
মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। শীতের রোদ, ঝরে পড়া শুকনো শালপাতা আর প্রকান্ড নিঃস্তব্ধতাকে সঙ্গী করেছে গোবর-মাটি নিকানো বেড়াহীন সভ্য একটি উঠোন, দেয়ালে আঁকা একটি গাছ। উপর থেকে নিচে লম্বা নীল রেখাটি গাছটির কাণ্ড। শাখাহীন কাণ্ডের দু’পাশে পাতা, শীর্ষে কুঁড়ি। দেওয়ালচিত্রে সারল্যের ম্যাজিক। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ইলামবাজার থানার, চৌপাহাড়ি জঙ্গল লাগোয়া সাঁওতাল গ্রাম রাঙাবাঁধ।

সাঁওতাল দেওয়ালচিত্রের পরম্পরা আক্ষরিক অর্থেই মাটির। মানুষ ও মাটির প্রত্যক্ষ সংযোগে তৈরি একটি আদিম শিল্পধারা। বাড়ি তৈরি থেকে দেওয়াল চিত্রের রূপায়ণ পর্যন্ত একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রকৃতিবান্ধব প্রাচীন প্রযুক্তির জয়যাত্রা।
বর্ষার ঠিক পরেই ‘দাঁসাই’ উৎসব। শরৎকাল, মাটির বাড়ির যত্ন নেওয়ার সময়। ক্ষতিগ্রস্থ বাড়িটি সারাই এবং অলঙ্করণের জন্য সংগ্রহ করা হয় নির্দিষ্ট স্থানীয় মাটি। দেওয়াল লেপা, চিত্র, নক্সা, এবং ম্যুরালের সৃষ্টি, সমস্তই লালিত হয় মূলত সাঁওতাল রমণীদের হাতে। বাড়ির দেওয়াল অথবা পাঁচিল অলংকরণের জন্য ব্যবহৃত হয় নানা রঙের স্থানীয় মাটি, গোবর, খড় ও পাতা-পোড়া ছাই ইত্যাদি। লাল রঙের জন্য মাটির গভীর স্তর থেকে সংগ্রহ করা হয় রাঙামাটি বা লালমাটি। দীর্ঘদিন ধরে নীল রঙের জন্য ব্যবহৃত হয় গুটি-নীল। বসবাসের জন্য তৈরি মাটির বাড়ি ও পাঁচিলের দেওয়ালগুলিই সাঁওতাল জনজাতির চিত্র ও ম্যুরাল পরম্পরার নিজস্ব ক্যানভাস।

স্থানীয় মাটি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেওয়াল মেরামত করা হয়। এরপর গোটা দেওয়ালটি পছন্দমতো অন্য রঙের মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হয়। মাটি, দেওয়াল আর মানবীর এই আদিম সম্পর্ক এক অপূর্ব টেক্সচারের জন্ম দেয়। অপেক্ষাকৃত হালকা রঙের দেয়ালে মাটির গাঢ় রঙের পাড় দেওয়া হয়। সাধারণত রাঙামাটির লাল অথবা খড় ও পাতা পোড়া ছাই দিয়ে গোবর সহযোগে গাঢ় ধূসর রঙের ব্যবহার করা হয় দেওয়ালের পাড়ে। ‘পাড়’, অর্থাৎ দেওয়ালের নিচে বা উপরের সীমান্তে চওড়া, অপেক্ষাকৃত গাঢ় রঙের ক্ষেত্র। কখনও বা দেওয়ালটিকে উপর—নিচে দুটি রঙে ভাগ করে নেওয়া হয়।

দেওয়ালের উপর এবং নিচের দিকে গাঢ় রঙের চওড়া এক বা একাধিক রেখা টানা হয়, রেখার উপর আঁকা হয় ফুল পাতা বিভিন্ন প্রাণীর মোটিফ, কখনও বা শুদ্ধ জ্যামিতিক নকশা। বাড়ির দরজা, জানলা অথবা গোয়াল ঘরে গবাদিপশুর খাওয়ার জন্য মাটির পাত্রের (পাতনা বা বান) উন্মুক্ত অবস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত দেয়াল ঘিরে তৈরি হয় রিলিফ ম্যুরাল এবং রঙিন চিত্র। আঁকা হয় গাছ, ফুল, পাখি (বিশেষত ময়ূর) এবং স্থানীয় প্রাণী যেমন কুকুর, হাতি ইত্যাদি। সাধারণত দেওয়ালের প্রান্তে সামান্য নকশা এঁকে ছেড়ে রাখা হয় বিরাট মুক্ত পরিসর। দেয়াল চিত্রের পরম্পরায় এই মুক্ত পরিসর বা শূন্যতার ব্যবহার কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, জনজাতিটির সংস্কৃতির এইটিই মূল বৈশিষ্ট্য।
সাঁওতাল সম্প্রদায়, যাঁদের গ্রামগুলি মূলত জঙ্গলের অভ্যন্তরে অথবা মালভূমির পাহাড়ের কোলে অবস্থিত, একবিংশ শতাব্দীতে প্রকৃতির অনুকূলে টিকে থাকা একটি আদিম সভ্যতা। উৎসবের প্রধান ধর্মীয় স্থানটি হলো ‘জাহের থান’, গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত। উৎসবের প্রধান আচারগুলি অনুষ্ঠিত হয় ‘জাহের থান’-এ, যা প্রধানত শাল, মহুয়া, নিম ইত্যাদি বৃক্ষের নিচে মুক্ত ভূমি মাত্র। ধান কাটার পরবর্তী সময়ে (পৌষ-মাঘ মাস) অনুষ্ঠিত হয় সাঁওতাল জনজাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘সোহরাই’। ধান কাটার পর মুক্ত ধানক্ষেতে অনুষ্ঠিত হয় ‘সোহরাই’-এর নির্দিষ্ট আচার, উন্মুক্ত আকাশের নীচে ধানক্ষেতের নিঃস্ব ভূমিতে রচনা করা হয় উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্রটি, যার নাম ‘খদ’।

ঘরগুলির পরিচ্ছন্ন আতিশয্যহীন বিরাট শূন্য উঠোন, উঠোনে নগ্ন পায়ে ময়ূরের পালক হাতে বালকের ‘দাঁসাই’ নৃত্যের প্রশিক্ষণ। জনজাতিটির একমাত্র পুতুল নাচের ধারা ‘চাদর বাদনি’ অতি সরল-প্রযুক্তির, নববধূর সাজ বলতে হলুদ বেঁটে রং করা সুতির শাড়ি, পাতা এবং মাটির বাসনের ব্যবহার, আসবাবহীন গৃহসজ্জা, ফুল-পাতার অলংকার ইত্যাদি জনজাতিটির অনাড়ম্বর যাপনকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। প্রকৃতির কোলে টিকে থাকা এমন একটি সভ্যতা, স্বল্পতাই যার সৌন্দর্যের ভিত্তি।
এই বাহুল্যহীন জীবনের ছাপ সাঁওতাল দেওয়ালচিত্রের পরম্পরায় সুস্পষ্ট। নমনীয় রেখার ব্যবহারে তৈরি দেওয়ালচিত্রে কখনও কোনও আখ্যান বা গল্প বলার চেষ্টা করা হয় না। মূলত নকশা বা আলপনামূলক ছবিই সাঁওতাল দেয়ালে প্রতিষ্ঠা পায়। প্রাণী, ফুল, পাতা -সবই শান্ত এবং স্থির। ময়ূরের পেখম আঁকা হলেও, নাচের অ্যাকশনকে ধরার কোনও চেষ্টা থাকে না। গাছ, ফুল, প্রাণীর ছবিতে সাঁওতাল মেয়েরা যুগ যুগ ধরে আপন খেয়ালে লাবণ্য যোগের প্রতি মনোনিবেশ করেছে। আমরা যা দেখছি আর যা দেখছি না, তার সীমা অতিক্রম করে সাঁওতাল দেওয়ালচিত্র আপন অস্তিত্বকে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রেখেছে।
নবীন সাঁওতাল প্রজন্ম মাটির বাড়ি তৈরি ও ছাউনির প্রযুক্তিকে অবহেলা করেছে, এছাড়া বাড়ি তৈরির সরকারি অনুদানে শুধুমাত্র কংক্রিটের বাড়ি তৈরির বাধ্যতামূলক নির্দেশ, ভারতীয় আদি উপজাতিটির শিল্প যাপনে সংকট নিয়ে এসেছে।
সাঁওতাল দেওয়ালচিত্রের পরম্পরা আক্ষরিক অর্থেই মাটির। মানুষ ও মাটির প্রত্যক্ষ সংযোগে তৈরি একটি আদিম শিল্পধারা। বাড়ি তৈরি থেকে দেওয়াল চিত্রের রূপায়ণ পর্যন্ত একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রকৃতিবান্ধব প্রাচীন প্রযুক্তির জয়যাত্রা। এই জৈব শিল্পধারা অন্য সমস্ত প্রাচীন শিল্পধারাগুলির মতোই নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, লুপ্ত হতে চলেছে এই শিল্পধারাটির ভিত্তি মাটির বাড়িগুলি।

নবীন সাঁওতাল প্রজন্ম মাটির বাড়ি তৈরি ও ছাউনির প্রযুক্তিকে অবহেলা করেছে, এছাড়া বাড়ি তৈরির সরকারি অনুদানে শুধুমাত্র কংক্রিটের বাড়ি তৈরির বাধ্যতামূলক নির্দেশ, ভারতীয় আদি উপজাতিটির শিল্প যাপনে সংকট নিয়ে এসেছে। বিশ্ব-উষ্ণায়নের যুগে মাটির এই আদিম সংস্কৃতি, শিল্পধারা কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? দেওয়াল থেকে আচমকা কাদামাখা হাত সরিয়ে, মাইনো বাস্কি বললেন, “আলেদ মিটেন হাসা অড়াঃ দহতেগে হুয়ুঃ তালেয়া” (আমাদের একটা মাটির বাড়ি রাখতেই হবে)। পরবের সময় সন্তানদের কুশল কামনা করে পূর্বপুরুষদের কাছে প্রার্থনা করার জন্য সাঁওতাল পরম্পরায় প্রয়োজন মাটির বাড়ির মেঝে ও মাটির ভীত।
________________
আলোকচিত্র: লেখক (২০১১-২০১৪ পশ্চিমবঙ্গ, বীরভূমের সাঁওতাল গ্রাম থেকে)

