
মিঠে রোদের দুপুর। এ-জায়গায় বসে টের পাওয়া যাচ্ছে না যে এত বড়ো রেস্টুরেন্টটা একেবারে সোদপুর হাইওয়ের পাশে। এখনই বহু মানুষ এখানে। আজ কোনও একটা ছুটির দিন সম্ভবত। নাকে এসে লাগছে বিরিয়ানির নরম, মশলাদার সুগন্ধ। মনটা চনমনে হয় উঠছে। তবু মনে হচ্ছে এই আরামপ্রদ রেস্টুরেন্ট যেন কত চেনা! খুব একটা অপেক্ষা করতে হল না। নমস্কার মুদ্রা দেখিয়ে সে এগিয়ে এসে বসল আমার সামনে। দুদিন আগে যার সঙ্গে কথা হয়েছে ফোনে সেই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সামনে বসা ছেলেটিকে মেলাতে পারছি না। আমার সামনে এখন অনির্বাণ। অনির্বাণ দাস। ডি-বাপি বিরিয়ানির সঙ্গে যার নাম ওতপ্রোত জড়িত।

ডি-বাপি বিরিয়ানি.
বাবা চেয়েছিলেন যে ব্যারাকপুর, বারাসত, সোদপুরের মানুষ বিরিয়ানি খেতে চাইলে তাকে কেন ঠেঙিয়ে কলকাতা যেতে হবে? বাবার মাংসের ব্যবসা ছিল, মায়ের স্কিল ছিল। তাহলে বিরিয়ানি কেবল একটা সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে থাকবে কেন? এই চ্যালেঞ্জটা আমার বাবা-মা নিয়েছিলেন – অনির্বাণ দাস
ডি-বাপি বিরিয়ানি অনির্বাণের উত্তরাধিকার। সাদা রঙের একটা সোয়েটশার্ট নীল জিন্সের ওপর। সাদা-লালের দামি জুতো। প্রায় ছয় ফুট লম্বা ছেলেটির অবয়ব বিশাল। চোখে কালো, মোটা ফ্রেমের স্টাইলিশ চশমা। এ-ছেলে অবলীলায় বাংলা ছবির নায়ক হতে পারে। অনির্বাণ সুপুরুষ কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ভীষণই বিনয়ী। গলার স্বর তার ভারী কিন্তু উত্তেজিত নয়। একটা সুদৃঢ় অথচ ভদ্রলোক ভাব তার সমস্ত চেহারায়। করমর্দন করে জিজ্ঞেস করল, ‘অনেকক্ষণ এসেছেন?’ আমি ‘না’ বললাম। বললাম, ‘কেমন আছো? সোশ্যাল মিডিয়া তো খোলা যাচ্ছে না। যখনই খুলছি, দেখছি তোমাদের পারিবারিক কোন্দল। তবে আমি আপাতত ওসবে যাব না। আমি জানতে চাই শুরুর দিনগুলোর কথা। কেমন ছিল সেই দিনগুলো?’ অনির্বাণ আলতো হেসে ওঠে। বলে, ‘খুব ভালো ছিল, দাদা। আমি, বাবা, মা আর আমার দশ বছরের ছোটো ভাই অনিকেত। আমাদের সংস্থান ক্ষুদ্র ছিল, অভাব ছিল, কিন্তু আনন্দের দিন ছিল সেসব। আমার বাবা মানে ডি-বাপি ব্র্যান্ড যার সেই বাপি দাস ছিলেন মাংস বিক্রেতা। বাবার একটা মাংসের দোকান ছিল। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই ছিল বাবার। এক্সাইড ব্যাটারী কোম্পানিতে আমার বাবার সারা বছরের টেন্ডার ছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল নাগাদ সেটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সেটা ছিল একটা বিগ লস। বাবা তখন হাইওয়ের পাশে ফুটপাথে একটা ছোট্ট ঝুপড়ি বলুন গুমটি বলুন, তাতে একটা বিরিয়ানির দোকান চালু করেন। ডি-বাপি মানে ডলি বাপি। ডলি দাস আমার মা।’
কিন্তু এত কিছু থাকতে বিরিয়ানি কেন? বিরিয়ানি তো কলকাতার একচেটিয়া। তাও আবার পার্ক সার্কাস-নিউ মার্কেট এলাকাগুলি বিরিয়ানির জন্য খ্যাত। হাইওয়ের ধারে বিরিয়ানির দোকান কেন? সেটা তো সবজি-ভাত, ডাল, মাছ-মাংসের দোকান হতে পারত। পরোটার দোকান হতে পারত। এর উত্তরে অনির্বাণ জানালো, ‘আপনি যে কথাটা বললেন ওটাই কারণ আর ওটাই ছিল সমাধান। বাবা চেয়েছিলেন যে ব্যারাকপুর, বারাসত, সোদপুরের মানুষ বিরিয়ানি খেতে চাইলে তাকে কেন ঠেঙিয়ে কলকাতা যেতে হবে? বাবার মাংসের ব্যবসা ছিল, মায়ের স্কিল ছিল। তাহলে বিরিয়ানি কেবল একটা সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে থাকবে কেন? এই চ্যালেঞ্জটা আমার বাবা-মা নিয়েছিলেন। প্রথমে হঠাৎ একটা অর্থনৈতিক স্ট্রাগেল এসে পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু একটা হাঁড়ি, দুটো হাঁড়ি করে অনেক পথ চলা হল। শেষে ২০১২ সালে ব্যারাকপুর ওয়ার্লেস মোড়ে একটা জায়গা ভাড়া নেওয়া হল। ওটাই প্রথম ডি-বাপি বিরিয়ানি হিসেবে ফুটপাথের ধার থেকে একটা রেস্টুরেন্ট মতো করে গড়ে উঠল। উদ্বোধন হল স্বাধীনতা দিবসের দিন। আমার তখন কুড়ি-বাইশ বছর বয়স।’ বাড়িতে ভাগ্যের লড়াই চলছে। সবাই মিলেই সেটা যুঝতে হবে। অনির্বাণ কী করেছিল সে-সময়? সেদিনের তরুলতা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। মা-বাবার জীবনযুদ্ধ অনির্বাণ কি ভাগ করে নিতে পেরেছিল? অনির্বাণ ভাবুক হয়ে ওঠে। স্মৃতির নদীতে ভেসে যায়। মুখে বলে, ‘আমার পড়াশোনা বেশিদূর হয়নি, দাদা। আমি খুব কম মানে আন্ডারেজে বলতে পারেন বিয়ে করে ফেলি। সিকিউরিটির কাজ করেছি। একশো তেষট্টি টাকা রোজ। অথচ বাড়ি ভাড়া দিতে হয় আড়াই হাজার। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারপর কাগজে বিজ্ঞাপন দেখল আমার স্ত্রী যে মোবাইল রিপেয়ারিং শেখানো হয় এক জায়গায়। সকালে সেই কাজ শিখতাম, রাতে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ। মারাত্মক স্ট্রাগেল গেছে সেই দিনগুলোয়। কিন্তু পরিশ্রম করতে, হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পিছপা হইনি। তারপর বাবার যে-ফুটপাথে দোকান ছিল সেটার থেকে আরেকটু দূরে আমি একটা ঝুপড়ি করে মোবাইল সারানোর দোকান খুললাম। নাম দিলাম অভিষেক মোবাইলস। তারপর ছেলে হল। দোকানটা টুকটুক করে ভালোই চলছিল। কিছু টাকা এক জায়গায় করে, কিছু ধার নিয়ে রোডে গাড়ি বের করলাম। তখন গাড়ি চালাই। নিজের গাড়ি, আবার অন্যের থেকে অর্ডার এলে সেই গাড়িও। তাও যেন সংসার চালাতে পারছিলাম না। বাবা সে-সময় আমাকে বলল দোকানে মানে আপনারা যেটা ডি-বাপি বিরিয়ানি বলে জানেন, সেটায় জয়েন করতে। কর্মচারী হিসেবে। বাবা পনেরো হাজার টাকা দিত মাসিক। আমি আমার রোডের গাড়িটার জন্য লোক রাখলাম আর কর্মচারী হিসেবে বাবার দোকানে বসা শুরু করলাম।’

তরুণ বয়সে বিবাহিত অনির্বাণ (বাঁদিকে) দুই পুত্রের মাঝে ডি-বাপির কর্ণধার বাপি দাস
ডি-বাপি বিরিয়ানির প্রসিদ্ধি বহুদিনের। কিন্তু আমরা জানি লকডাউনের পর থেকে যখন সমাজমাধ্যমের গুরুত্ব মানুষ না চেয়েও বুঝতে শিখল, যখন থেকে আমাদের জীবন সমাজমাধ্যমময় হয়ে উঠতে থাকল প্রায়, তখন ইউটিউবে আমরা ডি-বাপির কথা খুব দেখতে শুরু করলাম। এতসবের পরিকল্পনা কার ছিল? অনির্বাণ এবারও হেসে উঠে বলে, ‘কিছু মাস আগে বাবা আর মায়ের একটি পডকাস্ট জনপ্রিয় হতে সকলে মনে করেন সেটাই বুঝি আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে টার্নিং পয়েন্ট। সেটা একদমই ঠিক নয়। আপনি ডি-বাপি বিরিয়ানি ওল্ড ভিডিও বলে ইউটিউবে দেখুন, দেখবেন আমাদের দোকানের ভিডিও আছে। ওগুলো করিয়েছি আমি। আমাদের দোকানের, ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা ছিল কিন্তু সেটা খানিক লোকাল। আমি পুরো জিনিসটা ইউটিউবে নিয়ে এসেছিলাম। এই যে বাংলার বহু এলাকা থেকে লোকে খেতে আসে আজ, সেটা কিন্তু ওই সোশ্যাল মিডিয়ার একটা এফেক্ট বলা যায়। তাছাড়া, নানা জেলার বিভিন্ন মেলায় আমি ডি-বাপিকে নিয়ে গিয়েছি। মানুষ আমাদের বিরিয়ানির সঙ্গে আরও পরিচিত হয়েছেন।’
আজ সারা বাংলায় ডি-বাপি বিরিয়ানি বিরাট ব্র্যান্ড। সুগন্ধী চাল, আলু আর সঙ্গে ইয়াব্বড় একটা মাটনের অংশ। তুলতুলে। ভীষণই সুস্বাদু। বাংলার খাদ্যরসিকদের পাশাপাশি ইউটিউবার-ইনফ্লুয়েনসারদের ভিড়ও লেগে থাকে নানা ব্রাঞ্চে। বাঙালি যে কী ভালো ব্যবসা করতে পারে, উদ্যোগ নিতে পারে ডি-বাপি বিরিয়ানি তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওরা ব্যবসাটার ভিতরে প্রবেশ করেছে। রাজপথ থেকে রাজপ্রাসাদে উঠে আসার ইতিহাস লেগে এই পরিবারটায়। অনির্বাণ দাসও সেই ইতিহাসের এক অংশীদার। সব থেকে বড়ো কথা ভীষণ ভালো মার্কেটিং ওরা জানে। এ-নিয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই এক বিরাট সংখ্যক জনগণ এখন রিলের মধ্যে নিমজ্জিত। ডুমস্ক্রলিং বলে গাল পাড়লেও ছোটো-বড়ো-বুড়ো সকলেই সারাদিন রিলস দেখছে। তাদের কাছে অনির্বাণ, ডি-বাপি বিরিয়ানি প্রায় একটা সেলিব্রিটি স্টেটাস পেয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি তার নিজের একটা ডেইলি-ভ্লগের চ্যানেল আছে। সেটিও খুব জনপ্রিয়। কিন্তু সেখানে অনির্বাণ কিছু করে না। অন্য একজন সেটা চালায়। সেসব ভিডিওতে অনির্বাণ মূল চরিত্র। অপূর্ব মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ছেলেটির!
কিন্তু ডি বাপি বিরিয়ানির সঙ্গে আর যুক্ত নই। এখন আমার ব্র্যান্ড অনির্বাণস বিরিয়ানি অ্যান্ড ক্যাটারার। মাঝে মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। অনেক কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে – অনির্বাণ দাস

অনির্বাণস বিরিয়ানি অ্যান্ড ক্যাটারার
অনির্বাণ শুধু ব্যবসা করে তা নয়। অনির্বাণের অনেক সামাজিক কাজকর্ম আছে। বহু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় সে। সম্প্রতি এক শিশু যার সুস্থতায় কোটি টাকার ইনজেকশনের প্রয়োজন ছিল, তার অভিভাবকদের সাহায্যার্থে সে টাকা তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের তাবড় রাজনীতিবিদ, নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ শিশুটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। অনির্বাণ একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানও। সে পারিবারিক মানুষ। স্ত্রী-সন্তান তার সব থেকে প্রিয়। সারাটা দিনের ক্লান্তি যেন তাদের সঙ্গে থাকলে মিটে যায়। এবং খুব আশ্চর্যজনক ভাবে অনির্বাণ ভীষণই ভালো গান গায়। সমাজমাধ্যমে তার এই গুণের ঝলক মাঝে মাঝে দেখা যায়। অনির্বাণ বলে ওঠে, ‘ওসব কিছু নয়, দাদা। খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি তো এগুলো রয়ে গেছে। ব্যবসা যতই বাড়ুক আর ব্যস্ততা, এই জিনিসগুলো আমার রিল্যাকসেশন। এভাবেই এগিয়ে চলছি। কিন্তু একটা কথা আপনাকে খোলসা করি আমি কিন্তু ডি বাপি বিরিয়ানির সঙ্গে আর যুক্ত নই। এখন আমার ব্র্যান্ড অনির্বাণস বিরিয়ানি অ্যান্ড ক্যাটারার। মাঝে মা-বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। অনেক কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি পর্যন্ত গড়িয়েছিল সব। আমি তাই আলাদা হওয়াই শ্রেয় মনে করলাম। যাই হোক, সেসব কথা থাক। এবার চলুন কিছু খেয়ে নেবেন। অনেকক্ষণ বসে আছেন।’ অনির্বাণের এ-প্রস্তাবে আমি মাথা নেড়ে আপত্তি জানাই। বলি, ‘না, অনির্বাণ। আজ নয়, অন্য কোনও দিন। আজ কেবল কাজে এসেছিলাম।’ ভেতরে ভেতরে খুব অবাক হয়ে গেলাম যে এত পরিশ্রম করে ডি বাপি বিরিয়ানির সঙ্গে থাকলেও আজ ভাগ্যর ফেরে তাকে আরও একবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। অবশ্য অনির্বাণ সবটাই পারবে। তার আত্মবিশ্বাস আর সততা তাকে অনেক সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেবে। অনির্বাণ দাস আমাকে রেস্টুরেন্টের সুসজ্জিত দরজা অবধি ছেড়ে দিয়ে যায়। বাঙালি যে ব্যবসা ভালোই করতে পারে অনির্বাণ বারবার প্রমাণ করুক।
_______________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
