কামারপাড়ার আরো আকাশ-এ মেয়েদের ইচ্ছেপূরণের গল্প

দের কারোর বয়স ২৫ আবার কারো ৫২। কেউ কারুর বৌমা আবার কেউ কারুর দিদিশাশুড়ি। ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে পাকা ধান কাটে আবার ওরাই মাটির বাড়িতে তুলসী তলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ দেয়। ঘরের মানুষদের জন্যে রান্নাবান্না করা, আবার কোলের সন্তানের দেখভাল করা। সবটুকু ওদের দায়িত্ব। কিন্তু ওদের মনের ইচ্ছেগুলোর খবর কি কেউ রাখে? কী খেতে ইচ্ছে করে? কোথায় ঘুরতে যেতে মন চায়? এতকাল কিন্তু ওদের মনের কথা কেউ জানতেও চাইত না। তবে এখন ওদের মন ভালো রাখার জন্যেই তৈরি হয়েছে গোটা একটা ক্লাব – ইচ্ছে আকাশ। যেখানে এসে ওরা মনের ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারে। স্বাধীনভাবে কয়েকটা ঘণ্টা নিজেদের মতো করে কাটাতে পারে। শহরে ছেলেদের বা মেয়েদের ক্লাব তো আমরা অনেক দেখেছি শুনেছি, কিন্তু আগাগোড়া একটা গ্রামের মহিলাদের নিয়ে ক্লাব তৈরি করা কিন্তু মুখের কথা ছিল না।

পেশায় প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা সুচন্দ্রা হাজরা কামারপাড়া গ্রামের মহিলাদের নিয়ে একখানা স্কুল তৈরি করে ফেলেছেন। তবে সেই স্কুলে কোনো সিলেবাস নেই, কোনো ইউনিফর্ম নেই, বাঁধাধরা কোনো রুটিনও নেই।

বীরভূমের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র শান্তিনিকেতন থেকে দশ কিলোমিটার দূরে ইলামবাজার-এর পথে যেতেই পড়ে ছোট্ট একটা গ্রাম, কামারপাড়া। গাছগাছালি আর দীঘিতে ভরা সেই সুন্দর গ্রামে আরো আকাশ (Aaro Aakash the non-resort) নামে এক নন রিসর্ট ফার্ম আছে। কোলাহল থেকে দূরে সবুজে ঘেরা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এই রুচিপূর্ণ জায়গা গড়ে তুলেছেন কলকাতার উদয় হাজরা এবং সুচন্দ্রা হাজরা। এই কামারপাড়া গ্রাম-এ তারা এসে বাস করছেন আজ প্রায় বছর কুড়ি হয়ে গেল। পেশায় প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা সুচন্দ্রা হাজরা কামারপাড়া গ্রামের মহিলাদের নিয়ে একখানা স্কুল তৈরি করে ফেলেছেন। তবে সেই স্কুলে কোনো সিলেবাস নেই, কোনো ইউনিফর্ম নেই, বাঁধাধরা কোনো রুটিনও নেই। দিনের সব কাজ শেষ করে বিকেলের পড়ন্ত আলো গায়ে মেখে মা-বোনেরা দল বেঁধে চলে আসে সুচন্দ্রাদির পাঠশালায়।

একদিন বর্ণপরিচয়, একদিন শব্দ গঠন আবার কোনো কোনো দিন বইখাতা সরিয়ে রেখে শুধুই ভালোমন্দ গল্প। গ্রামের মেয়ে-বউরা এখন মঞ্চে উঠে দাপিয়ে নাটক করে। সহজ পাঠ খুলে পড়াশুনো করে। এর শুরুটা হলো কীভাবে? সেটাও ভারী মজার গল্প। বেশ কিছু বছর আগে সুচন্দ্রাদি কলকাতার স্কুলের চাকরি থেকে ভলিন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কামারপাড়া এসে থাকতে শুরু করেছিলেন শুধু প্রকৃতির মাঝে শহরের কোলাহল থেকে দূরে পরিবারের সঙ্গে শান্তিতে সময় কাটাবেন বলে। এখানে পাকাপাকি থাকাকালীন তাঁর মনে হয় গ্রামের মেয়েদের সারাদিনের সংসারের কাজ, সন্তান মানুষ করা আর স্বামীর অধীনে থাকতে থাকতে কোথায় যেন নিজের মনের ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করার সুযোগ পায়নি। সামাজিক এই দৃশ্য তো খুব স্বাভাবিক আমাদের সবার কাছে। এই স্বাভাবিক দৃশ্যটাকে পাল্টে দিতেই সুচন্দ্রাদি নিজের বান্ধবী এবং সমাজকর্মী অঞ্চিতা ঘটকের সঙ্গে আলোচনা করেন। একদিন দুই বন্ধু গ্রামে হাঁটতে বেরিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একে একে বেরিয়ে এলো তাদের মনের ইচ্ছেগুলো। ইচ্ছেগুলো যেন খোলা আকাশ-এর অপেক্ষাতেই ছিল এতদিন।

কিন্তু একদম বাড়ির কাছাকাছি ক্লাব করলে পুরুষদের খারাপ লাগতে পারে এই ভেবে সবাই মিলে ঠিক করলেন খোলা আকাশের নিচেই তৈরি হবে মেয়েদের এই ক্লাব। কিন্তু কী নাম হবে এই ক্লাবের? ক্লাবের সদস্যরাই ঠিক করলেন সুচন্দ্রাদির নামেই হবে ক্লাবের নাম। কিন্তু দিদিমণি বাতিল করলেন। শেষে অনেক ভেবেচিন্তে মেয়েরা এই ক্লাবের নাম দিলো ইচ্ছে আকাশ। ঠিক হলো সপ্তাহে দু-তিনদিন সংসারের সব কাজ শেষ করে বিকেলে এক ঘণ্টা জড়ো হবে সবাই। লেখাপড়া গান নাচ আবৃত্তি নাটক গল্প বলা যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে একটা ঘণ্টা। ক্লাবের শুরু আজ থেকে বছর দুই আগে।

২০২৩ সালের স্বাধীনতা দিবসের দিনেই গ্রামের মেয়েরা জীবনের প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পেয়েছিলো। আর আমার সৌভাগ্য সেই প্রথম দিনগুলোর সাক্ষী থাকতে পেরেছিলাম আমি। সুচন্দ্রাদি একদিন ফোন করে বললেন, ওদের কয়েকটা স্বদেশ প্রেমের গান তোলাতে হবে। ছোট্ট করে একটা অনুষ্ঠান হবে সেখানে সবাই কোরাসে গলা মেলাবে। এর আগেও গ্রামের ছোট্ট ছেলেমেয়েদের নিয়ে রবীন্দ্র জয়ন্তী করার অপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। সেই টানেই আবারও যাওয়া। কিন্তু ওরা তো কেউ শব্দ চিনে পড়তেই পারে না। গানের কথা মুখস্থ করবে কী করে? কিছু না জেনে বুঝেই মহড়া শুরু হলো। আর আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওরা গানের কথা সুর শুনে শুনে গান তুলল। মুখস্থ হয়ে গেল সবকটা গান। ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসে ওরা জীবনে প্রথমবার নাচলো গাইলো আবৃত্তি করলো। সেই থেকে ওদের স্বাধীন জীবনের যাত্রা শুরু।

ভেবেচিন্তে মেয়েরা এই ক্লাবের নাম দিলো ইচ্ছে আকাশ। ঠিক হলো সপ্তাহে দু-তিনদিন সংসারের সব কাজ শেষ করে বিকেলে এক ঘণ্টা জড়ো হবে সবাই। লেখাপড়া গান নাচ আবৃত্তি নাটক গল্প বলা যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে একটা ঘণ্টা।

দিদিমণির সান্নিধ্যে একে একে বর্ণ চেনা, সেই বর্ণ মিলিয়ে মিলিয়ে শব্দ তৈরি করে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। গত পুজোয় ফাংশানের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাল্মীকি প্রতিভা, তাতে বাল্মীকি থেকে সরস্বতী সব চরিত্রে অভিনয় করেছে এই মহিলারাই। যে মেয়েরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো মেয়েদের জায়গা শুধুমাত্র বাড়ির ভেতরে, তারাই মঞ্চ কাঁপিয়ে নাচছে অভিনয় করছে। এ যেন এক বিরাট জয়। শান্তিনিকেতনের এতো কাছে থেকেও এই মেয়েরা কখনও ঘুরতে যেতে পারেনি কোথাও। ঘুরতে চলে গেলে বাড়ির সব কাজ করবে কে? সব সমস্যার সমাধান কিন্তু এই ইচ্ছে আকাশ ক্লাব। সুচন্দ্রাদি কখনও সবাইকে নিয়ে দল বেঁধে সিনেমাহলে নিয়ে যান আবার কখনও বা বিশ্বভারতীর সংগ্রহশালা আর ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে আনেন। একঘেয়ে জীবনের বাইরে নতুন করে একটা দিন কাটানোর সুযোগ পায় ওরা।

এই তো কিছুদিন আগে পৌষ সংক্রান্তির বিকেলে আরো আকাশের উঠোন জুড়ে বসেছিল ইচ্ছে মেলা। মহিলারা সবাই বাড়িতে নিজের হাতে বিভিন্ন রকমের পিঠে পুলি পায়েস বানিয়ে দোকান দিয়েছিলো। আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ভিড় করে এসেছিলো সেদিন। ব্যাস ইচ্ছেমেলা সাকসেসফুল। একটুখানি সাহস আর ভরসা জোগালেই একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস কতখানি বেড়ে যায় এই মেয়েরাই তার প্রমাণ। আমরা সবসময়ে ভাবি মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু। এই ভাবনাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন সুচন্দ্রা হাজরা। গান নাচ আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য একবার যোগচর্চা করানোরও সুযোগ হয়েছিল। ২৫ থেকে ৭৫ বছর বয়সী মহিলারা যোগ দিয়েছিলেন সেই কর্মযজ্ঞে। আমি যখনই কামারপাড়ায় যাই, এক নতুন অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে নিয়ে ফিরে আসি বারবার। ওদের একটু একটু করে বেড়ে উঠতে দেখি। আর এই চারাগাছগুলোকে মহীরুহের মতো ছায়া দেয় হাজরা পরিবার।

শান্তিনিকেতনের এতো কাছে থেকেও এই মেয়েরা কখনও ঘুরতে যেতে পারেনি কোথাও। ঘুরতে চলে গেলে বাড়ির সব কাজ করবে কে? সব সমস্যার সমাধান কিন্তু এই ইচ্ছে আকাশ ক্লাব।

উদয়দা-সুচন্দ্রাদি আর ওঁদের সন্তান আনক নিঃস্বার্থভাবে এই মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সেলাই মেশিনে সেলাইয়ের ওয়ার্কশপ করানো, প্রজেক্টার লাগিয়ে শিক্ষামূলক ছবি দেখানো তো আছেই। তাছাড়া এবারের শীতে সবাই মিলে হইহই করে চড়ুইভাতিও করেছে এই মেয়েদের উদ্যোগেই। তাই মেয়েরা শুধু বাড়ির কাজে না, বাইরের সব কাজেই সমান পারদর্শী সেই বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ুক মানুষের মনে। আরও মজবুত হয়ে উঠুক এই বিশ্বাস।

একটা ছোট্ট ভাবনা কীভাবে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের চেহারা নেয়, সুচন্দ্রাদির এই উদ্যোগ সামনে থেকে না দেখলে হয়তো আমি এর তাৎপর্য বুঝতেই পারতাম না। রবি ঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটার কথা মনে পড়ে। কাউকে পাশে না পেলে নিজের যতটুকু সামর্থ্য সবটুকু দিয়ে মানুষের পাশে থাকাই জীবনের পরম ধর্ম। কামারপাড়া বাগদিপাড়ার মতো আরও অনেক গ্রামের মেয়েরা এভাবেই এগিয়ে আসুক। শিক্ষা-সংস্কৃতি ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলের জন্যে। সেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। শুধু দরকার একটা সাহায্যের হাত। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক সবার মন। শিরদাঁড়া সোজা রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার পাক সবাই। শুধু নারী দিবসে নয়, প্রতিদিনের জন্য এটাই হয়ে উঠুক আমাদের প্রার্থনা এবং প্রতিজ্ঞা।

 

Written by