অভিযান বুক ক্যাফে : বাংলার প্রথম থিম্যাটিক গ্রন্থ বিপণি

ময়টা আঠারো শতকের প্রায় শেষভাগ। পলাশীর সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এল বিরাট পরিবর্তন। আর ক্রমশ সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলো সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি সবক্ষেত্রেই। সেই পরিবর্তনের জোয়ারেই বাংলায় চার্লস উইলকিন্সের হাত ধরে ১৭৭৮ সালে হুগলির চুঁচুড়ায় প্রথম মুদ্রিত হলো বাংলা অক্ষর।

 

কিন্তু তারপর? বাংলা অক্ষর কীভাবে সেই প্রথম মুদ্রণের যুগ পেরিয়ে পৌঁছলো আজকের ডিজিটাল যুগে? হঠাৎ আপনার মনে যদি এই প্রশ্ন জাগে এবং সেই উত্তর খোঁজার অভিযানে আপনি যদি যেতে চান, তাহলে অবশ্যই ঘুরে আসতে পারেন কলকাতার বইপাড়ার, তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রথম থিম্যাটিক বুক ক্যাফে ‘অভিযান’-এ। দুই বাংলার সেই ভাষা প্রেমী মানুষেরা, যাঁরা কোনো না কোনোভাবে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা ভাষাকে, বিশেষত মুদ্রিত বাংলা লিপিকে, তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে হাতে এক কাপ কফি নিয়ে আপনি এখানে একান্তে সময় কাটাতেই পারেন আপনার প্রিয় বন্ধু বইয়ের সঙ্গে।

 

 

‘অভিযান বুক ক্যাফে’-তে ঢুকলে বই ছাপার সেই সাবেকি যন্ত্র আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। এছাড়াও এই দোকানের দেওয়ালে চোখ রাখলে বোঝা যায় ইতিহাস এখানে কথা বলে। 

ডিজিটাল যুগেও নতুন বইয়ের গন্ধ বাঙালির যে কতটা প্রিয় তা জানান দেয় বইমেলার মাঠ। শুধু বইমেলাই বা কেন? কলেজস্ট্রিটের প্রতিদিনের ভিড়ও সাক্ষী দেয় বাঙালির বইপ্রেমের। তবে থিম নির্ভর পুজোর সঙ্গে পরিচিত হলেও থিম নির্ভর বইয়ের দোকান এপার বাংলার বাঙালিদের কাছে একেবারেই অভিনব। এদেশের বইপ্রেমীদের এই নতুনত্বের স্বাদ দিয়েছেন ‘অভিযান বুক ক্যাফে’-র কর্ণধার এবং অভিযান প্রকাশনীর প্রকাশক মারুফ হোসেন। এই অভিনব বুক ক্যাফের বিষয়ে মারুফ হোসেন বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এটা পশ্চিমবঙ্গের প্রথম থিম্যাটিক বই-দোকান, একটা নির্দিষ্ট থিমকে নির্ভর করে এই বইয়ের দোকান সাজানো হয়েছে।” বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রথম এই ধরনের বইয়ের দোকান খোলা হয়, নাম ‘বাতিঘর’। জাহাজের বাতিঘরের আদলে তৈরি এই দোকান। পরবর্তীকালে ওই সংস্থাই সিলেট, রাজশাহী প্রভৃতি জায়গায় সেইখানকার বিখ্যাত কোনো ঐতিহাসিক স্থানের আদলে বইয়ের দোকান খুলেছে। বিভিন্ন কাজের সূত্রে বাংলাদেশ যাওয়ায় এই ভাবনা ভাবিয়ে তুলেছিল মারুফ হোসেনকে। সেখান থেকেই কলকাতার বইপাড়ায় তিনি খুলে ফেলেন ‘অভিযান বুক ক্যাফে’, যার থিম বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার ২৪৪ বছর। কিন্তু বাংলা মুদ্রণের মতো বিশাল পরিধির বিষয়কে কেন তিনি থিম হিসাবে নির্বাচন করলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “এই বিষয় নিয়ে যখন চিন্তা ভাবনা করছি সেরকমই একসময় লেখক শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ পরামর্শ দেন লেখালেখির শুরু থেকে এখনকার সময় পর্যন্ত লেখালিখির পদ্ধতিকে থিম হিসাবে ভাবতে। তাঁর কথার সূত্রেই আমার মাথায় আসে বাংলা মুদ্রণ নিয়ে এই ধরনের কাজ করার চিন্তা। তারপরেই এই বিষয়ে আরও গভীর পড়াশোনা শুরু হয় এবং আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় কাজ সম্পূর্ণ করে অগাস্ট মাসে এই দোকান উদ্বোধন হয়।”

‘অভিযান বুক ক্যাফে’-তে ঢুকলে বই ছাপার সেই সাবেকি যন্ত্র আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। এছাড়াও এই দোকানের দেওয়ালে চোখ রাখলে বোঝা যায় ইতিহাস এখানে কথা বলে। দুই বাংলার অসংখ্য ভাষাকর্মীর ছবি ও তাদের কাজের নিদর্শন মনকে সত্যিই আমাদের মাতৃভাষাকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য অভিযানের ডাক দেয়। পাশাপাশি আকর্ষণীয় ছাড়ে বই কেনার সুযোগ তো থাকছেই। আবার দূরের বন্ধুদের জন্য আছে অনলাইনে হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার করে বই কেনার সুবর্ণ সুযোগ।

 

দুপুরের অবসরে, পড়ন্ত বিকেলে বা সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত সন্ধ্যায় বই আমাদের সেরা সঙ্গী। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-বুকে অভ্যস্ত হলেও নতুন বই কেনার উৎসাহ আমাদের ছিল, আছে, থাকবেও। আর পাশাপাশি কৌতূহলী মন তো আছেই। তাই মনের কৌতূহল আর বইপড়ার তৃষ্ণা একসঙ্গে মেটাতে পৌঁছে যান মহাবোধি সোসাইটির পাশে, কলেজ স্কোয়ারের উল্টোদিকে অভিযান বুক ক্যাফে-তে।

_____

অভিযান বুক ক্যাফে প্রতিদিন খোলা থাকে৷ সোম থেকে শনি সকাল সাড়ে দশটা থেকে রাত সাড়ে আটটা রবিবার সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটা।

Written by