
সমকাম। সমলিঙ্গপ্রেম। প্রান্তিক যৌনতা। শব্দগুলো ওদের কাছে ভিনদেশী। ওরা একটাই শব্দ চেনে। ভালোবাসা। একটা অনুভূতি ওদের জড়িয়ে থাকে। যে কোনো মুহূর্তে পাশে থাকা। এমনকী কাছাকাছি না থেকেও, সঙ্গে না থেকেও, একে অপরের পাশে থাকা। “মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, এই অনুভব কী ছোটোবেলা থেকেই?” এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকক্ষণ চুপ করেছিলেন রাখী নস্কর। মনে হল গভীর অন্দরমহল থেকে স্মৃতির মত ঝিনুক খুঁজে নিয়ে আসছেন। অথবা এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, তা কল্পনাই করেননি। “বিয়ে করে কারোর সঙ্গে থাকব, সংসার করব, এই ভাবনাটাই তো ছিল না। শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। টাকা রোজগার করে নিজের মত থাকতে চাইতাম। কিন্তু ‘ওর’ ভেতর প্রথমবার ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি।” (রাখী ও রিয়ার সমপ্রেম বিয়ে)

আশ্রয় নিয়ে যথেষ্ট দুর্গতি পোহাতে হয়েছে দু’জনকে। তাই রাখীর কথায় বারবার নিজেদের বাড়ি তৈরির কথা উঠে আসছিল। যে বাড়ি ওদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে। যে বাড়ি আসলে এক ‘নন জজমেন্টাল’ পৃথিবীর প্রতীক।
যার সম্বন্ধে বলছিলেন সেই রিয়া সর্দার তখন রাখীর থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে নাচের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত। তাই বোধহয় ভালোবাসা শব্দটায় কিছুটা বেশি জোর দিলেন রাখী। ওই শব্দটাই ওদের সম্পর্কের শক্তিশালী সেতু। রাখী নস্কর এবং রিয়া সর্দার। রাখীর বাড়ি জয়নগরের ঝালুয়াবেড়। রিয়া থাকেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষীকান্তপুরে। ওরা নৃত্যশিল্পী। বাইরে অনুষ্ঠান করতে যান নিয়মিত। বিহারে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রথম দেখা। তারপর ভালোলাগা। অনুভূতির সুতো গাঁথার প্রথম প্রস্তাব আসে রিয়ার দিক থেকে। তবে রাখী তাতে চমকে যাননি। এমন কিছু অন্যরকমও লাগেনি। একজন মানুষ তাকে ভালোবাসে। সে কথাই বলেছে। বিয়ে করতে চায়। একসঙ্গে থাকার কথা প্রথম রিয়াই বলেন। স্বনির্ভরতা ছাড়া অন্য কোন স্বপ্ন ছিল না রাখীর। তাই সিদ্ধান্ত নিতে অনেকটা সময় নিয়েছিলেন। প্রায় আট মাস। তারপর একটি মন্দিরে বিয়ে করেন। রূপকথার মত শুনতে লাগলেও কোথাও এতটুকু বিস্ময় ছিল না ওদের কথাবার্তায়। “আমরা আলাদা কিছু করেছি” এই বার্তাও ছিল না। যেন সবটুকু একেবারে স্বাভাবিক। তবে, যে ভালোবাসা ওদের ভেতর এমন সেতু গেঁথে দিয়েছে তার পথটা সহজ ছিল না। এই পথের বাঁকে বাঁকে আঁধার এসে জাপটে ধরার চেষ্টা করেছে ওদের। ওরা শুধু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যে পরিস্থিতিতেই পড়তে হোক না কেন, একে অপরের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত। ওরা থেমে যায়নি। (রাখী ও রিয়ার সমপ্রেম বিয়ে)
রিয়া সর্দার তার ভাবনার বিষয়ে খুব স্পষ্ট। সঙ্গী হিসেবে পুরুষকে পছন্দ করতেন রিয়া। ছোটোবেলা থেকেই এই অনুভব ছিল তার। পিতৃমাতৃহীন রিয়া মাসির কাছে বড়ো হয়েছেন। এছাড়াও দাদা-দিদি রয়েছে। তার সত্তা, ভালোবাসা নিয়ে পরিবারের সমর্থন ছিল বরাবর। বিহারের একটি মন্দিরে রাখী ও রিয়া বিয়ে করেন। সে সময় নাচের অনুষ্ঠানের জন্য বিহারেই ছিলেন তাঁরা। বিয়ের পর প্রথম দিকে রাখীর বাড়িতে এসে ওঠেন দু’জনে। রাখীর মা শুরুর দিকে নিমরাজি হলেও ওদের আশ্রয় দেন। মেনে নেন এই সম্পর্ক। কিন্তু রাখীর বাড়ির চারপাশের পরিবেশ ধীরে ধীরে অশান্ত হয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই বেঁকে বসেন রাখীর মা। বাড়ির হাসি-খুশি পরিবেশটা অল্প দিনেই বদলে যায়। রাখীর বাড়ির লোক বলতে শুরু করেন এই বিয়ে তাঁরা মানেন না। ওদের আলাদা হয়ে যেতেই হবে, এমনটা নিদান দেন। অগত্যা আবার বাড়ি ছাড়তে হয় ওদের। রিয়ার বাড়িতে ঠাঁই হয় এই যুগলের। কাজের জন্য মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হয় দু’জনকেই। বাকি সময়টুকু রিয়ার বাড়িতেই থাকেন। আশ্রয় নিয়ে যথেষ্ট দুর্গতি পোহাতে হয়েছে দু’জনকে। তাই রাখীর কথায় বারবার নিজেদের বাড়ি তৈরির কথা উঠে আসছিল। যে বাড়ি ওদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে। যে বাড়ি আসলে এক ‘নন জজমেন্টাল’ পৃথিবীর প্রতীক। (রাখী ও রিয়ার সমপ্রেম বিয়ে)

চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো রাখী নস্কর। কাজ করা এবং স্বনির্ভর হওয়া, এতটুকুই স্বপ্ন ছিল তাঁর। ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে তার স্বপ্নের বাঁক বদল হয়। তবে এই সম্পর্ক তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন আরও মজবুত হয়েছে। ভালোবাসার এই পথ যে সহজ নয় একথা দু’জনেই জানতেন। রিয়ার ভেতর পাশে থাকার ইচ্ছে দেখতে পেয়েছিলেন রাখী। সেই ইচ্ছে-নৌকাই ওদের দু’জনের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে। বিয়ের কথা জানিয়ে রাখী যখন প্রথম বাড়িতে আসেন, তিরস্কার জুটলেও একেবারে প্রত্যাখ্যাত হননি। কিন্তু সমাজের চাপে বদলে যাওয়া পরিস্থিতির রূপ ওদের দু’জনকে প্রথমে ভয় পাইয়ে দেয়। রাখীর বাড়ির আশেপাশের লোকজন ওদের নিয়ে বিচারসভা বসাতে চেয়েছিলেন। ঠিক হয়েছিল এই ‘সাংঘাতিক অপরাধের’ শাস্তি দেওয়া হবে। (রাখী ও রিয়ার সমপ্রেম বিয়ে)
তখন এক সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রাখী। তাঁর সাহায্যে জয়নগরে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন রাখী ও রিয়া। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রামেশ্বরপুর গাববেড়িয়া গ্রামের মানুষজন রাখী ও রিয়ার ভরসার স্থল হয়ে ওঠেন। গ্রামের মানুষজন দাঁড়িয়ে থেকে ওদের বিয়ে দেন। ‘প্রান্তিক যৌন পরিচিতি’, ‘লিঙ্গসমতার’ মত শব্দের ঊর্ধ্বে থাকা মানুষগুলোর কাছে রিয়া ও রাখীর ভালোবাসা স্বীকৃতি পায় প্রথমবার। পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রান্তিক গ্রামে প্রায় বিনা বাধায় ওদের বিয়ে হয়। প্রগতি, এগিয়ে যাওয়া, আধুনিকতার এক অনন্য নজির গড়েন ওরা দু’জন এবং ওদের ঘিরে থাকা মানুষগুলোর স্নেহবলয়। রামেশ্বরপুরের মানুষ ওদের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকেছেন বরাবর। তাই রিয়া নিজের গ্রামে ফেরার সাহস করতে পেরেছেন। রামেশ্বরপুর এখন ওদের কাছে রূপকথাপুর। ওখানকার মানুষরাও স্বীকার করেছেন এই দুই কন্যার ভালোবাসার কথা।
পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রান্তিক গ্রামে প্রায় বিনা বাধায় ওদের বিয়ে হয়। প্রগতি, এগিয়ে যাওয়া, আধুনিকতার এক অনন্য নজির গড়েন ওরা দু’জন এবং ওদের ঘিরে থাকা মানুষগুলোর স্নেহবলয়।

মোবাইল ফোন, সমাজ মাধ্যমের গণ্ডির বাইরে থাকা মানুষগুলো শুধু ভালোবাসার জন্যই ওদের সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছেন। গ্রামের মানুষের এই পাশে থাকা রাখী ও রিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে আরো শক্তিশালী করেছে। ভবিষ্যতের প্রসঙ্গে রাখীর উত্তর তাই আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, “একসঙ্গে থাকতে চাই, নিজেদের বাড়ি-ঘর করে সেখানে ভালো থাকতে চাই।” প্রান্তিক যৌন পরিচিতি, রামধনু পতাকার কথা ওরা জানে না। কিন্তু ওদের ভালোবাসা আর গ্রামের মানুষের এই পাশে থাকা রামধনুর মতই আলো। দিনের শেষে ভালো থাকা। জীবন থেকে এটুকুই আশা করেছেন। “আপনারা কি কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, বা আগামীতে এই ধরনের সম্পর্কে থাকা অন্য মানুষদের নতুন পথ দেখাচ্ছেন?” এমন প্রশ্নের প্রথমবার অবাক হন রাখী। দৃষ্টান্ত স্থাপন শব্দটার সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নন। “আমরা দু’জনে একসঙ্গে খুব সুখে আছি। এভাবেই থাকতে চাই।” এই দুটো বাক্যই ওদের কথায় বারবার ঘুরে ফিরে আসে। রাখীর বয়স কুড়ি। রিয়াও সমবয়সী। জেন-জির সঙ্গে জুড়ে থাকা কিছু অবশ্যম্ভাবী শব্দ যেমন ‘ঘোস্টিং’, ‘ব্রেড কাম্বিং’, ‘বেঞ্চিং’ ওদের কাছে অপরিচিত। এইসব প্রশ্ন করা হলে রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন দু’জনেই। সম্পর্কের আঁধার গলিপথে ভালোবাসাই কেবল আলো ছড়াতে পারে, এটুকুই ওদের বিশ্বাস।
লিঙ্গ পরিচয় এবং প্রান্তিক যৌন পরিচিতি বিষয়ে আন্দোলনকারী সমাজকর্মীরাও রাখী ও রিয়ার এই ভালোবাসাকে আলোর দিশা হিসেবেই দেখছেন। কঠিন নুড়ি, পাথর ভরা এই পৃথিবীতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরের ছোটো গ্রামটা বিস্ময়হীন এবং ‘নন জাজমেন্টাল’ এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। এই স্বপ্নের অবয়বে দুটো সুন্দর এবং মজবুত ডানা জুড়ে দেয় দুটো নাম। রাখী নস্কর ও রিয়া সর্দার।
_____________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত
