বইয়ের তাক থেকে : তিন কবির সঙ্গে দেখা

 

শুদ্ধ উচ্চারণেও থাকে ঘোর অজ্ঞানতা
অসাধু ভাষায় কথা বলে দেখি
মান্য তর্জনী রয়েছে
বাইরের কথা সব ভেতরে চলে যাচ্ছে
ভেতরের কথা বাইরে আসছে কই

(৪)

বির নাম, বিশ্বনাথ পুরকাইত। বইয়ের নাম—ঘটনাচক্রে। এই কবির লেখা আমি আগে পড়িনি। কিন্তু সমুদ্রের ঘননীল চটি বইটা আমাকে একপ্রকার আক্রান্ত করে ফেলেছে। ষোলো পাতার চটি বইটায় কবিতাগুলোর কোনও নাম নেই। কেবল সংখ্যা দ্বারা কবিতা চিহ্নিত। তো, এই চার নম্বর কবিতাটার শেষ লাইনের কাছে এসে আমি বারবার থমকে যাই। থমকে যাই আর আবার কবিতাটা শুরু থেকে পড়ি। শেষ করে আবারও শুরু থেকে পড়ি। কেন পড়ি? জীবনানন্দ লিখেছিলেন— ‘গান আছে পৃথিবীতে জানি, তবু গানের হৃদয় নেই।’ (অবরোধ, বেলা অবেলা কালবেলা) পৃথিবীতে গান আছে, আমরা জানি। কিন্তু ‘গানের হৃদয়’ ঠিক কী? গানের কি সত্যিই কোনও হৃদয় থাকে? আসলে গান যখন শুনি তখন তো হৃদয় দিয়েই শুনি। আর তাই আমার হৃদয়টাই তখন ‘গানের হৃদয়’! আমার হৃদয় না থাকলে গান সেখানে বসতে পারে না। জানলা খুলে ঝুঁকে আমাকে দেখতে পায় না। আমিও তাকে ছুঁতে পারি না। ‘তবু গানের হৃদয় নেই’— তবে কি গান উপলব্ধি করার একটা হৃদয়ও অবশিষ্ট নেই? চমকে উঠি, প্রায় সত্তর বছরেরও অধিককাল পরে লেখা কবিতাটার কাছে এসে— ‘ভেতরের কথা বাইরে আসছে কই’। এ তো জীবনানন্দের কথাটারই অনুরণন! লাইনটা ওৎ পেতে বসে থাকে মাথায়। আবার শুরুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। বুঝতে পারি ভেতরের কথা আসলে শুরুতেই বলা কথাগুলো। ভেতরের কথা অর্থাৎ মন খুলে বলতে চাওয়া কথা, যা বলে ফেলেও আসলে একটা ধন্দ তৈরি করা হয়েছে। কেননা, তার উত্তরও কবিই দিয়েছেন— ‘মান্য তর্জনী’র অনুশাসন আছে! বলে ফেলেও তাই যেন সতর্ক করে দেওয়া, নিজেকেই। ‘পোলিটিক্যাল কারেক্টনেস’-এর উপর্যুপরি ফাঁদ কি সত্যিই আমাদের ‘সত্যি’টা বলতে দেয়? বরং ‘বাইরের কথা সব ভেতরে চলে যাচ্ছে’। কোন বাইরের কথা? এই অনুশাসন, ফাঁদ, লাভ-লোকসানের কোলাহল স-ব। আর তাই ভেতরের কথা শুনতে গিয়ে কবিতাটায় বারবার আমাকে ফিরে আসতে হচ্ছে প্রথমে! কবিতার গোলকধাঁধা সত্যিই কী সহজ, কী সুন্দর!

কবিতা যখন জ্যান্ত হয়ে ভেতর ঘরে নড়েচড়ে বেড়ায়, তার সঙ্গে বসবাস আর তার থেকে মুক্তির অনুভূতি ঠিক কেমন? মাত্র চার লাইনে সেই ভাঙা-গড়া তরঙ্গ ধরে রেখেছেন বিশ্বনাথ—

প্রতীক ও চিত্রকল্পের বাক্স থেকে বেরিয়ে এল সাপ।
এতদিন কবির ঘরে থেকে কী পেলে ভাই—
জিজ্ঞাসা করব তার আগেই গর্তে ঢুকে গেল
বাক্স খুলে দেখি রঙিন খোলস পড়ে আছে 

(১৭)

এ যেন সচেতনতার মতো আলো আসা আর তার চলে যাওয়া। কার চলে যাওয়া? কবিতার। আর আলো আসার আগে কী ছিল? জলজ্যান্ত সাপ। যার মুখোমুখি বসতে চাইলে মুখে আলো পড়ার মুহূর্তে সে গর্তে সেঁধিয়ে যায়। রেখে যায় শুধু রঙিন খোলস।

কবির অনুভূতিতে ‘যৌথখামার’ কীভাবে ছায়া ফেলে?

আমার সময় তোমার সময় মিলে
আমাদের গড় সময়। এসো এই মুহূর্তকে
সন্ধ্যা বলে মেনে নিই, কালভার্টে পা ঝুলিয়ে বসি;
দু’একটা শুকনো ঘাস আলস্যে ছুঁড়ে দিয়ে দেখি কতদূর যায়…
সমুদ্রে যাবে? ডুবে যাবে? এসো
গড় সম্ভাবনার কথা ভাবি 

(১)

এই ‘যৌথখামার’ আসলে দু-জনের। যে গতির পৃথিবীর বিপ্রতীপে কালভার্টে বসে থাকতে চায়। জীবনের সময় আর সম্ভাবনা দুই-ই যাদের এক সূত্রে গাঁথা হতে চায়। যৌথজীবন আসলে তো ‘যৌথখামার’-এর একফালি আলো।

ঘটনাচক্রে: বিশ্বনাথ পুরকাইত। প্রকাশক: মুক্তাঞ্চল। 

বাস্তবতার ঘনঘোর আমাদের চোখ বেঁধে ফেলে। বাস্তবতায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি এমনকি পাশের বাড়ির অস্তিত্ব অবধি ভুলে যাই। আমি যখন গানের গজলে ঢুবে আছি, তুরীয় হয়ে আছি, তখনই এই গ্রহের কেউ তার বসের কাছে চূড়ান্ত অপদস্থ হচ্ছে। সংসারের একমাত্র রোজগেরে চাকরি হারাচ্ছে। আরেকটু বড়ো স্প্যানে ভাবতে পারলে পৃথিবীটা লাট্টুর মতো ঘুরছে, ব্ল্যাকহোল কত কত গ্রহ নক্ষত্র গিলে নিচ্ছে। কত তারার মৃত্যু হচ্ছে, জন্ম হচ্ছে। এত সব সময় নামক একটা ক্ষণের মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে। আমরা শুধু আমার সাপেক্ষে, আমার চোখের সামনেরটুকু ছাড়া কিছুই দেখতে পাই না। কিন্তু একজন কবি? তিনি যেন ত্রিভুবন জোড়া আতশ কাচে চোখ পেতে রাখেন—

টেবিল তৈরি হচ্ছে।
আমরা হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। চারপাশে উৎসুক গোল হয়ে।
যা যা রাখা হবে টেবিলে—তা আগেই প্রস্তুত হয়ে ডাঁই হয়ে আছে।
কার্যত তারাই বলেছে, এবার টেবিল চাই।
আমাদের সাধ্যমতো—যে বাগ্মী সে আগবাড়িয়ে ছুতোরকে
বুঝিয়েছে—কেমন কী লাগবে আর
অভিজ্ঞ ছুতোরও চেয়ে নিয়েছে তার সামগ্রী, টুকরোটাকরা।
খিদে চেষ্টা নেই, আমরা দেখেই যাচ্ছি;
জিনিসপত্র অপেক্ষমাণ—এরই মধ্যে রৌদ্র, ছায়া, … হাওয়া
উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে… পৃথিবী হরদম ঘুরছে আমরা কেউ
দেখতে পাচ্ছি না… ব্ল্যাকহোল কপ করে গিলে ফেলল
একটা নক্ষত্রকে সবার অলক্ষ্যে। কোনও প্রমাণ নেই।
তর্ক করছে কেউ। গুনগুন থেকে হইহল্লা হুড়দাঙ্গা…
ওদিকে টেবিল তৈরি হচ্ছে।

(টেবিল তৈরি হচ্ছে, রণজিৎ অধিকারী)

আসলে রণজিৎ-এর পৃথিবী ধারণার পৃথিবী। ‘ধারণা’ দিয়েই কল্পনার সুদূরতম আকাশে চক্কর কাটেন তিনি—

আসলে বনের ভেতরে বাইসন তৈরি হওয়ার আগেই
তার বেঁকে তেড়েফুঁড়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা ছিল কোথাও।
হাওয়ার ভেতরে ছিল!
জগতের মাথার ভেতরে ছিল!
সেই ভঙ্গিমাই একদিন নির্জন অরণ্যে বাইসন তৈরি করেছে।

(বাইসনের ভঙ্গিমা)

এ যেন প্লেটো কথিত ‘আদর্শ জগত’-এর প্রতিফলন। ভাবি, কল্পনা শক্তি কতখানি প্রবল হলে লেখা যায়—‘জগতের মাথার ভিতরে’! মনে পড়ে, কোথাও একবার পড়েছিলাম— ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সেখানে বলেছিলেন, এই মহাবিশ্ব ম্যাটারে পরিণত হওয়ার আগে নাকি চেতনা-স্বরূপ ছিল! ভাবি, একজন কবির কাছে কল্পনা নামক টুল-টি যেমন অপরিহার্য, তেমনি একজন বিজ্ঞানীর কাছেও তো কল্পনা অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। তিনি কল্পনার উপর ভর করেই তো ‘সত্য’কে আঁতিপাতি খোঁজেন! কবি ও বিজ্ঞানী, দু’জনের হাতিয়ার রাস্তার অনেকদূর অবধি এক, শুধু খোঁজার তরিকাটি আলাদা—

আবিষ্কার মানে তো কিছু নতুন সুবিধার কাছে যাওয়া।
আবিষ্কার কি শিকড়ের মতো কিছু কিংবা আকর্ষ!
পাতা কার অঙ্গুলিহেলনে কাঁপছে—হাওয়া কে?
আমি একটি খেবড়ো পাথরে বসে দেখছি সেই কাঁপন।
আমি জানি যে পাথর আবিষ্কৃত নয়, হাওয়াও নয়,
পাতার রূপ কোথা থেকে এল জানি না তো! 

একজন বিজ্ঞানী না-বুঝতে পারার প্রস্তরে ছেনি-বাটালি চালান, একজন কবি না-বুঝতে পারায় মুগ্ধতার স্পর্শ রাখেন। খোঁজেন আরেকভাবে। তাঁর কল্পনার ছিলাটি টানটান থাকে কী এক গোপন ব্যথায়—‘আমি লিখেছি যে, নিঃসঙ্গতাও এক গভীর কল্পনা—যা/ হয়তো অতি অল্পজনই হঠাৎ ছুঁয়ে ফেলতে পারে! (আমি লিখেছি)

একটি হিজল গাছের ধারণা: রণজিৎ অধিকারী। প্রকাশক: অস্ট্রিক।

 

একেকদিন নিজের মনকে অনুসরণ করতে করতে বেলা নিভে আসে। সন্ধ্যা দিগন্ত পেরিয়ে রাতের সমুদ্রে মেশে। আর আমাদের মনোলগ চলতেই থাকে। একবজ্ঞা মনোলগ চলতে চলতে কোথাও বাধা পেলে ঠিক কুটো জুটিয়ে নেয়, জুতোর ফিতেয় এঁটে যায় সেই ধুলো পা। মনোলগের বিবিধ ভাস্কর্য ফুটে ওঠে। কবি প্রীতম বসাকের ‘শুশ্রূষা ও মেঘের পাৎলুন’ পড়তে পড়তে ঠিক এই কথাগুলো আসে—

একটি নঞর্থক বাক্যের পাশে
তোমার চুপ করে বসে থাকা ছাড়া কী আর করার থাকে
দূরে সন্ধ্যার অপরূপ কেঁপে যায়
তুমি অপেক্ষা করো কখন আবহাওয়া আন্তরিক হবে

তুমি ভুলে যাও এই ঘরদোর এই রান্নাবান্না
আসলে যে মানুষের জন্য এত ফুল
শোকে মুগ্ধ হয়েছে তার জিহ্বা
কাকে দেখাবে—তোমারও কি কম দুঃখনিধি
গাছের হরিদ্রা ঘেমে ওঠে স্নেহের অভাবে

(হে দুঃখ-৬)

কথার ভার আমাদের বোবা করে দেয়। পঙ্গু করে দেয়। আমরা গুটিয়ে যাই। আর তাই সবকিছুর সঙ্গে দূরত্ব রচনা হয় মুহূর্তে। আর তাই একটা প্যারা ছেড়ে প্রীতম লিখলেন— ‘দূরে সন্ধ্যার অপরূপ কেঁপে যায়’। দূরে অপরূপ সন্ধ্যা কাঁপলেও আমি তাকে স্পর্শ করতে পারছি না, কেননা আমার মনের অসাড়ত্ব। আমি তার থেকে সে আমার থেকে তফাতে রয়েছে, রয়েছে বলেই প্যারার জরুরি ফাঁকটুকু। কিন্তু মন সবসময় সতেজতা চায়, আন্তরিকতা চায়, চায় বলেই সে অপেক্ষা করে, কখন আবহাওয়া তার হয়ে অনুকূলে বইবে। এই আবহাওয়া বাড়ির আবহাওয়া। পরের বাক্যে প্রীতম স্পষ্ট করেছেন। ভারাক্রান্ত বাক্য মনকে শোকগ্রস্ত করেছে। কিন্তু যখনই সে ফুলের সংস্পর্শে এসেছে, বাড়ির ভারাক্রান্ত বাক্য-ভার সে বহন করতে ভুলে গেছে। তার জিহ্বা পঙ্গুত্ব ভুলে গেছে। পরিবর্তে সে মুগ্ধ হয়েছে। হয়তো স্তুতিও করেছে। এমনকি সে নিজের এতক্ষণ ধরে পাওয়া দুঃখকে ‘দুঃখনিধি’ বলে উঠতে পারছে। পারছে কেননা গাছের দুঃখকেও সে তার নিজের সঙ্গে মেলাতে পারছে। গাছ ক্রমে তার অংশ হয়ে উঠছে। হলুদ হয়ে ঝরে যায় যে পাতা, সেও তো আসলে স্নেহের অভাব! সবুজের অভাব।

প্রীতমের আরও কত কবিতা নিয়ে পাতার পর পাতা খরচ করে ফেলা যায়। কিন্তু শব্দ সংখ্যার নাছোড় অসহায়ত্ব। তবু, কয়েকটি কথা না-বললেই নয়। এই কবির চিন্তাসূত্র কীভাবে একটি থেকে আরেকটি সূত্রে ডালপালা মেলে তা পড়তে পড়তে আশ্চর্য হতে হয়। এই দ্রুত চরকিপাকের সফরে প্রীতমের কবিতা বড়ো ধীর লয়ে চলে। চিন্তাসূত্র ধরে এগোতে গিয়ে অনেকসময়ই চড়াই-উতরাই আসে। পথে থেমে দম নিতে হয়। আর চিন্তাসূত্রের চাবিকাঠি একবার খুঁজে পেলে আনন্দের ওম শীতকালের খলবলে রোদ হয়ে ওঠে।

শুশ্রূষা ও মেঘের পাৎলুন: প্রীতম বসাক। প্রকাশক: তবুও প্রয়াস।

_____________
সাম্প্রতিক কয়েকটি কবিতার বইয়ের রিভিউ

Written by