জানা অজানায় সত্যজিৎ রায় : বালিগঞ্জ গভর্মেন্টের প্রাক্তন ছাত্র সংসদ আয়োজিত অনুষ্ঠান

জনপ্রিয় প্রাক্তনীর প্রতি অন্যান্য প্রাক্তনীদের শ্রদ্ধা

গৌতম ভট্টাচার্য, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, জয়দীপ মুখার্জি, যুধাজিৎ মুখার্জি (বাঁদিক থেকে)

যেকোনো সভ্য সমাজের ক্ষেত্রে সুশিক্ষিত ছাত্রদের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় তা দেখিয়েছিলেন তাঁর ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির মাধ্যমে। সেখানে অত্যাচারী রাজা ভয় পায় শিক্ষক উদয়ন পণ্ডিতকে, পাছে তিনি শিক্ষিত চিন্তাশীল ছাত্রদল গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত সেই উদয়ন পণ্ডিত আর তাঁর ছাত্ররাই হীরক রাজ্যে ফিরিয়ে আনে শান্তি। বিদ্যালয় সম্পর্কে এইরকম সদর্থক ছবি (যা পরবর্তীকালে ছায়াছবিতে ফুটে উঠেছে) সত্যজিৎ রায়ের মনের ক্যানভাসে রঙিন হয়ে ছিল তাঁর নিজের স্কুলজীবনের স্মৃতি থেকেই। আর সেই স্কুলের নাম বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাইস্কুল। গত ১৮ জুন এই বিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্র সংসদের উদ্যোগে পালিত হল বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাইস্কুলের অন্যতম জনপ্রিয় কৃতি প্রাক্তনী সত্যজিৎ রায়-এর ১০২তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ‘জানা অজানায় সত্যজিৎ রায়’। অনুষ্ঠানে হাজির ছিল বঙ্গদর্শন.কম-এর প্রতিনিধি।

এক ফ্রেমে যাদব সেন, জয়দীপ মুখার্জি, কৌশিক চক্রবর্তী এবং অন্যান্যরা

সত্যজিৎ রায়ের স্মরণে ১৮ জুন রবিবারের সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব তথা রায় পরিবারের সদস্য ও এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী প্রসাদ রঞ্জন রায়, আজকাল পত্রিকার প্রাক্তন গ্রন্থাগারিক ও সত্যজিৎ ঘনিষ্ঠ দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (যিনি দেমু নামে পরিচিত), চলচ্চিত্র পরিচালক এবং অভিনেতা তথা বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, আরেক প্রাক্তনী এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য প্রমুখ। বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্রসংসদের সম্পাদক যুধাজিৎ মুখোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমাদের ইচ্ছা ছিল বিদ্যালয়ে সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষ পালন করা। কিন্তু কোভিড পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরের বছর একটা ওয়ার্কশপ করা হলেও সুচিন্তিত ভাবে বড়ো করে পালন করার ইচ্ছা ছিলই, তারই ফলশ্রুতি এই অনুষ্ঠান”। এদিনের সভার শুরুতেই স্বাগত ভাষণের মাধ্যমে সকলকে স্বাগত জানান শ্রী মুখোপাধ্যায়। এদিনের সভায় স্মৃতিচারণায় উঠে আসে নানা মজার কাহিনিও। জানা যায়, প্রসাদ রঞ্জন রায় যখন ১৯৫৬ সালে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তখন সত্যজিৎ রায় তাঁকে বলেছিলেন, “ও আচ্ছা, তুমিও তাহলে এখানে ভর্তি হলে।” পরবর্তীতে প্রসাদবাবু যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তখন তিনি সত্যজিৎকে বলেন, “এবার কিন্তু আমি তোমার কলেজেও ভর্তি হলাম”। আলোচনা প্রসঙ্গে উঠে আসে কীভাবে হয়েছিল বিখ্যাত ভিলেন চরিত্র মগনলাল মেঘরাজের নামকরণ।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক রণজিৎ গরাং এবং অন্যান্য শিক্ষকরা

পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বলেন ছবি তৈরির ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় আজও প্রাসঙ্গিক। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিষয়টি জানিয়ে তিনি জানালেন ছবি তৈরির ক্ষেত্রে শট অনুযায়ী ছবি আঁকার কৌশল তাঁর বিদ্যালয়ের পূর্বসূরি এই পরিচালকের কাছ থেকেই শিখেছেন। জয়দীপ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র একেনবাবুর স্রষ্টা সুজন দাশগুপ্তও ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী।

পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বলেন ছবি তৈরির ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় আজও প্রাসঙ্গিক। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিষয়টি জানিয়ে তিনি জানালেন ছবি তৈরির ক্ষেত্রে শট অনুযায়ী ছবি আঁকার কৌশল তাঁর বিদ্যালয়ের পূর্বসূরি এই পরিচালকের কাছ থেকেই শিখেছেন।

সত্যজিৎ রায়ের জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব কতটা ছিল এদিন সন্ধ্যায় তা ব্যক্ত করলেন দেবাশিস মুখোপাধ্যায়। জানালেন সুকুমার রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতার কথাও। তিনি আরও জানান, শান্তিনিকেতনের কলাভবনের একটি গ্রামের ছবি গভীর প্রভাব বিস্তার করে সত্যজিতের মনে। গ্রামের সেই ছবিই তিনি বড়োপর্দায় তুলে এনেছেন ‘পথের পাঁচালী’-র দৃশ্যায়নে। সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যও মনোগ্রাহী বক্তৃতার ভাগ করে নিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে কলকাতার ভবানীপুরে ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে সত্যজিৎ রায়ের বাসভবনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।

প্রসাদ রঞ্জন রায় এবং যুধাজিৎ মুখার্জি

বিদ্যালয় চত্বর সত্যজিৎ রায়ের জীবনে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অশীতিপর এক প্রাক্তনী তাঁর স্মৃতিচারণায় আমাদের জানালেন, “মনে পড়ে একবার স্কুলে ‘আড্ডার আসর’ নামে এক অনুষ্ঠানে কিছুক্ষণের জন্য এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়, আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। স্কুলের বড়ো ছাত্রদের ‘দাদা’ বলা যাবে এবং ‘তুমি’ বলা যাবে এই নিয়মটা সত্যজিৎবাবুই তৈরি করেছিলেন”। তিনি আরও জানান বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাইস্কুলের হলঘরে যে লোগোটি আছে তা সত্যজিতেরই সৃষ্টি।

সকলের কাছেই স্কুল শৈশবের দ্বিতীয় বাড়ি, যেখানে তৈরি হয় নৈতিক মেরুদণ্ড। বিশ্ববরেণ্য পরিচালকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বালিগঞ্জ গর্ভমেন্ট হাইস্কুলের কাছে বিশ্বজয়ী পরিচালকের আগেও তাঁর পরিচয় স্কুলের কৃতি প্রাক্তনী। তাই প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষক, ছাত্র, শিক্ষাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পালন করলেন তাঁদের স্কুলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্মদিন।

Post Tags
Developed by DXDasia