নন্টে ফন্টে থেকে অ্যানিমে-মার্ভেল : কলকাতায় ‘সব পেয়েছি’র কমিকস দুনিয়া

কদিকে আয়রনম্যান, ফ্যান্টম বসে আছে সিংহাসন জুড়ে। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান আর অ্যানিমে দুনিয়ার ‘ম্যাজিক বয়’ ‘ম্যাজিক গার্ল’রা। নন্টে ফন্টে, বাঁটুলদা, ফেলুদা, জটায়ু আর গোপাল ভাঁড়কেও হাসিমুখে দিব্যি দেখা যাচ্ছে! এ যেন এক জাদু রাজ্য! নতুন-পুরোনো, দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ‘সব পেয়েছি’র কমিকস দুনিয়া।

বিগত কয়েক বছর শীতে জমজমাট হয়ে ওঠে কলকাতা কমিকস কার্নিভাল। ২০২৫ সালের ২৬-২৭-২৮ ডিসেম্বর সায়েন্স সিটি অডিটরিয়ামে আয়োজিত হয় কলকাতা কমিকস কার্নিভাল ৬.০। কমিকস সম্রাট নারায়ণ দেবনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁর নামেই উৎসর্গ করা হয়েছিল কার্নিভাল। নানা দেশের জনপ্রিয় কমিকস, পপ কালচারের সম্ভার, বিভিন্ন মার্চেন্টাইজ, গেমিং, কসপ্লে সবই ছিল কার্নিভালের আকর্ষণ।

নারায়ণ দেবনাথ এবং সুকুমার রায়ের হজবরল’র শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ভারতীয় ডাক বিভাগের বিশেষ ডাকটিকিট এবং চিঠির খাম ছিল কার্নিভালে। প্রদর্শনীর পাশাপাশি যেগুলি কেনার সুযোগও ছিল।

কমিকস পাঠক এবং সংগ্রাহকদের কাছে এই কার্নিভালের একটা বড়ো টান ভিন্টেজ কমিকস। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ব্রুসলির বাংলা কমিকস, চাঁদমামা, চাচা চৌধুরীর প্রথম সংস্করণ, ইন্দ্রজাল কমিকসের হলুদ হয়ে যাওয়ায় পাতা মনে করিয়ে দেয় বাঙালির হারানো ছোটোবেলার গল্প।

অনেকেই এমন ব্যক্তিগত সংগ্রহ নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন কার্নিভালে। একবাল পুরের মধ্যবয়সী আসমান আলম এভাবেই গত ২ বছর ধরে আসছেন এই কমিকস পার্বণে। ছোটোবেলা থেকে বাংলা কমিকসের নেশা। তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বই রাখার জন্য ভাবতে হত না। জায়গা ছিল বিস্তর, কিন্তু এখন ফ্ল্যাটে স্থান সংকুলান হয় না। নতুন কমিকস সংগ্রহকে জায়গা করে দিতে পুরনোকে বিদায় দিতে হয়।

তাঁর কথায় পুরনো কমিকস বই সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাড়িতে রাখা সহজ কাজ নয়। অনেকেই বই রোদে দেন। কিন্তু আসমানবাবুর মতে তাতে বই বেঁকে যায়, পাতা ভেঙে যায় সহজেই। নিমপাতা, শুকনো লঙ্কা, গোল মরিচ মোক্ষম দাওয়াই।

নারায়ণ দেবনাথ এবং সুকুমার রায়ের হজবরল’র শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ভারতীয় ডাক বিভাগের বিশেষ ডাকটিকিট এবং চিঠির খাম ছিল কার্নিভালে। প্রদর্শনীর পাশাপাশি যেগুলি কেনার সুযোগও ছিল। নেপথ্যে ফিলাটেলিস্ট রৌনক দত্ত। গত ২ বছর ধরে কার্নিভালের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁর কথায়, কলকাতার কমিকসপ্রেমী এখন মূলত কলেজপড়ুয়া আর চাকুরীজীবীরা, যাদের বয়স মোটামুটি ৩০-এর কোঠায়।

স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে তাহলে ছোটোরা কমিকস বিমুখ হচ্ছে?

রৌনকবাবুর মতে, এই প্রজন্মর বড়ো অংশ ঝুঁকেছে ডিসি কমিকস আর অ্যানিমের দিকে। ছোটো আর বড়ো দুই প্রজন্মের মধ্যে সেতু ‘মার্ভেল’। কার্নিভালেও বাংলা কমিকসের তুলনায় অ্যানিমে-মার্ভেলের টেবিলেই ছিল জেন-জি, জেন-আলফাদের ভিড়।

কমিকসপ্রেমী রৌনকবাবু জানাচ্ছেন, আজকের দিনে ছোটোরা ডিজিটাল দুনিয়ার দৌলতে সব কিছু ঝকঝকে ‘প্রেজেন্টেশন’ দেখে অভ্যস্ত। বিদেশি কমিকসের প্যাকেজিং, মার্কেটিং যেভাবে হয় সেই জায়গাতেই কার্যত পিছিয়ে পড়েছে বাংলা।

কেন এই তফাৎ?

কমিকসপ্রেমী রৌনকবাবু জানাচ্ছেন, আজকের দিনে ছোটোরা ডিজিটাল দুনিয়ার দৌলতে সব কিছু ঝকঝকে ‘প্রেজেন্টেশন’ দেখে অভ্যস্ত। বিদেশি কমিকসের প্যাকেজিং, মার্কেটিং যেভাবে হয় সেই জায়গাতেই কার্যত পিছিয়ে পড়েছে বাংলা। আজকের শিশুর সঙ্গী হয়ে উঠতে আরও ঝকঝকে হয়ে উঠতে হবে বাংলা কমিকসকে।

তিন দিনের কার্নিভাল জমজমাট ছিল স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের ভিড়ে।

বিশিষ্ট শিল্পী দেবাশীষ দেবের কার্টুন অ্যান্ড ক্যারিকেচার ওয়ার্কশপ, কলকাতা ওরিগ্যামি সেন্টারের ওরিগ্যামি ওয়ার্কশপ ছাড়াও ছিল ড্রইং কনটেস্ট, অ্যানিমেশন-ফ্যান ডাবিং সেশন, কসপ্লে কম্পিটিশন, টুডি অ্যানিমেশন এবং মোশন গ্রাফিক্সের সেমিনার।

কমিকসের দুনিয়ায় হারানো সময়ের নস্টালজিয়া আর নতুন সময়ের দুরন্ত ঘূর্ণি – দুই ছবিই খুব সামনে থেকে দেখায় এই কার্নিভাল। নন্টে ফন্টে, ফেলুদা যাদের ছোটোবেলার দোসর তারাও কৌতূহলে পাতা ওল্টায় মাঙ্গার। আর জেন জি-র সঙ্গী হয়ে ওঠে ফেলুদা কিংবা নন্টে ফন্টে!

Written by