শান্তিনিকেতনের ছয় মহিলার কারুশিল্পে সেজে উঠেছিল ভারতীয় সংবিধান

য়াদিল্লির ভারতীয় সংসদ লাইব্রেরিতে, একটি বিশেষ হিলিয়াম ফিল্ড কেসে সংরক্ষিত আছে ভারতের আসল হস্তশিল্পিত সংবিধান। কালো চামড়ায় বাঁধানো, সোনালি কারুকাজে সম্মৃদ্ধ ছিল এই সংসদীয় সংবিধান। এই সংবিধানের প্রতিটি শব্দের ক্যালিগ্রাফি করেছিলেন প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদা মহাশয়। তবে বইটি চিত্রায়ণের ভার দেওয়া হয়েছিল শান্তিনিকেতনের কলা ভবনের কিংবদন্তি নন্দলাল বসু এবং তাঁর ছাত্রদলকে।

কারা ছিলেন এই দলে? এই কাজের ভারপ্রাপ্ত শিল্পী মহলের বেশিরভাগই ছিলেন মহিলা চিত্রশিল্পী। আর তাঁদের মাথার ওপর ছিলেন তাঁদের শিক্ষক তথা প্রবাদ প্রতিম চিত্রশিল্পী। দেশীয় সোনার পাতা তৈরির কৌশল এবং পাথরের রং ব্যবহার করে তাঁরা যে শিল্পটি তৈরি করেছিলেন, তা ভারতের ইতিহাসকে বহুল সমৃদ্ধ করেছিল।

 

উপর থেকে নিচ – যমুনা, গৌরি, অমলা, নিবেদিতা ও বাণী দেবীর সাক্ষর

সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল থেকে শুরু করে ১৯৫০-এর প্রজাতান্ত্রিক ভারতের প্রাক্কালে বিভিন্ন ঘটনার শৈল্পিক নিদর্শন মেলে এই কাজে। অথচ এই কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন যেসব মহিলা শিল্পীরা, তাঁরা প্রায় সকলেই আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন। এখানে সেই পাঁচ জন শিল্পীর জীবন এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রইলো একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যের বয়স মাত্র ২১ বছর। ভারতীয় সংবিধানের এই কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁরা প্রত্যেকেই সাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন শিল্পক্ষেত্রে

গৌরি ভঞ্জ (১৯০৭ – ১৯৯৮): নন্দলাল বসুর জ্যেষ্ঠ কন্যা ছিলেন গৌরি। তৎকালীন বিহারের মুঙ্গের জেলার হাভেলি খড়গপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চিত্রকলার জগতে তাঁর বাবার নাম তখন যথেষ্ট পরিচিত। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে ছাত্রী হিসেবে কলা ভবনে ভর্তি হয়েছিলেন গৌরি দেবী। এরপর নন্দলাল বসু কলা ভবনের অধ্যক্ষ হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার পরেই তাঁদের পরিবার শান্তিনিকেতনে চলে আসে। ১৯ বছর বয়সে, চিত্রকলায় ডিপ্লোমা নিয়ে স্নাতক হন গৌরি দেবী। প্রায় সবকটি ধরণের শিল্প মাধ্যমেই তিনি হয়ে ওঠেন প্রথম উল্লেখযোগ্য মহিলা শিল্পী।

 

পরবর্তী কালে কলা ভবনে শিক্ষকতার সুযোগ পান তিনি। এবং শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তবে তাঁর সৃজনশীল সাধনার পরিসর কেবল চিত্রকলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একজন নিপুণ নৃত্যশিল্পী এবং গায়িকা হিসেবেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ১৯২৫ সালে রবি ঠাকুরের নৃত্যনাট্য ‘নটির পুজো’ প্রযোজনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন গৌরি।তৎকালীন সমাজে মহিলাদের মঞ্চে উপস্থিতি নিয়ে ছিল নিষেধের কড়াকড়ি। ফলে, প্রাথমিক পর্যায়ে এই অভিনয় কলকাতার দর্শকদের হতবাক করেছিল ঠিকই কিন্তু তাঁর পারিবারিক পটভূমির জন্য সামাজিক রোষের মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে।

জাভানিজ বাটিক, রাজস্থানী বাঁধনি, সূচিকর্ম, চামড়ার কারুকাজ, ম্যাকরামের ওয়াল হ্যাঙ্গিং এবং মণিপুরী টেক্সটাইল ইত্যাদি বিষয়ে কলা ভবনের শিক্ষক হিসাবে গৌরী দেবীর সম্যক ধারণা ছিল। তাঁর এই কাজ স্বাভাবিকভাবেই শান্তিনিকেতনের শিক্ষামহলকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। এছাড়াও তিনি বাঙালির চিরাচরিত ঐতিহ্যের ঘরাণাকে তাঁর আলপনা শিল্পের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গনে।

যমুনা সেন (১৯২০ – ২০০১): গৌরী দেবীর বোন যমুনা ছিলেন নন্দলাল বসুর কনিষ্ঠা কন্যা। যমুনা দেবীও শিল্পের জগতে তাঁর পিতার পথই অনুসরণ করেন। ১৯৩০-এর গোড়ার দিকে ছাত্রী হিসেবে কলা ভবনে যোগদান করেন তিনি। তাঁর আগ্রহের বিশেষ ক্ষেত্রগুলি হয়ে ওঠে ফ্রেস্কো এবং লিনোকাট প্রিন্টমেকিং, যদিও পাশাপাশি তিনি ছবি আঁকার অভ্যাসও চালিয়ে যান।

শুধু নন্দলাল বসুই নয়, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক। তাঁর কাজের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ছিল প্রকৃতি প্রেমের নিদর্শন। তাঁর মানব মূর্তির কাজগুলিও ছিল উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

 

তবে শুধু শিল্পী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদানই নয়, একজন সংগঠক হিসেবেও তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর বাবা অবসর নেওয়ার পর গৃহিণীদের জন্য বাটিক, সূচিকর্ম এবং বয়নের মতো কারুশিল্প শেখানোর উদ্দেশ্যে একটি দুই বছরের সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেন যমুনা দেবী। পরবর্তীকালে মহিলারা এই কাজে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁদের এই কাজের পসরা নিয়ে পৌষ মেলায় হাজির হতেন। সেইসব হস্তশিল্প বিক্রিও হত এই মেলায়। গৃহিণীদে সুপ্ত প্রতিভাকে আলোয় আনার ক্ষেত্রে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল মাইলফলক। শুধু শিল্পের দিক নয়, বিপণন এবং প্রচারের বিষয়গুলিও শেখায় এই উদ্যোগ।

নিবেদিতা বোস (১৯২০ – অজানা) : তনয়েন্দ্রনাথ ঘোষের কন্যা ছিলেন নিবেদিতা। তনয়েন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে শিক্ষক এবং হোস্টেল ওয়ার্ডেন। নন্দলাল বসুর ছেলে বিশ্বরূপ ছিলেন নিবেদিতার সহশিল্পী। পরবর্তীকালে বিবাহসুত্রেও আবদ্ধ হন তাঁরা। নিজস্ব শিল্পকর্মের পাশাপাশি, রবি ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন নিবেদিতা।

 

অমলা সরকার (১৯২২ – ২০১০) : শান্তিনিকেতনের শিক্ষার তিনটি স্তম্ভ হল পাঠভবন, সঙ্গীত ভবন এবং কলা ভবন। অমলা সরকার ছিলেন একাধারে এই তিনটি ভবনেরই ছাত্রী। সংবিধান চিত্রনের সময় কলা ভবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বেশ কিছু বছর যাবৎ শিক্ষকতা করেছিলেন পাঠভবন এবং কলা ভবনে।

 

শিক্ষকতার পাশাপাশি কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্যা। বিশ্বভারতীর তহবিলের জন্য গান গেয়ে বেড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে। এছাড়াও তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং কলকাতার সঙ্গীত মহলের একজন জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন। এমনকি তাঁর কিছু গান তৎকালীন ‘গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া’-তে রেকর্ডও করা হয়েছিল।

 

বাণী প্যাটেল (১৯২৮ – ২০১৮) : গৌরী ভঞ্জের সুযোগ্যা কন্যা ছিলেন বাণী প্যাটেল। দাদু নন্দলাল বসুর সান্নিধ্য ছিল তাঁর জীবনের চরম সৌভাগ্য। তাঁর প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি হয় দাদুর কাছেই। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি সংবিধানের কাজের দায়িত্ব পান। কয়েকটি পৃষ্ঠা দেখাশোনার ভার পড়ে তাঁর ওপর। ভারতের ৬৯তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ২০১৮ সালে, অল ইন্ডিয়া রেডিও-এর তরফে তৈরি করা হয় একটি অডিও ডকুমেন্টারি। ৮৯-বছর-বয়সী বানীর একটি সাক্ষাৎকার দেখানো হয় এই ডকুমেন্টারিতে। সংবিধানে কাজের ক্ষেত্রে এটিই ছিল তাঁর একমাত্র প্রামাণ্য দলিল।

 

সুমিত্রা নারায়ণ (১৯২৯ – ) : ষষ্ঠ শিল্পী ছিলেন সুমিত্রা নারায়ণ, যিনি সংবিধানের একটি পৃষ্ঠা চিত্রিত করেছিলেন। সুমিত্রা নারায়ণ ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত গৌরী ভঞ্জের তত্ত্বাবধানে কলা ভবনে পড়াশোনা করেছেন। সেকেন্দ্রাবাদে বেড়ে ওঠার পর শান্তিনিকেতনের পরিবেশ তাঁর জন্য সম্পূর্ণ নতুন ছিল। যেহেতু তাঁর মাতৃভাষা ছিল কোঙ্কানি, তাই ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা শিখেছিলেন। পরে সুমিত্রা ১৯৬৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কলকাতার পাঠ ভবন স্কুলে কারুশিল্পের শিক্ষিকা হন।

Written by