’।
পঁচাশি ছুঁইছুঁই লীলার জন্মদিন পালিত হল কলকাতার ওল্ড বালিগঞ্জ সেকেন্ড লেনে তাঁর বাড়িতে। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তখনও কাজের মধ্যে ছিলেন একরকম। কিন্তু একের-পর-এক বয়েসে ছোট প্রিয়জনেদের মৃত্যুসংবাদে ক্রমশ মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ছিলেন লীলা। তারপর তো নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ক্রমেই তাঁর স্মৃতিশক্তি চলে যেতে লাগল! জীবনের শেষ আট-দশটা বছর লীলার মন চলে গিয়েছিলেন এক অন্য জগতে। যেখানে তাঁর বাবা, মা, তাঁর ছেলেবেলার শিলং, ছোট ভাই-বোন সবাই সব্বাই আছেন। ২০০৭-এর ফেব্রুয়ারি তিনি নিরানব্বই বছর পূর্ণ করে একশো বছরে পা রাখলেন। দেশ জুড়ে কত হইচই তাঁর জন্মশতবর্ষ নিয়ে। এদিকে তিনি তখন একটা-একটা করে দিন পেরোচ্ছেন আর কোনোখানে যাবার জন্যে। আর এই দিনটি এগিয়ে আসতেও খুব বেশি সময় লাগল না। মাস দেড়েকের মাথায়, ৮ এপ্রিল, দুপুর একটা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, হয়তো-বা চললেন তাঁর সেই টংলিং’-এর পেরিস্তানের খোঁজে – কে জানে?
_________
তথ্যসূত্র:
অনন্য অন্য লীলা মজুমদার: প্রসাদরঞ্জন রায়
পাকদণ্ডী: লীলা মজুমদার
আর কোনোখানে: লীলা মজুমদার
যখন ছোটো ছিলাম: সত্যজিৎ রায়

