রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে এই সরকারি উদ্যোগ
বাংঅনেকদিনই ছোটো মাছ হারিয়ে গিয়েছে। মাছের বাজারে সরপুঁটি, প্যাঁকাল, ন্যাদোস, চ্যাং, কাজলি, বাঁশপাতা, বোরোলি, খয়রা খুঁজে পাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়া।
৩০-৪০ বছর আগেও খাদ্যরসিক বাঙালি ছোটো মাছের চচ্চড়ি, টক খেয়েছে সমারোহে। চর্যাপদ থেকে মঙ্গলকাব্যের কবিরা উৎসাহে ছোটোমাছের নানা পদের কথা উল্লেখ করেছেন। আজ বাঙালি ভুলতে বসেছে চুনো মাছের ব্যঞ্জন আর তার আস্বাদ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোটোমাছ হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধান কারণ তাদের আবাসস্থল বিনষ্ট হওয়া, প্রজননক্ষেত্র কমে যাওয়া। যথেচ্ছ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারের ফলেও ছোটোমাছ কমে গেছে। তথ্য বলছে, প্রায় ৬৪ রকমের ছোটো মাছ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

বিলুপ্তপ্রায় ছোটো মাছকে সংরক্ষনের আওতায় আনা দরকার। তাই অভয় পুকুর তৈরির কাজ শুরু হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। রাজ্য সরকারের জীববৈচিত্র্য পর্ষদের অধীনে এই অভয়পুকুর তৈরি করা হয়েছে ইতিমধ্যে প্রায় প্রতিটি ব্লকে।
ছোটোমাছ ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু হয়েছে এ রাজ্যে। অভয়পুকুর তেমনই একটা উদ্যোগ। অভয়ারণ্য শব্দটির সঙ্গে ইতিমধ্যে আমরা পরিচিত হয়েছি। বন্যজন্তু সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে যেমন অভয়ারণ্য বলা হয়, তেমনই বিভিন্ন ধরনের দেশি মাছ সংরক্ষণের জন্য তৈরি হয়েছে অভয়পুকুর।
রাজ্য জীববৈচিত্র্য পর্ষদের এক আধিকারিক বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “বিগত কয়েক দশকে বাংলার ছোটো মাছ কমতে শুরু করেছে, বিশেষত উচ্চ ফলনশীল কার্প জাতীয় মাছ চাষের কারণে। আগাছার মতই ছোটো মাছগুলি হল আমাছ, যা তুলে ফেলে কার্পের বাসস্থান তৈরি করা হয়।”
তাঁর কথায়, “তাই আমরা সরকারি পুকুর কিছু বেছে নিয়েছিলাম। সেখানে ছোটো মাছ চাষের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হল। দূষণহীন পুকুরে উপযুক্ত গাছপালা ব্যবহার করে ছোটো মাছের আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন ব্লকে ব্লকে। একেই আমরা অভয় পুকুর বলি, যেখানে ছোটো মাছ নির্ভয় থাকতে পারবে।”
বিলুপ্তপ্রায় ছোটো মাছকে সংরক্ষনের আওতায় আনা দরকার। তাই অভয় পুকুর তৈরির কাজ শুরু হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। রাজ্য সরকারের জীববৈচিত্র্য পর্ষদের অধীনে এই অভয়পুকুর তৈরি করা হয়েছে ইতিমধ্যে প্রায় প্রতিটি ব্লকে। অভয়পুকুর সম্পর্কে যাতে সাধারণ মানুষ আরও সচেতন হয়, সেজন্য সরকারি স্তরে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি আর্থিক সাহায্য ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সহায়তায় বেশ কয়েক বছর সার্থক ভাবে অভয় পুকুরের সংখ্যা বেড়েছে।
কেমন পুকুর হতে পারে অভয় পুকুর? ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জলজ গাছ থাকবে, শ্যাওলা, হাইড্রেলা, পানা, পাতিঘাস, কুলেখাড়া, হিঞ্চের মতো গাছের উপস্থিতি পুকুরে নিশ্চিত করতে হবে। মাছের খাবার হিসেবে ঘরোয়া খাদ্য যেমন, ভাত কুঁড়ো দেওয়া হবে। কংক্রিটের ঘাটের বদলে খেজুর, তালের গুড়ি দিয়ে তৈরি ঘাট করতে হবে। বলতে গেলে ৩০-৪০ বছর আগের গ্রাম বাংলার যে পুকুর ঘাট ছিল সেটাই আদর্শ অভয়পুকুর। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে যে পুকুরের ছবি আমরা পাই, সেগুলি আসলে আজকের অভয় পুকুর।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবকিঙ্কর দাস বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “আমি অভয় পুকুরের তুলনায় সংরক্ষিত পুকুরই বলতে চাই। কিছু মেঠোপুকুর আমরা সংরক্ষণ করতে পারি, যেখানে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ হয় না। এই পুকুরগুলি থেকে চাষের জলও ব্যবহার যাবে না। শুধুমাত্র সংরক্ষণের জন্যই এই পুকুরগুলি ব্যবহার করা হবে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র এই মেঠো পুকুরগুলিতে বজায় থাকে। সুনিশ্চিত করতে হবে যাতে গরমে এই পুকুরের জল থাকে। কীটনাশক মিশ্রিত জল যেন বর্ষার সময় কোনোভাবেই পুকুরে না আসে। তবেই ছোটোমাছ বংশবিস্তার করতে পারবে। এইটুকু করতে পারলে ছোটো মাছ বেঁচে থাকবে।”
দেশী ছোটো মাছ হারিয়ে যেতে যেতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে বাঙালি অতীতে কত রকমের ছোটো মাছের কথা জানত, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিতাপুঁটি, মৌরলা, দাঁড়কে, কেঁকলে, চাপিলা, বেলে, ভেদা, চাঁদা, সোনাখোরকে, বাতা, খোলসে, ল্যাটা, শিঙ্গি ইত্যাদির নাম এখনো লোকমুখে শোনা যায়।
তবে, বানিজ্যিক মাছ (যেমন, রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প ইত্যাদি) চাষের হিড়িক ছোটোমাছের বংশের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়েছে। কিন্তু ক্রমশ মানুষ সচেতন হচ্ছে ছোটো মাছের ব্যাপারে।
আরও পড়ুন: কাঁচা আম আর মৌরলার জিভে-জল আনা জুটি
অধ্যাপক দাস বলেন, “আগেকার দিনের যে ভাবনা ছিল যে কার্প চাষ করতে গেলে ছোটোমাছ নির্মূল করতে হবে, সেই ভাবনা থেকে মানুষ সরে এসেছে। ঠাকুরনগর সংলগ্ন এলাকায় দেখা গেছে, মাছ চাষীরা উদ্যোগী হয়ে পুকুরে মোরলা ছাড়ছে। কার্প জাতীয় মাছের সংগে ছোটো মাছ চাষ হচ্ছে নদীয়ার বিস্তীর্ণ অংশে।” আসলে ছোটো মাছের জন্য বিশেষ কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। শুধু তার আবাসস্থলটা ঠিকঠাক বানিয়ে দিলেই হয়।

বলতে গেলে ৩০-৪০ বছর আগের গ্রাম বাংলার যে পুকুর ঘাট ছিল সেটাই আদর্শ অভয়পুকুর। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে যে পুকুরের ছবি আমরা পাই, সেগুলি আসলে আজকের অভয় পুকুর।
তবে শুধু অভয়পুকুর করে দিলেই ছোটো মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। অধ্যাপক দাস বলেন, “দেশি ছোটো মাছ বর্ষাকালে বাংশবিস্তারের সময় ডাঙ্গায় উঠে আসে। তাই অভয় পুকুরের চারপাশের ডাঙ্গার পরিবেশ কীটনাশক ও রাসায়নিক সার মুক্ত হতে হবে। চারপাশের দূষিত জল কোনভাবেই সংরক্ষিত পুকুরে পড়া চলবে না। মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে। ছোটোমাছের বিপণনের বাজার গড়ে তুলতে হবে। তবেই ছোটোমাছ কে আবার ফিরিয়ে আনা যাবে।”
তিনি আশাবাদী। যে মানুষের জন্য একসময় দেশি ছোটোমাছ হারিয়ে গিয়েছিল, তারাই আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে ছোটোমাছের দল। অচিরেই বাঙালির পাতে আবার ছোটো মাছ পড়বে।