থিসিস ও অ্যান্টি-থিসিসের দ্বন্দ্ব : ফিরে দেখা ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’

খাতায় কলমে ‘অযান্ত্রিক’ ঋত্বিক কুমার ঘটকের প্রথম ছবি। সদ্য-স্বাধীন নবজাতক ভারতবর্ষের উপনিবেশোত্তর চেতনায় আধুনিকতা তখন দ্রুত গতিতে মিশছে। এমতাবস্থায়, ঋত্বিক ঘটক যে তাঁর দ্বিতীয় ছবির জন্যে সুবোধ ঘোষের অযান্ত্রিক-এর মতো একটা টেক্সটকেই বেছে নেবেন তা নিছকই কাকতালীয় ঘটনা নয়। সমাজের দ্বন্দ্বগুলির একাগ্র পাঠ ঋত্বিকের আটটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবিতেই প্রতিফলিত হয়েছে। মানদণ্ডের নিরিখে ছবিগুলির তুল্য-মুল্য বিচার করা যায় না, কারণ ওঁর কোনো ছবিই বুর্জোয়া-এস্থেটিক্সের ছাঁচে তৈরি নয়, বরং প্রত্যেকটিই এক-একটি সময়ের দলিল যা তাদের নিজস্ব কান্তি অর্জন করে নিয়েছে পরিচালকের একটি প্রায়-মৌলিক নান্দনিকতা ও মনোজ্ঞ শিল্পবোধ থেকে। ফলত, আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর প্রতিটি পালা বদলের সময়ই ঋত্বিকের এক-একটি ছবি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আজ একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশের শেষে মানুষ ও যন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক যখন আচম্বিতে এমন এক মোড় বদল করে নিচ্ছে, যার পরিনতি এখনও আমরা জরিপ করে উঠতে পারছি না, তখন ঋত্বিকের ‘অযান্ত্রিক’ কেই সর্বাপেক্ষা জরুরি ছবি বলে মনে হচ্ছে।

আজ একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশের শেষে মানুষ ও যন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক যখন আচম্বিতে এমন এক মোড় বদল করে নিচ্ছে, যার পরিনতি এখনও আমরা জরিপ করে উঠতে পারছি না, তখন ঋত্বিকের ‘অযান্ত্রিক’ কেই সর্বাপেক্ষা জরুরি ছবি বলে মনে হচ্ছে।

সদ্য কলকাতায় আসা, তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ঋত্বিক ঘটক-এর কাছে সুবোধ ঘোষের অযান্ত্রিক, শিল্পে কল্পনার একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্ন দিগন্ত উন্মোচিত করে তোলে। কল্প-বিজ্ঞানের কল্পনার অমেয় ব্যবহার নয়, বরং রিয়্যালিজমের সীমিত সৃজনে নির্মিত মানুষ ও যন্ত্রের আত্মীয়তার এই ট্র্যাজিক গল্পটি টানা দশদিন ধরে ঋত্বিককে ভাবিয়েছিল। গল্পে বিমল ও তার মান্ধাতার আমলের গাড়িটির অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের মধ্যে নিহিত একাধিক অনুভূতির গূঢ় দর্শনের দ্যোতনাই মূলত ঋত্বিকের মননে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কথায়, “এই গল্পটি আমাদের সাহিত্যে একটি নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে : মানুষ ও যন্ত্রের অন্তর্বর্তী, গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য সম্পর্ক।” এরপরে বারো বছর ধরে ঋত্বিকের মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে গল্পটি। ততদিনে তিনি দেখে ফেলেছেন আইজেনস্টাইন, পুডভোকিন, জিগাভার্তোভ’দের ছবি। আত্মস্থ করে ফেলেছেন ইমেজের ডায়লেকটিক্স ও সোভিয়েত মন্তাজের তত্ত্ব। পাশ্চাত্যের বিমূর্ত নন্দনতত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে খানিকটা সোভিয়েত ছবির অনুপ্রেরণা ও অনেকটা দেশজ সংস্কৃতি ও নিজস্ব মৌলিক অনুচিন্তনের ওপর ভিত্তি করেই এক যুগ ধরে ঋত্বিক তাঁর মাথায় অযান্ত্রিকের কাহিনিটিকে বুনেছেন তাঁর আসন্ন ফিল্মের সম্ভাব্য চিত্র ও শব্দভাষার সঙ্গে, যা আজ তাঁকে দ্রষ্টাবলে মনে করতে বাধ্য করে। ‘সনাতন জীর্ণ কু-আচারে’র অন্তরাল থেকে করা বিমূর্ত ভবিষ্যৎবাণী নয় বরং তিনি দ্রষ্টা হতে পেরেছেন তাঁর সময়ের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে প্রকৃতিস্থ করে, সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যুক্তি ও তর্কের দ্বারা আসন্ন সমাজের প্রতিকূলতাগুলোকে চিনিয়ে দিতে পেরে। কাজেই, এই সময়ে দাঁড়িয়ে, আমাদের চেতনায় অযান্ত্রিকের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে গেলে, গল্পটির আড়াল থেকে ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি ও তর্কগুলোকেও বুঝতে হবে।

মানুষ ও যন্ত্রের এই আপাত জটিল আন্তঃসম্পর্ক সম্বন্ধে ঋত্বিক লিখেছিলেন, “স্রেফ তথাকথিত তুচ্ছ মানুষরা, যেমন শিশু, সরলমনা কৃষক ও আদিবাসীরাই বিমলকে চিনতে ও বুঝতে পারবে। শহুরে মানুষদের কাছে ‘অযান্ত্রিক’ একটি উন্মত্ত প্রলাপীর গল্প ব্যতীত কিছু নয়।”

১.
‘অযান্ত্রিক’কে এপিসোডিক ছবি বলা চলে। ছবির ন্যারেটিভ মূলত তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে আমরা দেখি বিমলের, তার গাড়িটি, জগদ্দলের প্রতি অপত্য স্নেহ। ছবিটির প্রথম কয়েকটি শটই বুঝিয়ে দেয় আধুনিকতার ঝিলমিল ততদিনে সমাজের গায়ে লেগে গেছে। এদেশে যাদের হাত ধরে আধুনিকতা এসেছিল, সেই শ্বেতাঙ্গদের গোরস্থান পার করে বিমলের নিবাস; আর স্ট্যান্ডে একঝাঁক কেতাদুরস্ত নতুন মডেলের গাড়ির মাঝে তার ‘বুড়ো ফোর্ড দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোয়, জটায়ুর মতো জরাভার নিয়ে।’ বিমলের তিনকুলে কেউ নেই। পনেরো বছর আগে, ধরে নেওয়া যায় পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়, সে তার মাকে হারায় এবং জগদ্দল তারপরে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। কাজেই, নিঃসঙ্গ বিমলের মানসের অধিকাংশটা জুড়েই ছড়িয়ে পড়ে জগদ্দলের অনুযোগ-অভিযোগহীন উপস্থিতি, যা সমাজের কাছে দুর্বোধ্য বলে ঠেকে। জরাজীর্ণ গাড়িটির সঙ্গে বিমলের দীর্ঘ প্রাত্যহিক সহবাস, বেঙ্গলি ক্লাবের বাবুদের কাছে কৌতুকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ ও যন্ত্রের এই আপাত জটিল আন্তঃসম্পর্ক সম্বন্ধে ঋত্বিক লিখেছিলেন, “স্রেফ তথাকথিত তুচ্ছ মানুষরা, যেমন শিশু, সরলমনা কৃষক ও আদিবাসীরাই বিমলকে চিনতে ও বুঝতে পারবে। শহুরে মানুষদের কাছে ‘অযান্ত্রিক’ একটি উন্মত্ত প্রলাপীর গল্প ব্যতীত কিছু নয়।”

ছবির প্রথম পর্বেই ঋত্বিক প্রতিষ্ঠা করেন এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের যৌক্তিক ভূমিটি। একটি নববিবাহিতা দম্পতিকে হোরাবে ছেড়ে আসার পথে বিমল, তার সঙ্গী সুলতানের কাছে স্বীকার করে নেয়, জগদ্দল আসলে একটা মানুষ যা বেঙ্গলি ক্লাবের বাবুরা বোঝে না। জগদ্দলকে মানুষ বলে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টায় বিমল নিজে তার সহজাত প্রবৃত্তিগুলি পরিহার করতে থাকে। তিনদিনের খাবার সে একদিনে খায় যা বিজ্ঞানের নিয়মে ‘সুস্থ’ মানুষের রীতিনীতির সঙ্গে মেলে না, আর কোথাও যেন বাবুদের বিদ্রুপ হাসিমুখে মেনে নিয়ে বিমল নিজে ‘যন্তর’ হয়ে উঠতে থাকে। অথচ, গাড়িটির অন্ন-বস্ত্রের দিকে তার নজর সদা-সর্বদাই থাকে। ‘ভারী তেষ্টা পেয়েছে না রে জগদ্দল’ বলে বিমল যখন গাড়িটির রেডিয়েটরে জল ঢেলে দেয় তখন মানুষের মতোই ‘ঢক ঢক’ শব্দ করে তৃষ্ণার্ত গাড়িটি তৃপ্তি পায়। এই ক্লোজ-আপ দৃশ্যে বিমলের অপলক দৃষ্টিতে রেডিয়টরে জল ঢালার সময় ঋত্বিকের শব্দের ব্যবহারটিকে পরিচালকের র‍্যাডিকাল ফিল্মমেকিং-এর বৈশিষ্ট্য বলা চলে, যা চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র-শব্দের ভাষ্যকে ভেঙে দেয় এবং একই সঙ্গে নতুন ফিল্মের পরিভাষাও তৈরি করে। পরিচালক দৃশ্যটির নির্মাণ এমন ভাবে করেন যে বিমলের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, সে যেন গাড়িটির তৃষ্ণা মেটানোর শব্দ সত্যিই শুনতে পাচ্ছে, আর এখানেই ঋত্বিক একইসঙ্গে বিদ্রুপও করেন আবার ভেঙেও দেন ফিল্মের প্রাতিষ্ঠানিক নন-ডায়েজেটিক শব্দের প্রয়োগকে।

বিমলের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, সে যেন গাড়িটির তৃষ্ণা মেটানোর শব্দ সত্যিই শুনতে পাচ্ছে, আর এখানেই ঋত্বিক একইসঙ্গে বিদ্রুপও করেন আবার ভেঙেও দেন ফিল্মের প্রাতিষ্ঠানিক নন-ডায়েজেটিক শব্দের প্রয়োগকে।

২.
শব্দের প্রয়োগে তর্ক করার এক বিরল নৈপুণ্য ঋত্বিক ঘটক আয়ত্ব করেছিলেন। ফ্রান্স ও ইতালির নব্য-ধারার ছবিগুলিকে কেন্দ্র করে বিদগ্ধ গবেষণার ব্যাপ্তি ভারতে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঋত্বিক, তাঁর মৌলিক নিরীক্ষণের দ্বারাই উপলব্ধি করে ফেলেছিলেন যে ছবিতে ইমেজ ও সাউন্ড গুরুত্বের নিরিখে অনুরূপ ও একে অপরের পরিপূরক। দুটির সুষম প্রয়োগ ব্যতীত ছবিতে যুক্তি, তর্ক করা সম্ভব নয়। ‘ছবিতে শব্দ’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে ঋত্বিক বলেন, ইমেজের পাশাপাশি “সংগীতের মধ্যে দিয়ে আমরা অপর একটি স্তরে সমান্তরালভাবে ছবির বক্তব্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা করি।” ওঁর এই তত্ত্ব-প্রয়োগ-উপলব্ধির মার্ক্সীয় প্র্যাক্সিসই অযান্ত্রিকের শব্দ-নকশাকে অমরত্ব প্রদান করেছে।

অযান্ত্রিকে ন্যারেটিভের প্রবাহমানতার সঙ্গে উঠে আসা ইমেজ-সমূহের মধ্যে নিহিত ট্রাজেডির ব্যাঞ্জনাগুলিকে ঋত্বিক, দৃশ্যের সঙ্গে সাযুজ্য বজায় রেখে অপর একটি সমান্তরাল স্পেসে সাউন্ডের দ্বারা ক্রমাগত ব্যক্ত করে চলেন। ন্যারেটিভের এক-একটি মুডের সঙ্গে পরিচালক একটি করে বিশেষ সাউন্ড-ট্র্যাক জুড়ে দেন এবং এমনভাবে প্রতিটি ট্র্যাককে ব্যাবহার করেন যে শব্দগুলি ছবির নির্দিষ্ট কিছু চরিত্র ও তাদের মন-মেজাজের স্বাক্ষরচিহ্ন হয়ে ওঠে। যেমন, জগদ্দলের ছবিতে যাওয়া-আসার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে জুড়ে থাকে একটি বিকট জগঝম্প শব্দ, যা গাড়িটির একার্থে মৃত্যুর পরেও আমরা শুনতে পাই। শব্দের এমন বিরল পৌনঃপুনিক ব্যবহার ভারতীয় ছবিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

আবার, ছবির দ্বিতীয় পর্বে বিমলের নিঃসঙ্গ জীবনে, সম্ভবত প্রথমবার কোনো নারী এসে পড়ে। কতকটা ভুল করেই সে এসে পড়ে। কিন্তু, বিমলের জীবনে এই সময়ের আগে পর্যন্ত জগদ্দলের ‘ভৈরব হর্ষ’ ছাড়া আর কোনো সুর ছিল না। এবার ঋত্বিক বিমলের জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেন একটি মেলোডি ট্র্যাক, যা তার রুখা মনোভূমিতে অপ্রত্যাশিত বারিপাতের মতোই ভেসে-ভেসে আসে আমাদের কাছে। যদিও শেষ পর্যন্ত এই সুর, বিমলের জীবনে সুখ ও আনন্দের মতোই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে না, ও নাম-না-জানা মেয়েটির সঙ্গে বিমলের বিচ্ছেদের দৃশ্যের আগেই তার হৃদয় ওলোট-পালোট করে বিলীন হয়ে যায়।

৩. 
ছবির তৃতীয় পর্ব জুড়ে থাকে একাধিক ক্লোজ-আপ। বিমলের মুখের রেখার ক্রমাগত আন্দোলন দিয়েই পরিচালক আরেকবার উসকে দেন মানুষ ও যন্ত্রের আন্তঃসম্পর্কের প্রশ্নটি।

সেই কবে কোন গুহার আঁধার কাটিয়ে আলো জ্বেলেছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা। জার্মান দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংলার এই ঘটনা বিবৃত করতে গিয়ে আবেগ-তাড়িত হয়ে লেখেন, “না জানি কি হর্ষ জেগে ছিল সেই মানুষটির চিত্তে, যে প্রথমবার আগুন আবিষ্কার করেছিল।” এই আদিম অনাবিল আনন্দ অবশ্য চিরস্থায়ী হয়নি মানুষের চিত্তে। প্রতিটি যন্ত্রের আবিষ্কারই পাল্টে দিয়েছে সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে, বদলে গেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো। একুশ শতকে এসে বলা যায়, যন্ত্র মানুষের শ্রম কমিয়েছে বটে কিন্তু তাকে নতুন করে নিঃসঙ্গ হতে বাধ্য করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আমাদের একরকমভাবে সঙ্গ দেওয়া শুরু করেছে বটে, তবে সর্বার্থেই সে নির্জীব ও কৃত্রিম সঙ্গী। ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি যেমন একদিকে, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সুদূর ভবিষ্যতেও মানুষের স্বকীয় কর্মক্ষমতার নির্ভেজাল নৈপুণ্য দখল করার কোনো সম্ভাবনাই আপাতত দেখছেন না, অপরদিকে মনে পড়ে যায়, এক যুগ আগে কীভাবে স্পাইকজোনয, তাঁর ছবি ‘হার’-এ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছিলেন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে একটি প্রেমের সম্পর্কের সম্ভাবনা ও তার পরিণতিকে। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র থিয়োডরের একাকীত্ব আজ আর আমাদের চিনতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু এই যন্ত্র ও মানুষের নয়া-সম্পর্কের মোড় বদলের সময়, অযান্ত্রিকের বিমলকে আজকের দিগভ্রান্ত সমাজের বিভ্রান্ত মানুষের আর্কেটাইপ বলে মনে করলে কি খুব ভুল হবে?

বিমলের জীবনে একটি মাত্র নারীর স্বল্পকালীন উপস্থিতিতেই সে টের পেয়েছিল যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা। নাহলে কি ছবির প্রথম পর্বের বিমল কখনও তার একমাত্র সঙ্গী জগদ্দলকে “লোহার বাচ্চা” বলে গালাগালি করে? যদিও শ্রেণি-সচেতন ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে এই সমস্ত ব্যাঞ্জনা নিহিত থাকলেও বিমলের শ্রেণিগত অবস্থানকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। আর, এই শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেই, নিরাশার নদী পেরিয়ে এসে শেষ দৃশ্যে বিমলের প্রত্যাশার তাৎপর্যকে উপলব্ধি করা যায়, যখন জগদ্দলের বাদ পড়ে যাওয়া অঙ্গসমান হর্নটি একটি শিশু হাসিমুখে অনবরত বাজিয়ে চলে। ফিরে আসে ঋত্বিকের শব্দ ব্যবহারের অতুলনীয় স্বাক্ষর। তবুও, প্রশ্ন থেকেই যায়, যন্ত্র ও মানুষের সম্পর্ককে এমনভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার পরেও কেন কিয়ৎক্ষণের জন্যে হলেও বিমল পথভ্রষ্ট হলো? মানুষ ও যন্ত্রের আন্তঃসম্পর্কের সম্ভাবনার অনুসন্ধানে নেমে ঋত্বিক ঘটক অযান্ত্রিক-এ কি একই সঙ্গে তাঁর থিসিস ও অ্যান্টি-থিসিস দুটোই আমাদের দিয়ে যাননি?

Written by