
আশ্বিনের শুক্ল নবমীর রাতের আঁধার যখন গাঢ় হয়, সেই নিকষ নিশিতে বাঁকুড়ার জামকুড়ির রাজ পরিবারে পূজিতা হন মহামারির দেবী। কোনও মূর্তিতে নয়, নিভৃতে, লোকচক্ষুর আড়ালে দেবী পুRemove featured imageজো পান পটে। জামকুড়ি গ্রামের রাজরাজেশ্বরী মন্দিরে রয়েছে ‘মহামারি পট’। প্রচলিত বিশ্বাসে এই পটের দর্শন বয়ে আনে অমঙ্গল। পট আঁকাও নিষিদ্ধ। দেখাও ক্ষতিকারক। জনশ্রুতি আছে, যিনি পট এঁকেছিলেন, তিনি আঁকার কয়েকদিনের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন। মল্লভূমিতে তখন কলেরার দাপট। কাতারে কাতারে মানুষ মারা যাচ্ছে, স্বপ্নাদেশ পেলেন রাজা। দেবীর বিশেষ রূপ এঁকে পটপুজো করলে মিলবে কলেরা থেকে মুক্তি। ফিরে এসে শিল্পীকে দিয়ে রাজা তৈরি করালেন সেই দেবীর পট। বনবীরসিংহ গ্রামের কর্মকার পরিবারের তুলির টানে রূপ পেলেন মহামারির দেবী। দুর্গাপুজোর নবমীর গভীর রাতে জামকুড়ি রাজ পরিবারে পুজো পেতে লাগলেন মহামারির দেবী। ভয়ঙ্কর রূপী দেবীর সঙ্গে জড়িয়ে গেল মিথ, মৃত্যুর কাহিনি।

কৃপাময়ীর আঁকা মহামারি পট
জামকুড়ির রাজ পরিবারের অনুরোধে মৃত্যুভয় জয় করে, অমঙ্গলের আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে ‘মহামারি পট’ আঁকলেন কৃপাময়ী কর্মকার। তিনি কর্মকার পরিবারের পুত্রবধূ। বাঁকুড়ার বনবীরসিংহ গ্রামে থাকেন কৃপাময়ী। কৃপাময়ীর হাত ধরে কর্মকার পরিবারে পটচিত্র শিল্পের ধারা আজও অক্ষত।
কালের নিয়মে ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হতে থাকল ‘মহামারি পট’। রাজ পটচিত্রশিল্পী কর্মকার পরিবারের কাছে বারবার অনুরোধ গেল পট এঁকে দেওয়ার। কিন্তু ক্ষতির আশঙ্কায় কেউ এগিয়ে এলেন না পট পুনর্নির্মাণে। ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে চলে যেতে বসল ‘মহামারি পট’। অবশেষে ২০১১ সালে সেই পটের পুনর্নির্মাণ হল। জামকুড়ির রাজ পরিবারের অনুরোধে মৃত্যুভয় জয় করে, অমঙ্গলের আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে ‘মহামারি পট’ আঁকলেন কৃপাময়ী কর্মকার (Kripamoyee Karmakar)। তিনি কর্মকার পরিবারের পুত্রবধূ। বাঁকুড়ার বনবীরসিংহ গ্রামে থাকেন কৃপাময়ী। কৃপাময়ীর হাত ধরে কর্মকার পরিবারে পটচিত্র শিল্পের ধারা আজও অক্ষত। কৃপাময়ীর বিয়ে হয় ১৯৯২ সালে। শ্বশুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে তিনি জড়িয়ে পড়েন পট আঁকার সঙ্গে। তবে তাঁর নিজের কথায়, তিনি পট আঁকেন না। পট লেখেন। শ্বশুরমশাই, নিতাই কর্মকারের কাছে কৃপাময়ীর হাতেখড়ি। ২০০২ সালে নিতাই কর্মকারের মৃত্যু হয়। তারপর থেকে (২০০৩ সাল) কৃপাময়ীই কর্মকার পরিবারের ঐতিহ্যকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

কৃপাময়ীর আঁকা দুর্গা পট
বনবীরসিংহ গ্রামের কর্মকার পরিবার বংশপরম্পরায় রাজরাজেশ্বরী মন্দিরের দুর্গাপট এঁকে চলেছে। আজও কৃপাময়ীর আঁকা পটে জামকুড়ির রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো হয়। ফি বছর জমকুড়ির রাজ পরিবারের জন্য তিনটি পট আঁকেন তিনি, বড়ো ঠাকুরানি, মেজো ঠাকুরানি এবং ছোটো ঠাকুররানি। মহামারি পট একবারই আঁকা হয়েছে। যতদিন না সেটি নষ্ট হচ্ছে, ওই পটে পুজো চলবে। বনবীরসিংহ গ্রামের চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপট আঁকেন কৃপাময়ী। সেটিও বংশপরম্পরায় কর্মকার পরিবার আঁকছে। এছাড়াও মাজডিহা গ্রামের মহাপাত্র পরিবারের চারশো বছরের পুরোনো দুর্গার পটচিত্র নতুন করে এঁকেছেন তিনি। তাতে এখন পুজো হয়। উল্লেখ্য, প্রাচীন পটটি মল্লরাজা দান করেছিলেন মহাপাত্র পরিবারকে, যা ১০৮৮ বঙ্গাব্দ থেকে পূজিত হচ্ছে। প্রাচীন পটটিও এঁকেছিল কর্মকার পরিবার।

পট আঁকেন কৃপাময়ী
কৃপাময়ী পট আঁকেন না। পট লেখেন। শ্বশুরমশাই, নিতাই কর্মকারের কাছে কৃপাময়ীর হাতেখড়ি। ২০০২ সালে নিতাই কর্মকারের মৃত্যু হয়। তারপর থেকে (২০০৩ সাল) কৃপাময়ীই কর্মকার পরিবারের ঐতিহ্যকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বঙ্গদর্শন.কম-কে ‘মহামারি পট’ আঁকার অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন কৃপাময়ী। বললেন, “মহামারি পট কাউকে দেখানো যায় না, পুজোর সময় থাকা যায় না। পট তৈরি করতেও সবাই ভয় পায়। আমরা রাজবাড়ির শিল্পী। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ ওই পটটা তৈরি করতে সাহস পাননি। ওঁদের ধারণা, হয়তো ওই পট তৈরি করলে মারা যাবেন। শেষ যিনি পট এঁকেছিলেন, বহু বছর আগে। তার কোনও সাল, তারিখ আমরা পাইনি। আমাদেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন। তিনিও মারা গিয়েছিলেন। সেই পট আমার শ্বশুরমশাই করতে রাজি হননি। আমাকেও নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি দুর্গাপট করছো। আমার মৃত্যুর পর তুমি দুর্গাপট করবে। তখন কিন্তু রাজবাড়ি থেকে অনুরোধ করবে। তুমি কিন্তু মহামারি পট করবে না। পট অত্যন্ত ভয়ানক।’ লাল শালুতে মোড়ানো আছে, আজ পর্যন্ত কেউ খুলে দেখেনি ভিতরে কী আছে। ওই ভাবেই পুজো হয়। শ্বশুরমশাই বলেছিলেন, ‘পট করার জন্য তুমি যদি মারা যাও, তোমার ছেলেরা অনাথ হবে। তুমি করবে না।’ ২০১১ সালে আমার মনে হল, রাজার অনুরোধ ফেলা আমার উচিত হবে না। যেহেতু পট করার দায়ভার আমাদের, তাই আমাকে করতে হবে। আজকে যদি আমি না-করি, পরবর্তীকালে আমার ছেলেকে বলবে। আমার ছেলে যদি অনুরোধ ফেলতে না-পেরে তৈরি করে, যদি মারা যায়! তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি আমার হবে। আমি নিজের উপরেই নিয়ে নিলাম দায়ভার। ২০১১ সালে তৈরি হল পট। আজ সেটা ইতিহাস। আমার কিছু হয়নি। মায়ের অশেষ কৃপায় কিছুই হয়নি।”
কীভাবে আঁকা হল ‘মহামারি পট’? কৃপাময়ী জানালেন, “রাজার সঙ্গে যখন চূড়ান্ত কথা হয়ে গেল আমি পট করব, তখন পট দেখতে হবে। যে পট কেউ খুলে দেখেনি, রাজা, পুরোহিত পর্যন্ত খুলে দেখেননি। না-দেখলে আঁকবো কী করে, মন গড়া এঁকে দেওয়া যায় না। আমার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে স্নান করে, শুদ্ধ, নতুন বস্ত্র পরে গেলাম। আনন্দ হচ্ছে, নতুন কিছু করতে যাচ্ছি। রাজা বলে রেখেছিলেন, কিন্তু পুরোহিতমশাই কিছুতেই বের করতে চান না। তখন মন্দির ছিল মাটির। কারেন্ট ছিল না। পুরোহিতমশাই বের করে দিয়ে মন্দির থেকে চলে গেলেন। বলে গেলেন, ‘তুমি মরো। আমি চলে যাচ্ছি।’ লাল শালুতে মোড়া পট বের করে দেখলাম তার মধ্যে কোনও ছবি নেই। খুলে দেখলাম পুরোনো কাপড়ের টুকরো, কিছুই নেই তার মধ্যে। খোলা হচ্ছে যখন গুঁড়ো গুঁড়ো পড়ছে। কোনও রং নেই। এত বছর মোড়ানো অবস্থায় ছিল। আমি ভেঙে পড়লাম। এতটা এগিয়ে এসে ব্যর্থ হলাম। মায়ের পটে কোনও ছবিই নেই! আঁকবো কী! মা এমন করলেন কেন আমার সঙ্গে, আমায় এতটা সাহস দিলেন…। ভাবছি জীবনটা বৃথা হয়ে গেল। চোখে জল এল। কিছু মুহূর্তের মধ্যে মায়ের অপূর্ব রূপ আমি দেখতে পেলাম। অলৌকিক ঘটনা। সুন্দর ছবি দেখা গেল। ঝাপসা হলেও মায়ের মূর্তি বোঝা যাচ্ছে। ফিতে, স্কেল, পেন্সিল নিয়ে গেছিলাম। মাপ লিখে নিলাম। শাড়ির কী রং, পায়ের দূরত্ব কত, এসব। শুধু মাপটুকু, কিছু এঁকে আনিনি। তারপর তিনদিন এক টানা বসে এঁকেছিলাম। না-খাওয়া, না-দাওয়া। বাড়ির ভিতরে ঘর বন্ধ করে এঁকেছিলাম। ও কাজ যখন কাউকে দেখানোই হয় না, আমি আর বিপদ বাড়াতে চাইনি। কাউকে দেখাইনি। তারপর রাজারা পুরোহিত সঙ্গে নিয়ে এসে নবমীর দিন পট নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই পট-ই এখন পুজো হচ্ছে।”

কৃপাময়ীর আঁকা হরিহর পট
দুর্গাপট, গ্রাম বাংলার আল্পনা, ব্রত পুতুল, বিষ্ণু চব্বিশ অবতার ও শিবের উনিশ অবতার-সহ হরহরি পট, কৃষ্ণলীলা বিষয়ক পট, রামলীলা বিষয়ক পট ইত্যাদি নিয়েই শিল্পী কৃপাময়ীর কাজ, দিনযাপন। পটের গান লেখেন তিনি। তিনি বলছিলেন, “শ্বশুরমশাইয়ের মুখে শুনেছি; দাদুদের আমলে পট নিয়ে সবাই বিজয়ার দিন বেরিয়ে পড়ত। কিছু টাকা উপার্জন হতো। কাহিনি শুনিয়ে মানুষের বিনোদনও হতো। শ্বশুরমশাইয়ের কাছে পটের গানের কথা শুনেছি। আমি সেসব গানের খাতা পাইনি। তারপর নতুন করে এখন গান তৈরি করি, গান লিখি। পুরোনো মানুষদের সঙ্গে কথা বলে, খুঁজে খুঁজে বের করেছি কোন ব্রতর সঙ্গে কোন পুতুল ছিল। ছোটো ছোটো মাটির ব্রত পুতুল তৈরি করি। মানুষের মধ্যে এগুলির চাহিদা আছে। তাছাড়া লৌকিক ছড়া ছিল। আগে মানুষ মুখে মুখে ছড়ায় কথা বলতো, সে বিবাদ হোক বা ভাব-ভালোবাসা বিনিময় হোক। ছড়াগুলি আমি সংগ্রহ করেছি, লিখেছি পত্রিকার জন্য। আলাদা আলাদা পুজো, ব্রতর জন্য, আলাদা আলাদা আল্পনা আছে। পৌষ লক্ষ্মীর পুজোর আলাদা আল্পনা, মাঘ মাসে উঠোনে লক্ষ্মীপুজোর আল্পনা আবার অন্য রকম, ভাদ্রের লক্ষ্মীপুজোর আবার ভিন্ন আল্পনা। আমি সেগুলি সংগ্রহ করেছি।”
২০২৫ সালে এশিয়ান পেইন্টস পিপেল অফ পুজো বিভাগে শারদ সম্মান পেয়েছেন কৃপাময়ী। কৃপাময়ীর হাতেই পশ্চিম পুটিয়ারি পল্লী উন্নয়ন সমিতির পুজো উদ্বোধন হয়েছিল সেই বছর।

কৃপাময়ীর আঁকা দশাবতার পট
২০২৫ সালে এশিয়ান পেইন্টস পিপেল অফ পুজো বিভাগে শারদ সম্মান পেয়েছেন কৃপাময়ী। এহেন সম্মানজনক পুরস্কার প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “এত বড়ো সম্মান পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। আমি কলকাতায় গিয়ে বুঝেছি, মানুষের উৎসাহ পেয়ে বুঝেছি। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভেবেছি, পাচ্ছি… পাচ্ছি! কলকাতা গিয়ে বুঝলাম এর মূল্য কতখানি। এ বছর (দুর্গাপুজো) পশ্চিম পুটিয়ারি পল্লী উন্নয়ন সমিতির প্যান্ডেলে আমার আঁকা পট ছিল। দুর্গা-লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ-শিব সব পট আকারে ছিল।” উল্লেখ্য, কৃপাময়ীর হাতেই পশ্চিম পুটিয়ারি পল্লী উন্নয়ন সমিতির পুজো উদ্বোধন হয়েছিল।
কর্মকার পরিবারের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছেন কৃপাময়ী। তাঁর পর কে? উত্তরে তিনি বলেন, “আমার মেয়ে শিখেছে। ছেলের বিয়ে হয়েছে এ বছর। মেয়ে আমায় সাহায্য করতে করতে শিখে গেছে। আমার জামাই খুব ভালো। মেয়েকে বলতো, ‘মা একা করছে সাহায্য করো।’ সাহায্য করতে করতে ও-ও শিখে গেছে। ছেলেও কিছু সাহায্য করে দেয়। বৌমাও সাহায্য করেছে। পরবর্তীকালে বৌমা পট করবে আশা রাখি। কাজটা আমি ধরে রেখেছিলাম বলেই না, আপনারা সবাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।”

কৃপাময়ী কর্মকার
কর্মকার পরিবারের পূর্বপুরুষ গুণধর কর্মকারকে ‘সমুদ্র’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন মল্লরাজারা। বছরের পর বছর ধরে কর্মকার পরিবার পট এঁকে চলেছে। শিল্পের পীঠস্থান বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যের ধারক, বাহক কর্মকার পরিবার। একদা এই পরিবারের বহু মানুষ পট আঁকতেন। আজ কেবল কৃপাময়ীই পারিবারিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। শ্বশুরমশাই তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি পট করা ছেড়ো না।’ সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন কৃপাময়ী। পটের পাশাপাশি অন্য লোকশিল্পকেও বাঁচিয়ে রাখছেন। ভয়, ভীতি, অমঙ্গলের শঙ্কাকে জয় করে অবলুপ্ত হতে চলা ‘মহামারি পট’ তৈরি করেছেন।
বছরের পর বছর ধরে বাসা বাঁধা মিথ উপড়ে ফেলেছেন। আদতে প্রকৃত শিল্পী যে নির্ভীক হন, মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে পট এঁকে তা প্রমাণ করেছেন তিনি। এমন নির্ভীক শিল্পীকে কুর্নিশ জানায় বঙ্গদর্শন.কম।
__________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত
