September 7, 2024 | 12:00 PM

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং মার্গারিট ম্যাতিউ – নীরব এক প্রেমকাহিনি

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। কখনও নীরবে, কখনও বা সোচ্চারে। মার্কিন দেশে আনন্দবাজারের সাহিত্যমঞ্চে এক সাংবাদিককে তিনি বলেন, বিয়ের আগের প্রেমিকাদের নিয়ে স্পষ্টভাবে লিখলেও, বিয়ের পরে যেসব প্রেম এসেছে, সাহিত্যে কেবল আভাস দিয়েছেন। সরাসরি কিছু জানাননি। স্ত্রী স্বাতীর প্রেমে সুনীল হাবুডুবু খেতেন বিয়ের আগে থেকেই। বহরমপুরে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে সেখান থেকেও চিঠি পাঠিয়েছেন স্বাতীকে। তাতে লেখা, “আমি এ পর্যন্ত তোমার কাছে একটিও মিথ্যে কথা বলিনি, ভবিষ্যতেও তুমি যা জিজ্ঞেস করবে তার কোনো মিথ্যে উত্তর দেবো না। আমি তোমার যোগ্য নই, কিন্তু ক্রমশ যোগ্য হয়ে উঠতে পারি, হতে শুরু করেছি, তোমার সঙ্গে দেখা হবার পর থেকেই আমার নিজের মধ্যে একটা পবিত্রতার স্পর্শ ও বোধ পেয়েছি।”     

ফরাসি বান্ধবী মার্গারিট ম্যাতিউর কথা সুনীল অনেকবার বলেছেন। ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’, ‘অর্ধেক জীবন’, ‘মার্গারিট, ফুল হয়ে ফুটে আছে’ – একের পর এক বইতে ফিরে এসেছে তাঁর প্রসঙ্গ। এমন মায়াবী সম্পর্ক যে সুনীলের কয়েকজন ভক্ত আজও মনে করেন, এই কাহিনি কি আদৌ সত্যি? নাকি সাহিত্যিকের কল্পনা?

সুনীলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি ও অধ্যাপক পল এঙ্গেল আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়েটিভ রাইটিং ওয়ার্কশপে যোগ দেওয়ার জন্য। রোমাঞ্চের হাতছানি পেয়ে সুদূর বিদেশে পাড়ি দেন সুনীল। আইওয়াতে একটি ফ্ল্যাটে থাকার বন্দোবস্ত হল। সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই সুনীলের পরিচয় ঘটে মার্গারিটের সঙ্গে। 

ফরাসি দেশের লুদাঁ গ্রামের মেয়ে মার্গারিট। পোস্ট ডক্টরেট করছিলেন আমেরিকায়। সঙ্গে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে পড়াতেনও। আইওয়াতে সুনীলের ফ্ল্যাটে একবার কয়েকজন যুবক-যুবতী যান আড্ডা দিতে। আড্ডার পর সবাইকে বিদায় জানিয়ে সুনীল দেখেন, একখানা বই ফেলে গিয়েছে কেউ। দু’দিন বাদে এক নারীকণ্ঠের ফোন, বইটা ফেরত নেওয়ার জন্য। সুনীল লিখেছেন, “একটু পরে যে এল, সে বেশ দীর্ঘাঙ্গিনী তরুণী, মাথাভর্তি আলোকলতার মতন এলোমেলো সোনালি চুল, গায়ে একটা ভোরের সূর্যের মতন লাল রঙের সোয়াটার, সারা মুখে সুস্বাস্থ্যের ঝলমলানি। তার হাতে একগুচ্ছ শিশিরভেজা সাদা লিলি ফুল।” এভাবেই দু’জনের আলাপ। 

সুনীলের কাছে মার্গারিট জানতে চেয়েছিলেন শকুন্তলার উপাখ্যান। তাঁকে ফ্ল্যাটে আমান্ত্রণ জানালেন সুনীল। ভারতবর্ষের পৌরাণিক গল্প শুনে মার্গারিট আপ্লুত। ধীরে ধীরে দু’জনের অন্তরঙ্গতা বাড়ে। সুনীলের থেকে মার্গারিট শুনতেন ভারতের কথা। চন্দননগরের নাম শুনে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “দুশো বছর আগে ফরাসিরা যদি বুদ্ধি করে ইন্ডিয়াটা জিতে নিত ইংরেজদের কাছ থেকে, তাহলে তোমরা ওই বিচ্ছিরি ইংরেজি কালচারের বদলে কত উন্নত একটা কালচারের ঘনিষ্ঠ হতে!” এই কথার মধ্যে ছিল বিশুদ্ধ রসিকতা। কোনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা ছিল না। ইতিহাস, সাহিত্য ও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হত দু’জনের মধ্যে।

মার্গারিট ছিলেন নিষ্ঠাবান ক্যাথলিক। এতটাই ধর্মপরায়ণ যে, সুনীল একবার চুম্বনের ইচ্ছে প্রকাশ করায় মার্গারিট প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনা নিয়ে দু’জনের মনোমালিন্য হলেও তা সহজেই কাটিয়ে ওঠেন তাঁরা। সুনীল অবাক হতেন, এমন ধার্মিক মেয়ের হওয়া উচিত ছিল সন্ন্যাসিনী। আর মার্গারিট কিনা কবিতার জন্য পাগল! মাঝেমাঝেই সুনীলকে পড়ে শোনাতেন ফরাসি কবিতা। পড়তে পড়তে কেমন যেন বিভোর হয়ে যেতেন।

হঠাৎ মার্গারিটের কাছে টেলিগ্রাম গেল, দেশে তাঁর মা খুব অসুস্থ। সুনীল তাঁকে এয়ারপোর্টে তুলে দিলেন। কিন্তু তারপর আর আইওয়ায় মন টিকল না। সুনীল বেরিয়ে পড়লেন ভ্রমণে। শিকাগো, লস এঞ্জেলিস, বার্কলে, অ্যারিজোনার মরুভূমি, মেক্সিকোর প্রান্ত শহর। দু’সপ্তাহের মধ্যে মার্গারেটের ফিরে আসার কথা ছিল, কিন্তু মায়ের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ফেরা হয়নি। দু’জনের কথাবার্তা হত চিঠি আর টেলিফোনে।

তারপর আটলান্টিক পার করে সুনীল একদিন পৌঁছলেন প্যারিস। এয়ারপোর্টে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন মার্গারিট। দেখা হতেই ফরাসি কায়দায় চুমু খেলেন দুই গালে। শুরু হল আরেক অ্যাডভেঞ্চারের জীবন। দু’জনে প্যারিস ঘুরে বেড়াতেন। নিজেদের মতো করে শহরটাকে চেনার চেষ্টা করতেন। অর্থ বেশি ছিল না তাঁদের। অল্পের মধ্যেই মানিয়ে-গুছিয়ে আনন্দে থাকতেন। এরই মধ্যে আমেরিকা থেকে মার্গারিটের ডাক আসে। গবেষণার কাজ শেষ করতে হবে। অথচ ছেড়ে যেতে মন চায় না। শেষপর্যন্ত বিদায় নিতেই হল। দু’টো আলাদা ফ্লাইট ধরে দু’জনেই ফ্রান্স ছাড়লেন।

সুনীল কলকাতায় ফিরে আসার পর মার্গারিটের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তবে নানা কারণে মার্গারিট ভারতে আসতে পারেননি। তিন বছর কেটে যায়। ফরাসি জানা এক যুবতী, আলিয়াঁস ফ্রাঁসেজের ছাত্রী স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় সুনীলের। যা এক গভীর প্রেমের দিকে মোড় নেয়। সুনীল চিঠি লিখে মার্গারেটকে জানালেন স্বাতীর কথা। স্বাতীকেও শোনালেন মার্গারিটের গল্প। স্বাতী আর মার্গারিট পরস্পরকে চিঠি লেখা শুরু করলেন। সুনীল-স্বাতীর বিয়ে হল। এক বছরের মধ্যে পুত্র সন্তানের জন্ম হলে মার্গারিট উচ্ছ্বসিত হয়ে কিছু টাকা পাঠালেন উপহার হিসেবে। গির্জায় গিয়ে শিশুটির শুভ ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করলেন।

এরপর মার্গারিট হঠাৎই নীরব হয় যান। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন সুনীল। কিন্তু যোগাযোগ করতে পারেন না কোনোভাবেই। বহুদিন বাদে পল এঙ্গেলের থেকে জানতে পারেন, আমেরিকার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় অপরিচিত কয়েকজন লোক গাড়ি করে তুলে নিয়ে গিয়েছে মার্গারিটকে। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই তাঁর। রহস্যের কিনারা পুলিশও করতে পারেনি। 

অনেক বছর পর ১৯৮৯ সালে সুনীলের ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। মার্গারিটের প্রসঙ্গ আসতে সুনীল বলেন, “… আমি ধপ করে বসে পড়লাম। জ্বরে যেন আমার শরীরটা কাঁপছে। নিজেকে সামলাতে পারছি না। দরদর করে জল পড়ছে চোখ দিয়ে। শৈশবের প্রায় কুড়ি-পঁচিশ বছর পর আমি আবার কাঁদছি। নির্লজ্জের মতন। আমার হেঁচকি উঠে যাচ্ছে। হাতের চেটো দিয়ে মুখ মুছেও সে-কান্না শেষ করা যায় না। আবার জানালা দিয়ে তাকাবার চেষ্টা করলাম। আর কিছুই দেখা যায় না। বাইরে শুধু মেঘ। আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আমি একলা… আর এ কী অসম্ভব একাকিত্ব, বুক যেন ছিঁড়ে যেতে চাইছে। মার্গারিট, আমি আছি, তুমি আমার দিকে একবার তাকাও, চোখে চোখ রাখো আর একবার বলো, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই তো আনন্দের।”

তথ্যঋণ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ইমদাদুল হক মিলন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি – নীলাঞ্জন রায়
মার্গারিট ম্যাতিউর ছবি – ছবির দেশে কবিতার দেশে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

Written by