
কলকাতায় দীর্ঘদিন পরে এরকম শীত পড়েছে। সেই শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নর্থ, সাউথ ও ওয়েস্ট গ্যালারি লোকে লোকারণ্য ছিল পয়লা জানুয়ারি থেকে সাতদিন। বেঙ্গল স্কুল অ্যান্ড দ্য মাস্টার নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার — এই শিরোনামের প্রদর্শনীকে ঘিরে কৌতূহল, উন্মাদনা ও বিস্ময়ের শেষ ছিল না। কারণ, বেঙ্গল আর্ট স্কুলের অন্যতম শেষ জীবিত কিংবদন্তি হলেন তিনিই।

বেঙ্গল স্কুল অ্যান্ড দ্য মাস্টার নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার
ভাবলে অবাক হতে হয় নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার এমন একজন শিল্প অনুশীলনকারী, যিনি প্রায় আশি বছর ধরে এক নাগাড়ে ছবি এঁকে চলেছেন, বয়স মোটে চুরানব্বই। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর শিখিয়েছেন শিল্পের কাছে সমর্পিত হওয়া ছাড়া পথ নেই।
শিল্পীর ছাত্রজীবন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নির্বাচিত ছবির একটি প্রদর্শনী, যার কিউরেটর ছিলেন আর্ট কলেজের আরেক প্রাক্তনী অভিজিৎ সাহা। ভাবলে অবাক হতে হয় নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার এমন একজন শিল্প অনুশীলনকারী, যিনি প্রায় আশি বছর ধরে এক নাগাড়ে ছবি এঁকে চলেছেন, বয়স মোটে চুরানব্বই। ১৯৫২ সালে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৭ সালে পাশ করেন ভারতীয় শৈলী (Indian style painting ) বিভাগ থেকে। ১৯৫৯ সালে টিচার্সশিপ পাশ করে, ভারতীয় শিল্প শৈলী বিভাগে শিক্ষকতায় যোগ দেন। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর শিখিয়েছেন শিল্পের কাছে সমর্পিত হওয়া ছাড়া পথ নেই।
বেঙ্গল স্কুল বলতে সাধারণত একটা নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট শৈলীর ছবির কথা বলা হয়। নরেনবাবুর ছবি সময়ের হিসেব ও ঘরানার কৌলিন্য থেকে উত্তীর্ন হয়ে পৌঁছেছে বাস্তব মানুষের কাছাকাছি। বেঙ্গল স্কুলের আর পাঁচজন শিল্পীর সঙ্গে নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকারের তফাৎ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নরেনবাবু এই ঘরানার শেষদিকের শিল্পী। কাজেই সময়ের দিক থেকে তিনি এগিয়ে এসে স্বাধীনতা পরবর্তী থেকে বর্তমান, অনেকটা সময় দেখেছেন। ফলত ওঁর কাজের বিষয়ও অনেক সমসাময়িক হয়েছে। শুধু বিষয় চয়নেই উনি আর সকলকে ছাপিয়ে কালোত্তীর্ণ হয়েছেন। বলা ভালো সমসাময়িক হয়ে গিয়েছেন। একটা দীর্ঘ সময়কে নিরীক্ষণ করে প্রয়োজনে নিজেকে বদলেছেন, কিন্তু ওঁর প্রশিক্ষণের মাধ্যমগত ঘরানা থেকে সরে আসেননি। অসংখ্য টেম্পারার কাজ রয়েছে যার জুড়ি মেলা ভার। আর্ট কলেজের সে সময়ের প্রায় সকলেরই লাইন ড্রয়িং ছিল বলিষ্ঠ, নির্ভুল ও সম্পূর্ণ। নরেনবাবুর ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। গ্যালারিতে যত লাইন ড্রয়িং ছিল সেগুলি রংহীন। কিন্তু দেখলে একটুও রসভঙ্গ হয় না। বেরঙিন ছবিও যে শুধু রেখায় পেইন্টিংয়ের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে তা আমাদের শেখা উচিত।
নরেনবাবুর ছবি সময়ের দাবিতে মাইথোলজি পেরিয়ে সাধারণ মানুষ-প্রধান হয়েছে। ফলে অন্দরমহলের গৃহিনী থেকে মিছিলের মানুষ সবার সবাক উপস্থিতি ওঁর ছবিতে। অর্থাৎ দর্শকের সঙ্গে সরাসরি চরিত্রগুলি কমিউনিকেট করতে সক্ষম। উনি নিজেই বারবার বলেছেন শিল্প হবে সহজবোধ্য, যাতে তার ভাব স্বাভাবিকভাবেই দর্শকমনকে স্পর্শ করতে পারে।
একাডেমির তিনটে ঘর জুড়ে অসংখ্য ছবি, প্রতিটি তার নিজের মতো করে আবেদনপূর্ণ। ওঁর বিশেষ কয়েকটি ছবি আমায় ভাবিয়েছে, বিস্মিত করেছে। সেগুলি পরপর সাজালে নরেবাবুর বডি অফ ওয়ার্ক সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।
নরেনবাবুর ছবি সময়ের দাবিতে মাইথোলজি পেরিয়ে সাধারণ মানুষ-প্রধান হয়েছে। ফলে অন্দরমহলের গৃহিনী থেকে মিছিলের মানুষ সবার সবাক উপস্থিতি ওঁর ছবিতে। অর্থাৎ দর্শকের সঙ্গে সরাসরি চরিত্রগুলি কমিউনিকেট করতে সক্ষম।


বলাকা-নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার
প্রথমেই বর্ষার বিকেলের ‘বলাকা’ নামের ছবিটি। আকাশে ঘন কালো মেঘের মধ্যে সারিবদ্ধ বলাকা উড়ে যাচ্ছে। এক তরুণী তার ঘরের চৌকাঠ না পেরিয়েই উঁকি দিয়ে তা দেখছে। ছবিটি একেবারেই রাগমালা ধাঁচে আঁকা। তবে রাগমালার কাব্যময় রোম্যান্টিকতা অতিক্রম করে নারী স্বাধীনতার আশ রেখে গিয়েছে। এ ছবি দেখলে আর্ট কলেজের ওল্ড মাস্টার কপি করা দক্ষ হাত বলে দিতে হয় না।

মহিষাসুরমর্দিনী-নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার
আরেকটি ছবি যা সর্বাধিক প্রশংসা পেয়েছে, সেটি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। অদ্ভুত আলো দেবীর মুখে। এ ছবি যে নন্দলাল-ঘরের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ মিনিয়েচার থেকে স্টাইল সরে আসছে। আবার মহাভারতের বিশেষ মুহূর্ত যেখানে অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধরীতির কৌশল বাতলে দিচ্ছেন। এখানে ছবির মানুষ আরও স্বাভাবিক।

স্নানের পরে ভেজা কাপড় মেলছেন রমণী-নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার
আরেকটি ছবির কথা বলা যাক, যেখানে স্নানের পরে ভেজা কাপড় মেলছেন রমণী। হাওয়ায় তার পরনের কাপড় উড়ে যাচ্ছে। আর যে কাপড়টি মেলছেন সেটিও গতিময়। এত রিদিমিক ছবি আর একটাও ছিল না গ্যালারিতে। একটি ছবির কথা বলতেই হয় যেখানে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পড়ন্ত সূর্যের আলোয় মৃত অভিমন্যুকে বুকে নিয়ে বসে রয়েছেন মা সুভদ্রা। যিনি শ্রীকৃষ্ণের বোন ও অর্জুনের স্ত্রী। এ ছবির যেকোনো দর্শকমনকে বিষণ্ণ, শরীরকে অসার করে দেবে। অবনীন্দ্রনাথের ১৯১৩ সালে ‘জার্নি’স এন্ড’ নামের উটের ছবিটির কথা মনে পড়ে।

বর বরণ-নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকার
শেষে যে ছবিটির কথা বলবো সেটি আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরের ছবিতে রয়েছে আস্ত একটা কাহিনি। এ ছবিই বরং সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। ‘বর বরণ’ এ ছবির নাম। ছবির দৃশ্যকল্প আর পাঁচটা বাঙালি বিয়ের মতোই আলোকময়। সে আলো সবার মুখেই রয়েছে কেবল বরের মুখ আশ্চর্য রকমের থমথমে, চোখ করুন, হয়তো বিষণ্ণও। অবচেতনে ছবিতে ভাবের স্তরের উপর আমার নতুন ভাবের জন্ম হ। খুঁজলে একশোরকম অর্থ মেলে। আজকের ক্যুইয়ার ছবির আভাস কি এই ছবির প্রধান চরিত্রে নেই? এ প্রশ্ন জাগে। নরেনবাবুর সময়ে এ বিষয়ে কথা না হলেও আজকে খুঁজে দেখাই যায়। ওঁর ছবির নারী চরিত্রের পাশাপাশি পুরুষ চরিত্রও নরম, ফেমিনাইন। যা সংবেশনশীল চোখে ধরা পড়বেই। ছবির ভাষার সার্থকতা সেখানেই। নরেনবাবু কন্টেম্পোরারি এই ছবিটির জন্য।
নরেন্দ্র চন্দ্র দে সরকারের মতন শিল্পীকে দেখে শিখলাম সময় গড়ালেও হাঁপিয়ে উঠব না। এ প্রদর্শনীর রেশ আমাদের জাগিয়ে রাখবে দীর্ঘকাল। অবলীলায় কাজ করবেন উনি আরও একশো বছর আজকের লাইমলাইট থেকে দূরে থেকে। অথচ নিজের মধ্যে যে আলো উনি জ্বেলে রেখেছেন তার প্রতি শ্রদ্ধায় নত হতেই হয়।
