
সবুজ প্রান্তর জুড়ে মাঘের মিঠে রোদের শান্তভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। সেই সবুজ প্রান্তরের মধ্যে থাকা মাটির উঁচু ঢিবির ওপর গাজী সাহেবের মাজার। পাশে থাকা বিশালাকায় তেঁতুল গাছ তার স্নিগ্ধ ছায়ায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। জাতি, ধর্ম-বর্ণ, বিশ্বাস ও গোত্র নির্বিশেষে মানুষ ভক্তি ভরে আসছে গাজী সাহেবের মাজারে নিজেদের মনের শ্রদ্ধা জানাতে।

আনুমানিক প্রায় ৩০০ বছর ধরে এভাবেই হিন্দু ও মুসলমানের সাধনার ঐক্য মঞ্চ হয়ে উঠেছে গাজী সাহেবের এই মেলা। মাজারের দায়িত্বে থাকা ৭৮ বছর বয়সী আবু হোসেন শাহজীর মতে এই মাজার আনুমানিক প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছর পুরনো।
এমনই দৃশ্য প্রতিবছর প্রস্ফুটিত হয় নদিয়া জেলার চাকদহের শ্রীনগর কাদাঘাটের গাজী সাহেবের মেলায়। প্রতিবছর সরস্বতী পুজোর পরের দিন গাজী সাহেবের এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। নদিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে বহু মানুষ ভক্তিভরে গাজী সাহেবের মাজারে নিজের মনস্কামনা এবং একই সঙ্গে ভক্তি ও শ্রদ্ধা জানাতে আসে। তাদের শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে থাকে রঙিন জোড়া ঘোড়া, লাল-সাদা বাতাসা, ধুপকাঠি ও মোমবাতি। মনস্কামনা পূর্ণ হলে মাজারের ওপর চাদর চড়ানোর রীতি রয়েছে। মূলত উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর থেকে এই চাদর কিনে মাজারে দেওয়া হয়। মাজারের ঠিক পাশেই বিপুল পরিমাণে রঙিন ঘোড়া নিয়ে বসেন স্থানীয় দোকানিরা। সেখান থেকেই জোড়া ঘোড়া কিনে গাজী সাহেবের মাজারে উৎসর্গ করেন পুণ্যার্থীরা। আবার কিছু পুণ্যার্থী এমনও রয়েছেন, যাঁরা মাজারে মধ্যে থাকা ঘোড়া শুভ সূচক প্রতীক হিসেবে সংগ্রহ করে থাকেন।

আনুমানিক প্রায় ৩০০ বছর ধরে এভাবেই হিন্দু ও মুসলমানের সাধনার ঐক্য মঞ্চ হয়ে উঠেছে গাজী সাহেবের এই মেলা। মাজারের দায়িত্বে থাকা ৭৮ বছর বয়সী আবু হোসেন শাহজীর মতে এই মাজার আনুমানিক প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছর পুরনো। গাজী সাহেব সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ফকির হন। তাঁর পিতার নাম শাহ সিকান্দার বাদশা। মাতা ছিলেন আজুবা সুন্দরী। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর প্রয়াণের পর এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী সরস্বতী পুজোর পরের দিন গাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বাৎসরিক পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সিংহভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই অনুষ্ঠানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অংশগ্রহণ করে আসছে। তাঁরা ভক্তিভরে জোড়া ঘোড়া, বাতাসা এবং সাধ্যমতো দুধ কলা ফল দিয়ে গাজী সাহেবের মাজারে পুজো দিয়ে যান। অনেকে মাজার প্রদক্ষিণ করে থাকেন। কতবার প্রদক্ষিণ করতে হবে তেমন কোনও নিয়ম নেই। কেউ একবার প্রদক্ষিণ করেন তো আবার কেউ ৫ থেকে ৭ বার। এই পুজোর নির্ধারিত কোন পরম্পরাগত রীতি বা নিয়ম নেই। মানুষের মনের ইচ্ছাই গাজী সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধায় পরিণত হয়েছে। মানুষ নিজের সাধ্যমত গাজী সাহেবের প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে থাকেন। বিভিন্ন উচ্চতার মাটির ঘোড়ার পাশাপাশি সত্যিকারের টাট্টু ঘোড়াও এখানে সাধারণ মানুষ দিয়ে থাকে। এমনকি জ্যান্ত পাঁঠা গাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। আগে এই মেলা একদিনের জন্যে হলেও বর্তমানে দশদিন ধরে চলে। যদিও মেলার প্রথম দিন অর্থাৎ সরস্বতী পুজোর পরের দিন সর্বাধিক ভিড় দেখতে পাওয়া যায়। শাঁখা-সিঁদুর পরিহিতা হিন্দু রমণীরা জোড়া ঘোড়া নিবেদন করে করজোড়ে প্রণাম করে পুজো দেয় গাজী সাহেবকে।
এখানে যেসব জোড়া ঘোড়া গাজী সাহেবের মাজারে দেওয়া হয় সেগুলির নান্দনিক বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ২৪ পরগনার তালডাঙ্গার রক্তেশ্বর গাজীর মাজারে যে ঘোড়া দেওয়া হয় তার গঠন বিমূর্ত। সে মূলত হাতে টিপে তৈরি করা হয়। ঘোড়ার গায়ে নীল রঙের প্রাধান্য বেশি। কিন্তু কাদাঘাটের গাজী সাহেবের মেলায় যে ঘোড়াগুলো দেখতে পাওয়া যায় সেগুলির গঠন বাস্তবধর্মী। বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত ঘোড়াগুলির মধ্যে মাটির পুতুলের মতো লালিত্য রয়েছে। ঘোড়ার চোখ ও মুখের সার্বিক গঠনে মৃৎশিল্পীরা নিজেদের প্রতিভা দিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ঘোড়ার পিঠে আলপনার মতো নকশা সৌন্দর্যবৃদ্ধি করেছে। আবার কয়েকটি মাটির ঘোড়ার পিঠে জরির চাদর এঁটে দেওয়া হয়েছে। মূলত নদিয়া জেলার আদিত্যপুরের মৃৎশিল্পীরা মাটির এই ঘোড়াগুলো তৈরি করে থাকেন। তাঁদের থেকেই পাইকারি দরে কিনে স্থানীয় দোকানিরা মেলা চত্বরে বসেন। কাঁচা এবং পোড়ামাটির দুই ধরনের ঘোড়া এখানে দেখতে পাওয়া যায়। পরিজনের সুস্বাস্থ্য, রোগ থেকে আরোগ্য লাভ, কৃষিতে ভালো ফলনের আশায় জোড়া ঘোড়া মাজারে দেওয়া হয়।

মেলা উপলক্ষ্যে স্থানীয় কুমোর পাড়ার মৃৎশিল্পীরা নিজেদের তৈরি মাটির তৈরি বাসন, লক্ষ্মী ভাণ্ডার এবং গার্হস্থের জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য মাটির তৈরি সামগ্রী নিয়ে বসেন। মেলাপ্রাঙ্গণের মধ্যেই তাঁদের বাড়ি। সেই বাড়ির উঠোনের মধ্যে বসেই এই সকল মৃৎশিল্পের সম্ভার তাঁরা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। বিভিন্ন রঙের এই সকল মৃৎশিল্প বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে বেতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের আসবাব যেমন ধামা, কুলো, ফুল ও ফলের ঝুড়ি মেলা প্রাঙ্গণে দেখতে পাওয়া যায়। কাঠের খেলনা গাড়ি, কাঁসার থালায় রাখা জিলিপি-গজা গ্রামীণ রসময়তার প্রতীক হয়ে ওঠে।
লোকসংস্কৃতি গবেষক আকাশ বিশ্বাসের মতে, “মেলা চত্বরের পাশেই কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদ ছিল। বর্তমানে সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রাসাদের চারিদিকে বেষ্ঠীত করে রাখা পরিখা আজও বর্তমান। গাজী সাহেবের স্মৃতির রক্ষার্থে প্রতিবছর বসন্ত পঞ্চমীর পরের দিন এই মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। মাটির ঘোড়ার পাশাপাশি জ্যান্ত ঘোড়া দেওয়ারও রীতি রয়েছে। ঘোড়ার সঙ্গে বাতাসা- মুড়কিও মাজারে উৎসর্গ করা হয়। আত্মীয় পরিজনের সুস্বাস্থ্য ও আরোগ্য লাভের কামনা সহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন টানাপোড়েনের মধ্যে ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষায় মানুষ এখানে পুজো দিয়ে যায়। চাকদহ স্টেশন থেকে শ্রীরামপুরগামী ট্রেকারে করে বেলতলা স্টপেজে নেমে পায়ে হেঁটে মেলায় আসতে হয়। মেলা চত্বরে পীরের পুকুর নামে একটি জলাশয় ছিল। বর্তমানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। শ্রীনগর-কাদাঘাটের গাজী সাহেবের মেলার পাশাপাশি নদিয়ার অন্যত্র যেমন হুদার মেলা, মাঝেরগ্রামের রোজিম ফকিরের মেলার জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেখানেও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।”
শ্রীনগর-কাদাঘাটের গাজী সাহেবের মেলার পাশাপাশি নদিয়ার অন্যত্র যেমন হুদার মেলা, মাঝেরগ্রামের রোজিম ফকিরের মেলার জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেখানেও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রান্তিক শ্রেণীর লোকজ আধ্যাত্বিক চেতনায় ঐক্য সংগঠিত হয়েছে। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক চেতনার প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে গাজী সাহেবের মাজার হয়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক। আজকের বিভেদের পৃথিবীতে এই ঐক্যই ভালোবাসার ঔষধি হয়ে জোড়া রঙিন ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে চলেছে।
_______________
ছবি: লেখক
