
কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়বে কত মণিমুক্তো! বিস্মৃত ইতিহাস। আজও সেই সমস্ত সাক্ষ্য বহণ করে চলেছে রাজধানী শহরটা। অনেকেই বলেন কলকাতা চিনতে হলে সবার প্রথমে নজর দিতে হবে উত্তর কলকাতার গলি ঘুঁজি। কারণ এক অর্থে ‘আসলি কলকাতা’ নাকি ওটাই। তিলোত্তমা ভ্রমণে যাঁরা বেরিয়ে পড়েন, তাঁরা জানেন বিখ্যাত বিধান সরণির কথা। তাঁরা এ-ও জানেন তার পাশেই ছোট্ট একটা রাস্তা, যার নাম বিশ্বকোষ লেন। বইয়ের নামে রাস্তার নামকরণ। বিশ্বে এমন উদ্যোগ প্রথম। কলকাতাই চিনিয়ে দিয়েছিল যদি বিখ্যাত ব্যক্তির নামে রাস্তার নাম হতে পারে, তাহলে তাঁদের সৃষ্টির নামে হবে না কেন! তবে এই ‘বিশ্বকোষ’ বইয়ের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ১৮৮৭ সালে।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার জিনিস। তাদের কতটুকুই বা নাগালে পাই! বাঙালিরা স্বপ্নসন্ধানী। পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসে। এতকিছু ভাবিয়েছিল এক বাঙালিকে। নগেন্দ্রনাথ বসু। বাঙালি হয়ে যদি বাঙালিদের জন্য কিছু করা যায় আরকি। নগেন্দ্রনাথবাবু থাকতেন কলকাতা উত্তরের বাগবাজারে। কাঁটাপুকুর বাই লেন। ছোটো থেকেই নগেন্দ্রনাথের ইতিহাসের প্রতি টান ছিল। ইতিহাসচর্চা য় আরও ধ্যান দেওয়ার জন্য সদস্য হয়ে যান এশিয়াটিক সোসাইটির। সেখানেই সম্পাদনা শুরু করেছিলেন বাংলা থেকে ইংরেজি অভিধান। পাশাপাশি নগেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক।

নগেন্দ্রনাথ বসু
১৮৮৭ সাল। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে তৈরি হয় বাংলা ভাষার প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া— ‘বিশ্বকোষ’। কোনো ভারতীয় ভাষায় প্রথমবার এমন উদ্যোগে স্বপ্নপূরণ হয় নগেন্দ্রনাথবাবুর।
তারপর দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর ধরে ১৭ হাজার পৃষ্ঠার মোট ২২ খণ্ডের বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেন নগেন্দ্রনাথ বসু। যার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯১১ সালে। ১৯৩৩ সালে আরও কিছু শব্দ ভাণ্ডার নিয়ে বিশ্বকোষের কাজ শুরু করেছিলেন নগেন্দ্রনাথবাবু। কিন্তু সেই কাজ আর শেষ করতে পারেননি। সম্পাদনা করতে করতেই মৃত্যু হয় তাঁর। ১৯৩১ সালে ২৪ খণ্ডের একটি হিন্দি সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল বিশ্বকোষের।
নগেন্দ্রনাথ বসুর আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার মাহেশে। সাহিত্যের প্রতি ছিল চরম আকর্ষণ। কবিতা লিখতেন ছদ্মনামে। সম্পাদনা করেছেন ‘তপস্বিনী’ এবং ‘ভারত’ নামে দুটি পত্রিকা। বেশকিছু কাব্যনাট্য ও নাটক রচনার পাশাপাশি অনুবাদ করেন শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ ও ‘ম্যাকবেথ’। পরবর্তীতে সুদীর্ঘকাল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সম্পাদনা করেছেন বহু প্রাচীন গ্রন্থ, যেমন— জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, চণ্ডীদাসের অপ্রকাশিত রচনাবলী, পীতাম্বর দাসের রসমঞ্জরী, জয়নারায়ণের কাশী পরিক্রমা ইত্যাদি।

বাগবাজারের নগেন্দ্রনাথ বসু পৈতৃক বাড়ি
তাঁর মারা যাবার কয়েক বছর পর কলকাতা পুরসভা তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তার নতুন নামকরণ করে — ‘বিশ্বকোষ লেন’। সারা বিশ্বের মানচিত্রে প্রথম কোনো রাস্তার নাম হল বইয়ের নামে। সারা বিশ্ব যা কখনও ভাবেনি, তা করে দেখিয়েছিল কলকাতা। এই লেনে আজও দেখা যাবে নগেন্দ্রনাথ বসুর জীর্ণ বাড়িটি। বাড়ির সামনে একটি স্মৃতিফলক। তাতে লেখা, “বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে ‘বিশ্বকোষ’ (২২ খণ্ড) এবং ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থের সংকলক — এছাড়া বহু গ্রন্থের সম্পাদনাকর্ম ও নাটকের রচনাকার, বহু মূল্যবান প্রাচীন তত্ত্বের আবিস্কারক এই বাড়ীতে আমৃত্যু বসবাস করেছেন। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর পদধূলিধন্য এই গৃহে তাঁর স্মরণে পৌত্র শম্ভুনাথ বসুর উদ্যোগে এই ফলক স্থাপিত হল।” — জুলাই ২০০২, সুতানুটি পরিষদ, বাগবাজার অঞ্চল। (বানান অপরিবর্তিত রাখা হল)

তাঁর বাড়ির সামনে অক্ষত স্মৃতিফলক
পরবর্তীকালে এমন দ্বিতীয় একটি উদ্যোগের কথা জানা যায় ইংল্যান্ডে। ২০১৩ সালে, নেইল গেইম্যানের লেখা বইয়ের নামানুসারে ইংল্যান্ডের সাউথসির একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় ‘দ্য ওশান অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য লেন’।
বিশ্বের ইতিহাসে বিরলতম এই ঘটনায় আজও গর্বিত কলকাতাবাসী। এক বাঙালির স্বপ্নপূরণ থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙালিদের নতুন নতুন শব্দ চেনানোর এই প্রয়াসে আজও অবাক হতে হয়। এখনকার নতুন প্রজন্মও এই বিশ্বকোষের কাছে ঋণী। বিশ্বকোষ লেনের ওই সরু রাস্তাটাই বলে দেয় সেই ঋণের জলজ্যান্ত ইতিহাস।
