শাশ্বত ‘সোলো’ ম্যান ও আমরা

ন্মুক্ত, স্বাধীন শিল্প বলতে কী বুঝি? শুধুই মত্ত ও বেপরোয়া? নাকি যা ব্যকরণ নির্ধারিত সব প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যায়, কিন্তু যার ‘ম্যাডনেস’-এও একটা ‘মেথড’ আছে? সেই ‘মেথড’, সেই শৈলী কোনোভাবে ব্রহ্মাণ্ডের অমৃতভাণ্ড থেকে শ্বাশ্বত কিছু চুরি করে আনে। যেমন প্রেম, কিংবা বিশ্বাস। কিংবা ক্ষয়, জ্বরা, লয়। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর বড়োপর্দার যে কোনো ছবি নিয়ে প্রাথমিক ভাবে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে, তা হল ‘এমনটা যে হবে তা তো ভাবা যায়নি!’ মানে, ‘আনপ্রেডিকটেবল৷’ বোধ ঘেঁটে যায়৷ ব্যক্তি-দর্শক নিজের ভিতর গুটিয়ে যায়। চট করে গোছানো প্রতিক্রিয়া দিতে পারে না৷ অর্থাৎ শিল্পীর ‘ম্যাডনেস’ শিল্পামোদীকে গ্রাস করেছে—টি.এস.এলিয়ট হলে বলতেন, অবজেক্টিভ কো-রেলেটিভের মাধ্যমে৷ ধরা যাক একটা কবিতা। কবিতায় তো আছে কিছু রূপক, কিছু দৃশ্যকল্প, যা জড়জগৎ থেকে গৃহীত। কিন্তু যেখানে তার পৌঁছে দেওয়ার কথা আমাদের, সে তো অপৌরষেয়, বিমূর্ত একটা ভাবনা! কবির বিমূর্ত ভাবনা, জড় জগতের অকিঞ্চন বস্তুরাশির মাধ্যমেই না পাঠকের মনে বিমূর্ত এক নিজস্ব ভাবনার জন্ম দিল! যারা তা দিল, তারাই হল অবজেক্টিভ কো-রেলেটিভ৷ প্রদীপ্তর ছবিও অনেকটা সেরকম, কাব্যিক৷ দৃশ্য, শব্দ যা কিছু রেখে যায় তাঁর ছবি, সেগুলো দিয়ে দর্শক নিজের মতো করে একটা বিমূর্ত ধারণা গড়ে নেন, যা প্রদীপ্তর ভাবনার কাছাকাছি কিছু হতে পারে, নাও হতে পারে৷ এই যে বহুপাঠ সম্ভব, বহু দর্শকের বহুপাঠ, বা একই দর্শক একেক বার দেখলে একেক রকম ভাবে ছবিটি দেখতে পারেন, এখানেই মনে হয় শিল্পের সার্থকতা। ছবির রিভিউ লেখার যোগ্যতা রাখি না। হয়তো লিখছি কিছু দর্শন-প্রতিক্রিয়া। এবং এই প্রতিক্রিয়া মূলত ‘সাবজেক্টিভ।’ ওঁর ছবি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট যূথবদ্ধ মত থাকা সম্ভব কিনা, সেও এক প্রশ্ন। তা মনে হয় একেকজনকে একেকভাবে আহত করে। ‘আহত করে’-ই বলছি, কারণ অভিঘাত তীব্র। আরও ভাবার বিষয়, কবিতা প্রকাশিত হওয়ার আগে শুধুই কবির। কিন্তু চলচ্চিত্র তো নির্মাণকালেও বহু-র, শুধু পরিচালকের নয়। কুশীলবের, প্রকৌশলীর—একটা গোটা ইউনিটের। তারাও কি তাহলে পরিচালকের বিমূর্ত ধারণাকে ছুঁতে ছুঁতে যান? যূথবদ্ধভাবে বিমূর্তে আক্রান্ত হওয়াও তাহলে অসম্ভব নয়! (নধরের ভেলা)

অনেকটা সময় জুড়ে নধরের জীবন আর সার্কাসের জীবন সমান্তরালভাবে চলে, কেউ কাউকে ঘাঁটায় না, কারও বৃত্ত অন্যজনের বৃত্তের কোনো বিন্দুকে ছেদ করে না, শুধু পাশাপাশি থাকে।

বলে রাখা ভালো, লিখছি বটে ছবিটি সম্পর্কে, কিন্তু ছবিটি আরও কয়েকবার দেখতে চাই, যা দেখলাম তা সত্যিই দেখলাম কিনা, যা বুঝলাম তা সত্যিই বুঝলাম কিনা, তা বোঝার জন্য। ছবিটি নধরের, ছবিটি সার্কাসেরও, কিন্তু ছবি শুরু হয় এক বৃদ্ধার মলিন মুখ দিয়ে, গতি যার বাধ্যবাধকতা। যে বৃদ্ধা স্থবির প্রাগৈতিহাসিক বৃক্ষ আর চিরন্তন কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু জলঙ্গী নদীর বহমানতার সাক্ষী। নধরের এই মা স্নেহময়ী কিন্তু প্রবঞ্চক৷ এই ছবির প্রায় সব চরিত্রের মতোই সে ভালোয়-মন্দে ভরা৷ আসলে বৃহৎ এক ডিজাইনে সকলকে এমনই পুতুমসম মনে হয় যে তাদের ভালোত্ব বা খারাপত্ব যেন তত চোখে পড়ে না৷ নধর ছাড়া, তারা সকলে যেন পারফর্ম করছে৷ এক এক মুহূর্তে মনে হচ্ছে, তারা যা যা করছে তাতে তাদের এজেন্সি, নিয়ন্ত্রণ, স্বকীয়তা আছে। কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হচ্ছে, সে ছিল ভ্রান্তি। সকলেই চাইছে রশিটা নিজের হাতে রাখতে। কিন্তু পারছে কই? (নধরের ভেলা)

চূড়ান্ত শ্লথ নধরের শ্লথতাকে দেবত্বের দ্যোতক বলে প্রচার করেছে তা মা। নৈবেদ্য হিসেবে চাল-ডালের যে ব্যবস্থা তাতে হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়৷ নধরের ধীরতা, তার লুঙ্গি গলানোর সুদীর্ঘ শট, এসবে ধাতস্থ হতে সময় লাগে আমাদের। কিন্তু যা তৎক্ষণাৎ বোঝা যায় তা হল, নধরের সুস্পষ্ট মত আছে। দুর্বল, একাকী মানুষের দৃঢ় মত। টাকার জন্য লোক ঠকাতে তার ভালো লাগে না৷ সে হিসি করে দেয়৷ বারবার৷ হিসির বালতি উলটে দেয়। প্রতিবাদে৷ ধীর ও নিঃশব্দ প্রতিবাদ। ক্রমশ মনে হয় আমাদের, ধীরতাই তার প্রতিবাদ৷ অমিত সাহার অভিনয় নিয়ে কী আর নতুন বলতে পারি? চোখ তাঁর খোলা আছে, অথচ দৃষ্টি যেন গতিশীল পৃথিবীকে উপেক্ষা করছে— এইটা তিন ঘণ্টা ধরে বজায় রাখার প্রায় অতিমানবিক কাজ তিনি করেছেন। সেই চোখের ভাষাকে চরাচর-উত্তীর্ণ বা অধিভৌতিক কিছু বলেও এককথায় দেগে দিতে পারি না৷ চোখে খিদের ভাষা আছে, যখন নধর বলে তার খিদে পেয়েছে। চোখে ভালোবাসা আছে, যখন প্রথমবার বেহুলার চরিত্রে সে শ্যামাকে দেখছে। চোখে কামনাও আছে, যখন সে শ্যামার বুক দেখে। কিন্তু মূলত যেটা আছে, তা হল অসীমকে ভালোবেসে সসীম জীবন-সার্কাসের প্রতি প্রত্যাখ্যান। (নধরের ভেলা)

অনেকটা সময় জুড়ে নধরের জীবন আর সার্কাসের জীবন সমান্তরালভাবে চলে, কেউ কাউকে ঘাঁটায় না, কারও বৃত্ত অন্যজনের বৃত্তের কোনো বিন্দুকে ছেদ করে না, শুধু পাশাপাশি থাকে। তারপর নধরের মা মারা যায়৷ ‘মোরো না মা গো’ গানটি আমরা সাত্যকির গলায় শুনি। আর শুনি দহনের শব্দ। নধরের মায়ের শব দাহ হচ্ছে। শিখা জ্বলে দাউ দাউ। শিখার শব্দ—চড় চড় চড়—হল জুড়ে সেই শব্দ ধ্বনিত হয়।  শিখার ভাষা। কী বলে সেই ভাষা? ক্ষুদ্রতার কথা, নশ্বরতার কথা কি? আগুনের যে ভাষা ছিল, তা কি আমরা জানতাম? যা যা নধর খেয়াল করে, তা কি আমরা খেয়াল করি? এই শব্দ তারপরে ফিরে ফিরে আসে৷ (নধরের ভেলা)

 

তিনঘণ্টা ব্যাপী ছবির শটগুলি, আধুনিক বিশ্বে যাকে ‘স্লো সিনেমা’ বলে, তার মতো নয়। লাভ দিয়াজের শেষ ছবির দীর্ঘতম শটে ক্যামেরা ঘোরে না, স্থির থাকে। এমনকি কোনো চরিত্রও আসে না তার সামনে দীর্ঘ সময়। কিন্তু প্রদীপ্তর শৈলী আলাদা, তিনি শ্লথতাকে গতির প্রেক্ষাপটে দেখাবেন স্থির করেছেন৷

মায়ের শরীর পুড়ে গেলে নধর যখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাসায় ফেরে, পাতার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের ঝিরঝির শব্দের প্রেক্ষাপটে তার মায়ের শুকোতে দেওয়া বিধবার থানটি তখনও হাওয়ার দুলছে। নধরের ধীর ছায়া পড়ে সেই সাদা ‘পর্দায়’, যেন সে সেই আঁচলে সেঁধিয়ে যেতে চায়। নধর প্রত্যাখ্যান করে পরিপার্শ্বকে। অথচ খুঁতো এই পরিপার্শ্বকে সে চায়ও বটে। যেমন সে চায় তার মাকে। মা শঠ, কিন্তু মা-হীন পৃথিবী আরও নিষ্করুণ। পরবর্তীকালে আমরা যখন সার্কাসের জগৎটা দেখি, দেখি সার্কাসের কলাকুশলীদের উপর কেমন ছড়ি ঘোরায় হারাধন, আর ভাবি কেন তারা পালায় না তাহলে, কেন দল ছেড়ে দেয় না, তখনও হয়তো আমাদের এই দৃশ্যটি মনে পড়ে। মানুষ পালায় কারণ সে তথাকথিত নিয়তিকে অতিক্রম করতে চায়, নিয়ন্ত্রক হতে চায় নিজ জীবনের। কিন্তু ছায়া সে ভালোবাসে। খুঁতো ছায়াও। এমনকি অত্যাচারীর ছায়াও তাকে হয়তো নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যস্ততার আশ্বাস দেয়। আরও মনে হয়, বিশ্বের সঙ্গে মানুষের একটা শ্বাশ্বত ঝগড়া চলছে নিরন্তর। কোনো এক স্বৈরাচারীর হাত থেকে পালাতে চাইছে মানুষ, জীবনের লাগাম নিতে চাইছে নিজের হাতে৷ কখনও কখনও পারছে। কিন্তু আজীবন নির্ঘাৎ পারবে না৷ (নধরের ভেলা)

তিনঘণ্টা ব্যাপী ছবির শটগুলি, আধুনিক বিশ্বে যাকে ‘স্লো সিনেমা’ বলে, তার মতো নয়। লাভ দিয়াজের শেষ ছবির দীর্ঘতম শটে ক্যামেরা ঘোরে না, স্থির থাকে। এমনকি কোনো চরিত্রও আসে না তার সামনে দীর্ঘ সময়। কিন্তু প্রদীপ্তর শৈলী আলাদা, তিনি শ্লথতাকে গতির প্রেক্ষাপটে দেখাবেন স্থির করেছেন৷ তাই জলঙ্গী তীরবর্তী সেই গ্রামে আসে—আসতেই হত—সার্কাস। ঝিংচ্যাক, রঙিন ও রগরগে। ছবিতে সার্কাস যখন রূপক, তখন গোদাভাবে তার দুরকম ব্যবহার আমরা দেখেছি। এক, যেখানে সার্কাস বিকল্প জীবনের প্রতীক। দুই, যেখানে সার্কাস কৃত্রিমতা, অবক্ষয়, হিংসা আর চিৎকারের দ্যোতক৷ প্রদীপ্তর সার্কাস দ্বিতীয় পথের পথিক। চ্যাপলিনের ‘দ্য সার্কাস’-এ ভবঘুরে যখন সার্কাসে যোগ দেয় এবং মানিয়ে না নিতে পেরে শেষে সার্কাস ত্যাগ করে, তখন তা নাকি নির্বাক যুগের আসন্ন পরিসমাপ্তি নিয়ে চ্যাপলিনের উদ্বেগ ব্যক্ত করেছিল বলে অনেকে বলেন। ফেলিনি-র ‘লা স্ত্রাদা’-তেও সার্কাস আছে, কিন্তু ছত্রে ছত্রে বোঝা যায় জীবনই সার্কাস, সেখানে পারফর্ম করা, ধ্বস্ত হওয়া আমাদের ভবিতব্য। কিছুদূর পর্যন্ত প্রদীপ্তর সার্কাস তেমন ঘরানার সার্কাস৷ কিন্তু এইটুকু সাদৃশ্যই সার। প্রদীপ্তর সার্কাস পূর্বতনদের অনুকরণ নয়। সার্কাস কাম বেহুলার পালা কাম যৌনগন্ধী নাচের আসর কাম রাত্রিকালীন দেহব্যবসার এক সম্পূর্ণ পশরা সাজিয়েছে হারাধন৷ এই জবরজং প্রদর্শনের নামটি ‘দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’ হওয়া যেন অবধারিত ছিল। ‘বেঙ্গল’ শব্দটি যদি তাকে লৌকিক ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে ‘গ্রেট’ শব্দে নিহিত ব্যঙ্গের ব্যপ্তি আরও প্রসারিত৷ সার্কাসের মালিক হারাধন এ ছবির করাল এক চরিত্র৷ তাকে বিশ্রীরকম নিষ্ঠুর করে তুলতে ঋত্বিক সংলাপ শুধু নয়, সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করেন বাচনভঙ্গি ও সমগ্র শরীরভাষা। কিন্তু মাঝেমাঝে তাকেও ভিলেন কম, ভাঁড় বেশি মনে হয়৷ নিষ্ঠুরতার ফাঁকে-ফোকরে হিউমার গোঁজা থাকে৷ ছবির সবচেয়ে খল এই চরিত্রটিও একা একা প্রলাপ বকতে বকতে প্লাস্টিকের গেলাসে মদ খাওয়ার সময় তাবিজ-মাদুলি খুলে রাখে কুসংস্কারবশত৷ কুসংস্কার ঠিকই, কিন্তু নিজের চেয়ে খামখেয়ালি, নিজের চেয়ে নির্মম, নিজের চেয়ে রাগী আর শক্তিশালী কাউকে সে যে ভয় পায়, তা বোঝা যায় তার এইসব অকিঞ্চন অভ্যাসে। কে সে? কী সে? সে কি সময়? সে কি অদৃষ্ট? পিশাচ হারাধনকেও যেমন সময় বিশেষে নাচার দেখায়, তেমনই আবার যে চরিত্রকে মনে হয়েছিল নিঃস্বার্থ ও পরোপকারী, নিপাট ভালোমানুষ, এই যেমন ধরা যাক নধরের প্রতিবেশী, দেখা যায় সময় বিশেষে সে-ও শঠ হয়ে উঠতে পারে। নধরকে সে সার্কাসে বেচে দেয়। পালিয়ে এলে আবার ধরে বেঁধে তুলে দেয় অত্যাচারী হারাধনের হাতে। নধরের চারপাশে যে জগৎ, তা আদতে জঙ্গলসম। সকলের সঙ্গে সকলের খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক। শুধু নধর এমন এক আশ্চর্য জন্তু, শিকারে যার মতি নেই।

সার্কাসের দুই নারী রূপা ও শ্যামা। শতাক্ষী নন্দী ও প্রিয়াঙ্কা সরকার। দুইজনের কমন প্রেমিক রহমান, সায়ন ঘোষ। শ্যামা অপেক্ষাকৃত পরিণত, তার চোখের তলায় অভিজ্ঞতার কালি। সে যে খানাখন্দ ভরা পথ মাড়িয়ে এসেছে, সেই পথের পথিক এখন রূপা। দুজনের সঙ্গেই সার্কাসের মালিক হারাধন যখন-তখন শোয়। দুজনই প্রেমিকের (সায়নের) সঙ্গে পালিয়ে স্বাধীন দল করার স্বপ্ন দেখে। রহমান কি তাদের দুজনকেই ঠকাচ্ছে? শ্যামা রহমানের পাশ থেকে উঠে  মাঠের দিকে চলে গেলেই রূপা তার পাশটিতে এসে বসে। এ কি ত্রিকোণ প্রেম? প্রেমের মতো দেখায়, আসলে সবই মিথোজীবিতার অনিবার্য ধান্দা। সকলকেই ব্যপ্ত করেছে নিজ নিজ ধান্দা, সকলেই ভাবছে জিতে যাবে। শ্যামা-রূপাদের পারফরম্যান্স-ক্লান্ত দেহ হারাধন রোজ রাতে তুলে দিচ্ছে কারও না কারও বিছানায়। অথচ যার বিছানায় যেদিন খদ্দের, সেদিন সে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে নিজেকে অপর নারীর থেকে বেশি মূল্যবান ভাবছে। এ কেমন অসার ক্ষমতা? শুধু অসার নয়, ক্ষমতা আপেক্ষিকও। অপেক্ষাকৃত দুর্বল পুরুষ ভালু-কে বাঁদরনাচ নাচাচ্ছে দুই নারী, আর তার পরের মুহূর্তে হারাধনের চড়ে তাদের একজন গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। অসার আর আপেক্ষিক যেহেতু, সেইহেতু ক্ষমতা কি আসলে অসহায়ও নয়? আপাত জয় ও অসহায়তা যে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ, তা এই ছবিতে বারবার স্পষ্ট হয়৷

এই ছবিতে নধর ছাড়া আরও একজন শুধু চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে চমকে দেওয়া অভিনয় করেন, তিনি হারাধনের নির্জীব, নির্বাক, অসুস্থ স্ত্রীর ভূমিকায় অপরাজিতা ঘোষ দাস। হারাধন শ্যামার ঘরের দিকে চলে গেলে, তার বউ-এর ফোলা ফোলা কান্না ভেজা চোখে অপমান। আবার শ্যামার ‘বেহুলার পালা’ ফ্লপ করলে সেই চোখে ক্রূর হাসি৷ অভিনয়ের কথা যদি বলি, এক বহুস্তরী দর্শনকে রূপ দিতে সকল কুশীলব এই ছবিতে নিজেকে উপুড় করে দিয়েছেন। মাঝারি চরিত্রে শতাক্ষী, সায়ন, অপরাজিতা, কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় (নধরের মা) তো বটেই, সার্কাসের কলাকুশলীদের ছোটখাটো চরিত্রের চরিত্রায়নেও যে যা করেছেন—যেমন ভালুর চরিত্রে নিলয় সমীরণ নন্দী— তাঁদের সম্পর্কে মনে হয়েছে তিনিই যথাযথ, বিকল্পহীন।

মা মারা গেলে নধর যখন সার্কাসে এসে পড়ে, তখন বিপরীত দুই বৃত্তের মধ্যে সংঘাত ঘটে। বেচতে জানলে সবই বেচা যায় ভেবে হারাধন শ্লথতাকেই প্রদর্শনযোগ্য করে তুলতে চায়। ‘গিনেস বুকে নাম ওঠা দুনিয়ার সবচেয়ে স্লো মানুষ’ হিসেবে প্রচার করে নধরের স্থবিরতাকে সার্কাসে বেচার একটা প্র‍য়াস নেওয়া হয়। ‘স্লো’ শব্দটি গ্রাম্য উচ্চারণে যতবার ‘সোলো’ (solo) হয়ে যায়, ততবার প্রকট হয় নধরের এককত্ব— একাকীত্ব নয়, এককত্ব। কিন্তু যে দর্শকের ভালো লাগেনি শ্যামার পুরোনো ধাঁচের ‘বেহুলার পালা’, তাদের মনে ধরবে কেন নধরের মন্থরতা? অতঃপর হারাধন গ্রামবাসীর হাতে পচা ডিম-টমেটো-আলু তুলে দিলে শো তৎক্ষণাৎ হিট করে। হারাধন এক ধর্ষকামী শো-এর সফল আয়োজন করেছে, যেখানে মন্থর নধর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসবে লাস্যময়ী শ্যামার দিকে, কিন্তু সে অভীষ্টে পৌঁছতে না পারলে দর্শক তাকে আক্রমণ করবে। হেরে যাওয়া মানুষের প্রতি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর আক্রমণ। গ্রামবাংলাকে প্রদীপ্ত প্রায়ই দেখান প্রেক্ষাপট হিসেবে, তাঁর চলচ্চিত্র ও টেলিছবিতে। কিন্তু একমাত্র ‘মোহিনী’ বাদ দিলে তাঁর ছবিতে গ্রাম ইউটোপিয়ান নয়। ‘মনসামঙ্গলের’ চিরাচরিত লোককথা কথা ছেড়ে ‘এর চেয়ে সিরিয়াল ভালো’ বলে উঠে চলে যায় যারা, তারা গ্রামেরই লোক। নধরকে যারা প্রতিদিন আঘাতে জর্জরিত করে, তারা গ্রামের নিপাট সাধারণ মানুষ। গ্রামপতন সভ্যতার পতনের সমানুপাতে ঘটে।

নধর আর শ্যামার সম্পর্কও বহুমাত্রিক৷ শ্যামা যখন অদ্ভুত নধরের পুরুষাঙ্গ চেপে ধরে, দেখতে চায় ‘যন্ত্রপাতি’ ঠিক আছে কিনা, কিংবা যখন তাকে জোর করে যৌনতার জন্য, তখন সে-ও একরকম ভ্রান্ত আস্ফালন৷ অথচ নধর তার মধ্যে বেহুলাকে দেখেছিল৷ জীবনমরণের সীমানা ছাড়িয়ে যে ভেলা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, সেই ভেলার কাণ্ডারী ভেবেছিল সে বেহুলারূপী শ্যামাকে, প্রথম দর্শনেই৷ তার ‘আমারে ভেলায় ভাসায়ে দাও’ আর্তি শ্যামা প্রথমে বুঝতে পারে না৷ ক্রমে নধরের অনন্যতার সামনে সে নত হয়৷ খাদ্য-খাদকের জঙ্গলে শ্যামাও খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে ফেলে শেষ পর্যন্ত। শৃঙ্খল বা শৃঙ্খলের রূপক তো চারদিকেই ছিল! সার্কাস, তার আবদ্ধ রিং, বোবার মতো মার খেয়ে চলা, মরতে হবে জেনেও ট্রাপিজে ঝুলে খেলা দেখানো, হুজুরের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো, শোষকের বিছানায় শুতে বাধ্য হওয়া, নধরকে শেষদিকে যে খাঁচায় আটকানো হয়— শৃঙ্খল সেই সবখানেই। তেমনই খাদ্যশৃঙ্খল হল নির্মম কিন্তু প্রয়োজনীয় এক শৃঙ্খল। নিজের অস্তিত্বের জন্য সেখানে অপরকে ধ্বংস করতে হয়৷ নধর আর শ্যামার প্রেম দেহ পেরিয়ে দেহাতীতে পৌঁছলে, শ্যামা একসময় সেই শেকলও ভেঙে দেয়। অবধারিতকে প্রত্যাখ্যান করে। অজানায় ঝাঁপ দেয়।

নিষ্করুণ যত মারের পর, নধর ছায়া চেয়েছিল। পুরো ছবিতে নধর যে চারপাঁচ বার কথা বলে, তার মধ্যে দু-তিনবার সে বলে ‘মা।’ নিজের মায়ের উদ্দেশ্যেও, শ্যামার উদ্দেশ্যেও। ব্যথার মলম বা ছায়া বা স্নেহ দেখলে আমরা প্রতিবর্তেই কেমন একটা প্রত্যাশী হয়ে পড়ি, সেই প্রত্যাশার নাম, ধরা যাক, মা। এই মা লিঙ্গহীন এক ধারণা। সব নারীর উদ্দেশ্যে তো নধর মা বলে না! ‘জল নাই, মাছ নাই, ছায়া নাই’ গানটির প্রেক্ষাপটে ‘মা’ শব্দটি বুঝি আমরা। নধর মমতাহীন, ছায়াহীন পৃথিবী থেকে ধীরগতির এক ভেলায় নিষ্ক্রমণ করতে চায়। অবিচল ধীরতাই সে যাওয়া-কে মহানিষ্ক্রমণ করে তুলবে। নধর আমাদের অন্তরাত্মা—চির সংযত ও প্রস্তুত থাকতে গিয়ে যাকে চৌকশ আমরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি৷ নধর ক্ষুদ্র হয়েও বৃহৎ, কারণ সে বৃহতের সুর শুনেছে, যে সুর আমরা অবহেলা করেছি। নধর সেই সুরের সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছে৷ নধর  হিংস্র হয়ে ওঠে একমাত্র তখন, যখন তার ছায়াদায়ী আহত হয়। সে হিংস্রতা আদিমতম, ক্ষমাহীন। ক্ষণিকের সেই চ্যুতির পর সে আবার স্থবিরতায় ফিরে যায়। সুদূরে হারায়।

প্রিয়াঙ্কার সম্পর্কে ইচ্ছে করেই লিখছি সবশেষে। প্রিয়াঙ্কা এ ছবিতে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ করেছেন, এমন বলতে চাইছি না৷ বলতে চাইছি, প্রিয়াঙ্কা এত চমকে দিয়েছেন, লাস্যেও, বিমর্ষতাতেও, যৌনতাতেও, করুণাতেও, যে খুব করে চাইব অন্য পরিচালকরা তাঁকে ব্যবহার করুন এরপর৷ তাঁর অভিনয় ক্ষমতা সদ্‌ব্যবহার করা সদ্য শুরু হয়েছে মনে হল।

অমিত আর ঋত্বিকের কথা আগে বলেছি৷ এর আগে প্রদীপ্তর সব ছবিতে ঋত্বিক থেকেছেন কেন্দ্রে, অমিত থেকেছেন পাশে। এবার জায়গা বদল হয়েছে। অমিত সাহার মতো অভিনেতা বাংলা সিনেমার অহংকার৷ ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-তে তাঁকে দেখে চকিতে রবি ঘোষের কথা মনে পড়েছিল৷ তুলনাটা বাড়াবাড়ি ভাবতে পারেন কেউ কেউ ভেবে বলিনি। তিনি প্রমাণ করেছেন এবার যে, তুলনা রীতিমতো চলে।

‘স্লো’ শব্দটি গ্রাম্য উচ্চারণে যতবার ‘সোলো’ (solo) হয়ে যায়, ততবার প্রকট হয় নধরের এককত্ব— একাকীত্ব নয়, এককত্ব। কিন্তু যে দর্শকের ভালো লাগেনি শ্যামার পুরোনো ধাঁচের ‘বেহুলার পালা’, তাদের মনে ধরবে কেন নধরের মন্থরতা?

গানের ব্যবহার ছাড়াও শব্দপ্রক্ষেপণের কথা আলাদা ভাবে বলতে হয়। সেই যে আগুনের শব্দ! তা ফিরে এসেছিল নধর আর শ্যামার অসম্পূর্ণ যৌনতার দৃশ্যে৷ ছবি যখন শেষ হয়, এন্ড ক্রেডিট দেখানো হয়, শব্দের খেলা তখনও চলে৷ শব্দের ব্যবহারেই আমরা বুঝি, নধর বুঝি বা সীমার মাঝেও অসীমকে পেল৷ শ্যামা বুঝি বা পেল একটা তীর। এন্ড ক্রেডিটের সময় যেহেতু শব্দের নানাবিধ খেলা চলে, তাই লোকচলাচল শুরু হলে, আলো জ্বলে উঠলে, অসুবিধে হয় খুব৷ দৃশ্যগ্রহণ যথাযথ, ওপরচালাকি কম। কখনও ক্যামেরা হ্যান্ডহেল্ড, ঝাঁকুনিযুক্ত। কখনও তা অকরুণ গ্রামবাংলাকে জৌলুষহীনভাবে ধরে। লো অ্যাংগেল শটে নধরের স্থবিরতা ধরা হয়। তাকে মনে হয় যেন ‘জগতের তবু জাগতিক নয়।’ বাতিল বেহুলার শো-এর পরিত্যক্ত ভেলা তাঁবুর পাশে পড়ে থাকে, আর তার উপরে বসে থাকে নধর— এও লো অ্যাংগেল শটে ধরা হয়। নধর সুদূরের মানুষ হয়ে ওঠে৷

নধর আর তার মন্থর ভেলা ফিলিপ লারকিনের কবিতার সেই উত্তরগামী জাহাজের মতো। পুবগামী আর পশ্চিমগামী জাহাজদুটি ফিরেছিল, কেউ জাগতিক অর্থে সফল হয়ে, কেউ ব্যর্থ হয়ে। কিন্তু উত্তর মেরুর দিকে যাত্রা করা জাহাজেরা ফেরে না। তারা জাগতিক পেরিয়ে মহাজাগতিকের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় হয়তো। ‘জাগতিক পেরিয়ে’ বা জাগতিক মাড়িয়ে, তবেই যে সে মহাজাগতিকে পাড়ি দেয়, এইটে মনে রাখা চাই। প্রদীপ্তর ছবিও, প্রতিটি ছবিই, জাগতিককে অতিক্রম করতে চায়, কিন্তু জাগতিকের পথ বেয়ে হেঁটে যেতে তাঁর অনীহা দেখা যায় না, কারণ সেটাই একমাত্র পথ। তাঁর ছবি সমকালীন ও চিরকালীন হতে পারে একসঙ্গে৷ ‘নধরের ভেলা’-ও তেমন ছবি। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই কথাতেই তাই ফিরতে হয়। একমাত্র শিল্পই বুঝি এমন অমিতসম্ভাবনাময়, যা মুহূর্তের জন্য হলেও অসীমকে সসীমের মধ্য দিয়ে ছোঁয়ার সুযোগ দেয়৷ নধর সেই আধ্যাত্মিক চেতনা, আধি-আত্মিক চেতনা, ক্ষুদ্র আত্নকে পেরিয়ে যাওয়ার সেই সুযোগ, যা আমার মধ্যেই ছিল৷ নধর আমায় ছুঁলে আসলে এক আমি অন্য আমিকে ছুঁয়ে দেয়। ছুঁয়ে দিলে সোনা হয়ে যাই।

______
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by