৯০ বছর পরেও পুতুলরা কি একইভাবে নাচে?

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা মূলত বর্ণনাধর্মী আখ্যান। মানিক সর্বজ্ঞ কথকের ভূমিকা ছেড়ে – যেন কথক সব কিছু জানেন না, যেন তাঁর অগোচরে থেকে গেছে অনেক ঘটনাই – এরকম এক চোখে বহু ঘটনা তীর্যক ইঙ্গিতে পাঠককে ধরিয়ে দেন। শব্দের তিন গুণ – অভিধা, লক্ষণা এবং ব্যঞ্জনা। সাহিত্যের বয়নেও এই গুণ ধ্বনিত হয়, যেহেতু সাহিত্য শব্দশিল্প। পুতুলনাচের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে আপাত ঘটনা ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে রম্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু মানিক ঘটনার বর্ণনায় সর্বজ্ঞ কথকের ভঙ্গিটি না নিলেও মনের বিচিত্র স্তর উপস্থাপনে কথক মনের অতলে ডুব দিয়েছেন এবং বেশ কিছু সম্ভাব্য অনুভূতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। বুননের এই অংশে কথক কবি হয়ে ওঠেন। মানুষের জীবন যত না জটিল, মন তার চেয়েও জটিল অনুভূতি দিয়ে মোড়া। এ সব কারণেই উপন্যাসে ঘটনা বহু এবং একটা ঘটনার সঙ্গে অন্যটার যোগ সূক্ষ্ম ও অমোঘ। কিন্তু সবই পরিমিত মেজাজে বলা (এবং কে না জানে পরিমিতি বোধই শিল্প)। যেমন ধরা যাক, সেনদিদির দেহে বসন্ত কীভাবে অনুপ্রবিষ্ট হলো? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক মোটে তিন-চারটে বাক্যে বলেন যামিনী কবিরাজের (সেনদিদির স্বামী) এক শিষ্য সাতক্রোশ দূরে এক বসন্তরোগীর চিকিৎসা করছিল। সেই বীজাণু সেনদিদির শরীরে কীভাবে ঢুকলো? এ ঘটনার কথা শোনানোর ঢের আগে কথক সেনদিদির ব্যভিচারী স্বভাবের প্রগলভতার কথা বলে রেখেছেন। সূক্ষ্ম ইঙ্গিত এই যে, এখানে এক শারীরিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ছিল কি ছিল না, তা কথক কোথাও স্পষ্ট করেননি। পাঠকের সামনে দরজা খুলে দিয়েছেন শুধু – পাঠক তাঁর কল্পনা ও সাহসে ভর করে ঢুকতে চাইলে ঢুকবে, না চাইলে ঢুকবে না। মনের অন্ধকার কোনটায় আলো ফেলবে কি ফেলবে না তা পাঠকের উপর নির্ভর করবে। যে কারণে বহুপাঠেও ক্লিশে মনে হয় না পুতুলনাচকে, বরং বারবার পড়লে এর ভিন্ন দ্যোতনা তৈরি হয়। পাঠক তার অভিজ্ঞতা, সংস্কার ও মনের অবস্থান থেকে উপন্যাসটাকে পড়ার সুযোগ পায়।

আখ্যানের সমস্তটা সিনেমায় ধরা যায় না ঠিকই। সিনেমায় নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষার প্রয়োগে শশীর মাটির টিলার উপরে ওঠার সাধ নষ্ট হওয়ার ইতিবৃত্তকে পরিচালক চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন – একটা শেয়ালের রূপকে। শেয়াল মৃত্যুর প্রতীক – শশী জীবনবাসনায় দগ্ধ।

এরকম জটিল বুননের আখ্যানকে পর্দায় ধরা দুঃসাহসিক কাজ। সুমন মুখোপাধ্যায় সে কাজের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। চালাতে গিয়ে উপন্যাসের বহুমাত্রিক স্তরকে কিছু ক্ষেত্রে করে তুলেছেন একরৈখিক। ভারতীয় রসশাস্ত্রে স্বকীয়া নায়িকার তিন ভাগ – মুগ্ধা (নায়কের গুণমুগ্ধ), মধ্যা (বিচক্ষণ) ও প্রগলভা (চতুর)। অভিজ্ঞতা ও বয়সের হিসেবে মতি-কুসুম-সেনদিদি ত্রয়ী স্তরের প্রতিনিধি। মতি অনূঢ়া, কিন্তু কুসুম ও সেনদিদি দুজনেরই সমস্যা তারা নিঃসন্তান। সন্তান কামনার আকুতির সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক উপন্যাসে স্পষ্ট। কুসুমের আত্মসম্মানবোধ প্রবল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামীর প্রতি আবেগ কিছুমাত্র কম নয়। পরিচালক পরানকে তেমন গুরুত্ব দেননি। অন্যদিকে, সেনদিদির সন্তান লাভের খুশিকে পরিচালক ধরলেও মনের গভীর তলের সন্ধান করেননি। উপন্যাসে মাতৃহীনতা চোখে পড়ার মতো। পরিচালক এই অংশটিকে কি অগ্রাহ্য করেছেন? সিনেমাটা কি তবে হয়ে উঠেছে স্থূল শরীরী কামনার দ্যোতক? যা উপন্যাসে অভিধা, লক্ষণা ছুঁয়ে ব্যঞ্জনায় পৌঁছাতে পারে, তা সিনেমায় কেবল লক্ষণা পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে উপন্যাসের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা আলাদা। চিত্রনাট্যকার নিজের মতো করে কাহিনি বলবেন তাই স্বাভাবিক। পরিচালক একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি শশীর চোখ দিয়ে গাওদিয়া গ্রামকে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু শশীমুখ্য গাওদিয়া গ্রাম তো অন্যান্য চরিত্র নিরপেক্ষ নয়। যেমন গোপাল ও শশীর দ্বন্দ্ব শুধু প্রজন্মগত-শিক্ষাগত ব্যবধানে রচিত নয় – উপন্যাসে গোপাল চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বও শশীর চরিত্রকে নির্মাণ করেছে। সিনেমায় গোপাল কেন সেনদিদির ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো – তার যে অর্থ পরিচালক ধরেছেন তা গোপাল চরিত্রের দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে না। বোঝা গেছে – শশী গ্রাম ছেড়ে যেতে চায় বলে গোপাল নব্যজাতকে নিয়ে চলে গেলো – তার ব্যঞ্জনা স্পষ্ট নয়। গোপালের শশীর প্রতি বাৎসল্যের বা বাবার প্রতি শশীর সহমর্মিতার ছবি সিনেমায় নেই। দ্বন্দ্বটা হয়ে উঠেছে প্রজন্মগত ব্যবধান ও বিদ্বেষজাত।

 

মতির প্রগলভতা, যামিনী কবিরাজের জিঘাংসা, পরানের প্রায় অনুপস্থিতি, কুন্দের ম্লান উপস্থিতি – সিনেমাকে উপন্যাস থেকে বহু দূরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে ভারতীয় রসশাস্ত্রকে সামনে রেখে যে বয়ন মানিক করেছেন সেখানে উপনিবেশ-বিরোধী চোখ ছিলো, তা শশীর বাবুয়ানির মাহাত্ম্য দেখাতে গিয়ে সিনেমায় শেষাবধি উপনিবেশের মহত্ব দিয়ে শেষ হয়েছে।

শশী অনেক কিছু বোঝে না। কুসুমের মন শশী বুঝতে পারে না, গোপালের স্নেহ শশী বুঝতে পারে না – সেই শশীর চোখ দিয়ে দেখতে গেলে মূল আখ্যানের রস লঘু হয়ে যায় বৈকি! আখ্যানের সমস্তটা সিনেমায় ধরা যায় না ঠিকই। সিনেমায় নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষার প্রয়োগে শশীর মাটির টিলার উপরে ওঠার সাধ নষ্ট হওয়ার ইতিবৃত্তকে পরিচালক চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন – একটা শেয়ালের রূপকে। শেয়াল মৃত্যুর প্রতীক – শশী জীবনবাসনায় দগ্ধ। মুখোমুখি একটি দৃশ্যে শশী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মৃত্যুর দিক থেকে। সিনেমার ভাষ্যে অন্যতম দৃশ্য যাদব পণ্ডিতের মৃত্যু। পরিচালকের নজর কেবল বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কারে নয়। সেক্ষেত্রেও ‘মিথ্যার মোহ’কে বোঝাতে গ্রামের লোকের উৎসুক মৃত্যু প্রতীক্ষার টেনশন পর্দার উপস্থাপনে বাস্তবতার শৈল্পিক রূপায়ণ হয়ে উঠেছে। মনে পড়বে আরি অ্যাস্টার পরিচালিত ‘মিডসোমার’-এর পাহাড়পতনের দৃশ্য – সেখানেও বৃদ্ধ দম্পতির আত্মত্যাগকে সংস্কারের দোহাই দিয়ে উৎসবে পরিণত করা হয়েছিল। শশীর শেয়ালের সঙ্গে সহাবস্থান থেকে মুখ ফিরিয়ে টিলায় না ওঠার মধ্যেও এই ঘটনার প্রভাব ছিল। পরিচালক এক্ষেত্রে উপন্যাস-অনুগ হলেও শৈল্পিক রূপায়ণে সিনেমার ভাষাকে যথার্থভাবে ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে সিনেমাটোগ্রাফারের কৃতিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

এত কিছুর পরেও মতির প্রগলভতা, যামিনী কবিরাজের জিঘাংসা, পরানের প্রায় অনুপস্থিতি, কুন্দের ম্লান উপস্থিতি – সিনেমাকে উপন্যাস থেকে বহু দূরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে ভারতীয় রসশাস্ত্রকে সামনে রেখে যে বয়ন মানিক করেছেন সেখানে উপনিবেশ-বিরোধী চোখ ছিলো, তা শশীর বাবুয়ানির মাহাত্ম্য দেখাতে গিয়ে সিনেমায় শেষাবধি উপনিবেশের মহত্ব দিয়ে শেষ হয়েছে। আখ্যানে ভূগোলের সঙ্গে চরিত্রের মন জোড়া থাকে – এই সহজ সত্যকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে গেলেই গণ্ডগোল বাধে। হারু ঘোষ বজ্রাঘাতে সম্পূর্ণ পুড়ে গেলেও তার জামায় শুধু কয়েকটা কালির দাগ যে হয় না বরং গোটা জামাটাই পুড়ে যায় বা চন্দ্রবোরার কামড়ে কেউ যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মরে যায় না, বরং তার বাঁচার চেষ্টা করার সময়টুকু থাকে – তা কি পরিচালক জানতেন না? সুমন যে কারণে ‘হারবার্ট’ বা ‘মহানগর@কলকাতা’-কে শৈল্পিক রূপ দিতে পারেন, কিন্তু ‘চতুরঙ্গ’, ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ বা ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-কে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন না। কিম্বা এই প্রশ্নও করা যায় যে, মূলধারার সিনেমা-দর্শকদের যে রুচিবাগীশ, সভ্য, চকচকে নাগরিক চোখ থাকে – তাদের গ্রাম-দর্শনের রোমান্টিক বুদবুদ তৈরিই কি মূল উদ্দেশ্য? যেভাবে বলিউডে লন্ডন বা আমেরিকা দর্শন করানো হয়!

সুমন মুখোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডাম’-এ প্রিমিয়ার হয় বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে। বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক দরবারে উপস্থাপনই তো বড়ো কথা নয় – তার মাটির গন্ধ নিয়ে উপস্থাপনের প্রয়োজন আছে না হলে স্বীকৃতি পাওয়া যাবে কীভাবে। ধরা যাক আইরিশ ভাষার সিনেমা ‘দ্য ব্যানশিজ অব ইরিশেরিন’-এ গ্রামের একাকিত্ব, হতাশা, নগরের প্রতি টান, কুসংস্কার, বিচিত্র লোকবিশ্বাসের বাস্তব রূপায়ণ যেভাবে অ্যাকাডেমির মঞ্চে বড়ো সফলতা পায় – মানিকের উপন্যাসে সে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রভূত উপকরণ থাকলেও সুমন তাকে পৌঁছাতে পারার মতো করে উপস্থাপন করেননি। তার কারণ কি পরিচালকের টার্গেটেড দর্শক আসলে কলকাত্তাইয়া বাঙালি? এ প্রশ্ন পরিচালকের প্রতি থাকল।

_____________
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব

Written by