সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : ব্যক্তি-চোখ থেকে অভিনেতার চোখের দিকে যাত্রা

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে যখনই ভাবতে বসেছি, তখন বারবার মাথায় এসেছে, অভিনয় করার ক্ষেত্রে তাঁর চোখের ব্যবহার। বর্তমান হিন্দি সিনেমার প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও সিনে-পরিচালক বরুণ গ্রোভার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর বহুদিনের বন্ধু ও সহযোগী অনুরাগ কাশ্যপ, তাঁকে শট-টেকিং নিয়ে কিছু উপদেশ দিতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, যখন তোমার কাছে সময় কম এবং তুমি শট কেমন ভাবে নেবে বুঝে উঠতে পারছ না, তখন সব সময় অভিনেতার চোখকে টার্গেট করো, তোমার ‘সিন’ বেরিয়ে আসবে।

এই চোখের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে সচেতন ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। যদিও অনেকেই বলবেন যে তিনি ছিলেন নির্দেশকের অভিনেতা (Director’s actor)। কিন্তু তাঁর একদম শুরুর ছবি থেকে শেষ ছবি ও নাটকের অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, তিনি নিজের বোধকে ব্যবহার করে তাঁর সমস্ত অভিনীত চরিত্রগুলিকে নির্মাণ করেছিলেন। তাই তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোও আলাদা আলাদা রক্তমাংসের হয়ে উঠেছে। কিন্তু আর পাঁচজন ভারতীয়ের মতো তিনিও স্পষ্ট করে নিজের মেথড নিয়ে খুব বেশি কথা বলেননি, বা সেই মেথড নিয়ে তাঁকে কখনও প্রশ্নও করা হয়নি সেভাবে।

অপুর সংসার (১৯৫৯)

অপুর সংসারের অপু একজন লাজুক মানুষ, মুখে সর্বদা স্মিত হাসি, লম্বা টানা চোখ। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই মুখটাই হয়ে উঠল ঝিন্দের বন্দীর ধূর্ত ময়ূরবাহন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চোখ কথা বলে।

সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই সিনেমাতে প্রথম আত্মপ্রকাশ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ততদিনে তিনি অভিনয়ের তালিম পেয়েছেন নাট্যাচার্য্য শিশির ভাদুড়ির কাছে। শুরুর দিন থেকেই অভিনেতা হিসাবে মাপটা বুঝতেন সবার আগে। অপু তাঁরই মতো একজন যুবক। কিন্তু তিনি আর অপু কি এক? শোনা যায়, সত্যজিৎ রায় প্রথম দিকে খুব বেশি অভিনয় দেখিয়ে দিতেন না, শুধু মাপটুকু বলে দিতেন। সৌমিত্রবাবু সেই মাপ ও চিত্রনাট্যের ওপর নির্ভর করে নির্মাণ করেন অপুকে। অপুর সংসারের প্রথম দৃশ্য থেকেই আমরা দেখি, অপু একজন লাজুক মানুষ, তার মুখে সর্বদা স্মিত হাসি, লম্বা টানা চোখ ও ভ্রু যুগল। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই মুখটাই হয়ে উঠল ঝিন্দের বন্দীর ধূর্ত ময়ূরবাহন। এখানে না চাইলেও উত্তমকুমারের সঙ্গে তুলনা চলে আসে। উত্তমবাবুকে শুরুর দিন থেকে নায়ক ছাড়া অন্য চরিত্রে প্রায় দেখা যায়নি। যে ধরনের সিনেমার হাত ধরে উত্তমবাবু পথ চলা শুরু করেছিলেন সেখানে সাবলীল অভিনয়ের সুযোগ খুব বেশি ছিল না। অন্যদিকে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কেরিয়ারের শুরুর দিন থেকেই অন্যরকমের চরিত্র করে আসছেন। সাধারণত যে অভিনেতা প্রথম সিনেমায় হিরোর চরিত্রে ডেবিউ করছেন, চট করে তাঁরা ভিলেনের চরিত্র করতে চান না। ঠিক যেমন দিলীপকুমার, রাজেশ খান্না বা দেবানন্দকে আমরা কখনও ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখিনি। কিন্তু সৌমিত্রবাবু সেখানেই একজন ব্যতিক্রমী অভিনেতা, যিনি নায়ক হিসেবে পথ চলা শুরু করলেও, খলনায়কের চরিত্র করতে পিছিয়ে যাননি। নেতিবাচক চরিত্রে এমনই ক্রূরতা ও ধূর্ততা ফুটিয়ে তুলছিলেন যে সেইসব কাজ আজ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইল ফলক।

ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১)

অভিনেতাদের ক্ষেত্রে বিবিধ রসের চরিত্রে অভিনয় করার খিদে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যা পরিপূর্ণভাবেই ছিল। শুধু নায়ক হিসেবে নিজেকে আটকে না রেখে, যুব বয়সে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। করুণ রসের হিরো আমরা অনেকরকম দেখেছি বাংলা ও হিন্দি সিনেমায়। কিন্তু কাপুরুষ-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একেবারেই অন্যরকম। “বয় গেটস গার্ল, বয় লুজেস গার্ল”। ভারতীয় সিনেমায় যখনই করুন রসের হিরোকে দেখানো হয়েছে, তখন মূলত দেখানো হয়েছে যে পরিস্থিতির চাপে সে করুণার পাত্র হয়ে ওঠে, এখানে বলা যেতে পারে ‘পেয়াসা’র কথা। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের চরিত্রটি তা নয়। অমিতাভ একজন উচ্চাভিলাসী মানুষ, এবং যে সময় সে একজন মহিলার প্রণয়ী, সেই সময় তার কেরিয়ার শুরু হচ্ছে। তাই বিয়ের চাপ তার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। অমিতাভ সেই প্রেমকে অন্তর্জলী দেন। কিন্তু সেই প্রেম ভূতের মতো তাঁর জীবনে আবার ফিরে এসে সবকিছু গুলিয়ে চলে যাবে এই হিসেবটা করা ছিল না। সত্যজিতের এই সিনেমায় সৌমিত্র এলেন সম্পূর্ণ রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে, কিন্তু তাঁর মনস্তত্ব খুবই জটিল। এই ফিল্মের রোম্যান্স ও মেলানকোলি দুটোই আমরা ফুটে উঠতে দেখি, সৌমিত্রবাবুর চোখে-মুখে। বিরহের কষ্ট যখন স্পষ্ট, তখন তাঁর মুখে আমরা বিকৃতি দেখি। এই বিকৃতির প্রকাশে কোনোরকম কুণ্ঠা লক্ষ্য করি না আমরা। এই বিষয়ে ভীষণভাবে নির্মোহ ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এবং এটা বলাই বাহুল্য যে সাধারণত ফিল্মের মুখ্য-অভিনেতা বা নায়কদের মধ্যে এই গুণটি খুব একটা দেখা যায় না।

‘সাত পাকে বাঁধা’ ফিল্মের নায়ক হিসাবেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক অন্যরকম নজির রাখলেন। সাধারণত বাংলা সিনেমার নায়ক মানেই সে প্রেমিক, সদা হাস্যময় ও ফ্ল্যাম্বয়েন্ট। কিন্তু সাত পাকে বাঁধা ছবিতে আমরা দেখলাম ছাপোষা চশমা পরা এক নায়ককে। যে প্রেমিক কিন্তু প্রেম-প্রকাশে বিশেষ আগ্রহী নয়। বেশ সিরিয়াস মানুষ। যদিও এই ছবিতে মূলত সুচিত্রা সেনকে স্ক্রিন স্পেস দিয়ে কাহিনি নির্মাণের একপ্রকার দ্যোতনা ছিল, কিন্তু তার ‘সিরিয়াস’ প্রেমিক হিসাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। আবার সেই অভিনেতাই পাড়ার বখাটে লোফার হয়ে গেছেন অনায়াসে। তার প্রধান কারণ সাবলীলতা। সাবলীলভাবে হাঁটা-চলা ও সাবলীলভাবে কথ্য ভাষা বলা, যা শুনলে সংলাপ মনে হত না। বর্তমানে যা বাংলার অভিনেতাদের মধ্যে ভীষণ বিরল।

সত্যজিতের কাজে যে জিনিসটা বারবার উঠে এসেছে সেটা হল মানুষের থিংকিং ফেস। ভাবুক মানুষের মুখ। কারণ তাঁর ফিল্ম মানুষকে ভাবাবে। সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করতে করতে ততদিনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও বুঝে গেছিলেন তাঁর জোরের জায়গা হল চোখ।

সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩)

ফেলুদার ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় আজও কোনও অভিনেতা ছাপিয়ে যেতে পারেননি। সোনার কেল্লা বানাবার আগে সত্যজিৎ রায়ের মাথায় অনেকজন অভিনেতার একটি মিশেল ছিল। কিছুটা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, কিছু শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, কিছুটা বরুণ চন্দ এবং কিছুটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো হতে হবে তাঁর ফিল্মের ফেলুদাকে। কিন্তু কিছুতেই সেরকম কোনো অভিনেতাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষমেশ, তিনি বেছে নিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। রায়বাবু ভরসা করতেন সৌমিত্রবাবুর অভিনয়ের ওপর। বলাই বাহুল্য গল্পের ফেলুদার সঙ্গে সৌমিত্রবাবুর খুব বিশেষ মিল ছিল না। সত্যজিৎ রায়ের যে প্রাথমিক স্কেচ আমরা দেখি, তাতে ফেলুদার কোঁকড়ানো চুল (অনেকটাই সব্যসাচী চক্রবর্তীর মতো) লম্বাটে মুখ ও দোহারা চেহারা। কিন্তু যে বয়সে সৌমিত্র ফেলুদা করতে এলেন ততদিনে তাঁর বয়স হয়েছে এবং মেদ জমেছে মুখের চারপাশে। তা সত্ত্বেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রায়ণ অকাট্য। কারণ, যেকোনও চরিত্রকে তিনি নিজের করে গড়ে তুলতে জানতেন। ফেলুদা চরিত্রের জন্য সৌমিত্রবাবুর মূল জোরের জায়গা হল গোয়েন্দা হিসাবে তাঁর চোখের কাজ।

সত্যজিতের কাজে যে জিনিসটা বারবার উঠে এসেছে সেটা হল মানুষের থিংকিং ফেস। ভাবুক মানুষের মুখ। কারণ তাঁর ফিল্ম মানুষকে ভাবাবে। সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করতে করতে ততদিনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও বুঝে গেছিলেন তাঁর জোরের জায়গা হল চোখ। কারণ তাঁর প্রিয় পরিচালক স্বরচিত প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্রটিকে সেইভাবে দেখতে বা দেখাতে চাইবেন। ফেলুদা চরিত্রটি এক অদ্ভুতরকম কাষ্ঠ ও মধুর রসের সংমিশ্রণে তৈরি করেন তিনি।

সোনার কেল্লা (১৯৭৪)

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর পছন্দের সিনেমাগুলোয় অভিনয় করতে দেখলে একটি জিনিস বারবার পরিষ্কার হয়, পেশাদারিত্বের পাশাপাশি, তিনি মন দিয়ে অভিনয় করতেন। ওই চরিত্রগুলোকে তিনি উপভোগ করে অভিনয় করেছেন। এখানে আরেকটা জিনিস মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অন্যান্য নায়কদের মতো, সৌমিত্র শুধু নায়কের ভূমিকাতেই সীমিত রাখেননি নিজেকে। বয়স হবার অনেক আগেই তিনি ‘আতঙ্ক’ (পরিচালনা তপন সিংহ) ছবি করেছেন, যেখানে তাঁর চেহারাকে দুমড়ে মুচড়ে একেবারে অন্যভাবে পেশ করেছেন পরিচালক। একজন বৃদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের ভূমিকায়। সেক্ষেত্রে বলতেই হয় যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সবসময়ই সময়ের থেকে এগিয়ে থেকেছেন এবং খুব সহজেই তিনি নিজেকে নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতাতে পরিবর্তিত করতে পেরেছিলেন।

অভিনেতা হিসাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব ধরা বা আলোচনা করা খুব সহজ কাজ নয়। নাটকের মঞ্চে বা ক্যামেরার সামনে একজন অভিনেতা কী করেন, কীভাবে করেন তা আদতে এতটাই জৈবিক একটা বিষয় যে তা নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা করে ওঠা প্রায় অসম্ভব কাজ। কিন্তু প্রিয় অভিনেতার অভিনয় দেখে কেন ভালো লাগলো, কিংবা বারবার ফিরে তাঁর অভিনয় দেখতে ইচ্ছে কেন করে তার পর্যালোচনা নিশ্চয়ই করা যায়। সেই আঙ্গিকেই বলছি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখনই যে অভিনয় করেছেন তাঁর সীমাবদ্ধতাগুলোকে মাথায় রেখেই করেছেন। এমন এক সত্য নির্মাণ করতে সক্ষম থেকেছেন, তা সে মঞ্চেই হোক বা ক্যামেরার সামনে, কখনও ‘মেকি’ মনে হয়নি।

Written by