বাংলা সিরিয়ালে কোথায় গেল সর্বধর্মসমন্বয়, কুসংস্কারকে প্রোমোট করছে মেগা?

একটি বাংলা সিরিয়ালে সিঁদুরের ডালা থেকে স্লো-মোশনে সিঁদুর উড়ে গিয়ে নায়িকার সিঁথিতে লেপ্টে যাচ্ছে

নাট্যকার উৎপল দত্ত তাঁর ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকে ‘কাপ্তেনবাবু’ বেনীমাধবের মুখে বসিয়েছিলেন, “সতীত্ব এক কুসংস্কার”, যা শেষপর্যন্ত তার ভাবশিষ্যা ময়নার বিশ্বাসেও আশ্রয় পায়। এখানে যে সতীত্বের কথা বলা হয় তার সূচক ধর্মভীরুতা, যা সামাজিক এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিকও। আসলে ভয় এবং বিশ্বাস অঙ্গাঙ্গী জুড়ে থাকে। এ দুটির রসায়নেই দাঁড়িয়ে থাকে ধর্মের ভিত। যা একটি ব্যবস্থা বা তন্ত্র। এই ভয় এবং বিশ্বাস যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক, তাই ধর্মের উৎপত্তিও মনস্তাত্বিক। ধর্ম তাই শুধুই ধর্ম নয়, ধর্ম আসলে ধর্মবিশ্বাস। রাজাকে ভয় বা শ্রদ্ধা না করলে যেমন রাজা শাসক হতে পারে না, তেমনই বিশ্বাস ছাড়া ধর্মের অস্তিত্ব অবাস্তব এবং অবৈজ্ঞানিক। ‘প্রাণবাদ’ বলে প্রাচীন মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করেছে এবং তাকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা করে এসেছে। আবার এই বিশ্বাস মনস্তাত্বিক তো বটেই, কারণ প্রকৃতির সমস্ত বিস্ময় কিন্তু দেবত্বের আধার হতে পারেনি। স্থানভেদে, কালভেদে যে বিশ্বাসগুলি এবং আচারগুলি এখনও মানব সমাজে বয়ে চলে এসেছে সেগুলিই ধর্মবিশ্বাসের আধার হয়ে টিকে রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ধর্মবিশ্বাসকে আবর্তন করে চলা আচার এবং অভ্যেসগুলিই বিভিন্ন জনজাতির নিজ নিজ সংস্কার হয়ে উঠেছে। সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গেই যে শব্দটি চলে আসে তা হল কুসংস্কার। এই কুসংস্কারের মাপকাঠি হলো মানবতা। মানবতার পরিপন্থী সংস্কারগুলিই কুসংস্কার। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষ বারবারই মানবতার ঊর্ধ্বে ধর্মকে স্থান দিয়ে এসেছে। তাই যুগে যুগে কুসংস্কারের অন্ধবিশ্বাসের নীচে চাপা পড়ে গেছে সেই অমোঘ সত্যটি, “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”

নায়কের হাতে ধরা সিঁদুর কৌটো থেকে স্লো-মোশনে সিঁদুর উড়ে গিয়ে নায়িকার সিঁথিতে লেপ্টে যাচ্ছে। বিয়েতে সিঁদুর যদি না-ও পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে লিপস্টিককেও সিঁদুরের বিকল্প হয়ে সিঁথিতে ঠাঁই নিতে হবে।

সকাল-সন্ধে প্রত্যেকটি বাড়িতে টেলিভিশন যন্ত্র থেকে সিরিয়াল নামক যে ‘যন্ত্রণা’ (কারোর কারোর মতে) কাতরে বের হচ্ছে তা কতখানি অবৈজ্ঞানিক, কতখানি কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং কতখানি সাম্প্রদায়িক সেই বিষয়ে দু-চার কথা বলা যেতে পারে। টেলিভিশন নেই এরকম বাড়ির অস্তিত্ব বোধহয় এ বাংলায় নেই। নিয়মিত টিভি-সিরিয়াল দেখেন না এরকম বাড়ির সংখ্যাও বোধহয় খুব বেশি নেই। তাহলে এরকম একটি প্রভাবশালী, জনপ্রিয় এবং মূলধারার  বিনোদন মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বাংলা সিরিয়ালে কুসংস্কারকে মান্যতা দেওয়া এবং অপ্রত্যক্ষভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া কি অপরাধ নয়? এ বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণই যথেষ্ট। যেমন নায়কের হাতে ধরা সিঁদুর কৌটো থেকে স্লো-মোশনে সিঁদুর উড়ে গিয়ে নায়িকার সিঁথিতে লেপ্টে যাচ্ছে। বিয়েতে সিঁদুর যদি না-ও পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে লিপস্টিককেও সিঁদুরের বিকল্প হয়ে সিঁথিতে ঠাঁই নিতে হবে। কারণ সিঁথি ভরা সিঁদুর ছাড়া সতীত্ব? অকল্পনীয়! একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান এবং কুসংস্কার সমান গতিতে বিপরীত মেরুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না তো? অথচ একটা সময় টেলিভিশনে শক্তিশালী কাহিনি নিয়ে মেগা সম্প্রচারিত হত বছরের পর বছর। চিত্রনাট্য, অভিনয়, নির্দেশনা নিঃসন্দেহে মানুষের মনে গেঁথে আছে আজও।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে যুগের পর যুগ এত জ্ঞানের আলোর উন্মেষ এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক নয় কেন? সংস্কারের বিবর্তন যেমন সহজসাধ্য নয়, তেমনই কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিলে তার মূল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে গভীরতর হবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে! এবং এই কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে ক্ষমতা-তন্ত্র। তাই ধর্মীয় কুসংস্কার এবং ক্ষমতাতন্ত্রের আঁতাত প্রাগৈতিহাসিক। ধর্মের বিকাশই হয়েছিল অবাক বিস্ময়ে দিশেহারা মানুষকে কিছু নীতিবোধের বেড়াজালে বেঁধে গোষ্ঠী শাসন করা। সেখান থেকেই এল সমাজ, দেশ এবং সাম্রাজ্য শাসনের ইতিহাস। ক্ষমতায়নের এই ঐতিহাসিক গতিপথে এই ধর্ম-বিশ্বাসই মানুষকে মেরেছে আবার বাঁচিয়েছেও। গোষ্ঠীগত ধর্মবিশ্বাসের বিভিন্নতার কারণেই তো হিন্দু দেবদেবীরা কেউ আর্য, কেউ অনার্য। চামড়ার রঙের বিভিন্নতার কারণে দেবদেবীদের এই বিভাজন লৌকিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে? এখন এই সাদা চামড়ার দেবতাকে যদি কালো চামড়ার মানুষের ওপর শ্রেয়তর বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা ক্ষমতায়নের রাজনীতি ছাড়া অন্য কী? পৃথিবীর ইতিহাসে ক্রুসেড কি কম বার হয়েছে? ঈশ্বর, গড, আল্লার নামে কি কম রক্ত ঝরেছে পৃথিবীর মাটিতে? তাহলে যে ধর্মবিশ্বাসকে মানবতার ঊর্ধ্বে জায়গা দেওয়া হয়েছে তার গৌরব কোথায়। ক্ষমতায়নের স্বার্থে ব্যবহার করা এবং ক্ষমতাশালীর হাতে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়া ধর্মের আর কোন গৌরব অবশিষ্ট রয়েছে? এখনও কি তাহলে আমরা বলব যে সতীত্ব কুসংস্কার নয়?

যুগের পর যুগ এত জ্ঞানের আলোর উন্মেষ এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক নয় কেন?

একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলা সিরিয়ালের পুরুষ কিন্তু অবশ্যই সুদর্শন আর্য চেহারার। তারা সবসময়েই উচ্চবর্ণের হিন্দু; অর্থাৎ অবশ্যই তারা ব্যানার্জী-মুখার্জী-চ্যাটার্জী, কখনই মণ্ডল-বিশ্বাস-দাস-মুর্মু নয়। তারা কখনই দলিত কিংবা মুসলিম, বা অন্যান্য ধর্মের হতেই পারেন না (গুটিকয়েক উদাহরণ ছাড়া)। নানাবিধ গুণের সমাবেশে তাঁরা প্রায় দেবতুল্য হবেন। অর্থাৎ সবদিক দিয়েই আমরা একটি আদর্শ উচ্চবর্ণীয়, হিন্দু, ভারতীয় পুরুষকে খুঁজে পাবো। ধারাবাহিকের নির্মাতারা এমন একটি বাজার তৈরি করে ফেলেছেন, যে তার বাইরে ব্যতিক্রমী কোনোকিছু ভাবার শক্তি দর্শকদের নেই। ব্যতিক্রমী ভাবনার জায়গা থেকে কোনো কাজ হলেও টিআরপির অভাবে কাজটি বেশিদিন চলে না। যেমন ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে তৈরি ‘ফিরকি’ ধারাবাহিক টিআরপির অভাবে এক বছরের বেশি চলেনি। আবার ২০১৭ সালে সিরিয়াল বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল গোটা দেশ, এমনকি পিটিশনও জমা পড়েছিল

এবার আসা যাক বাংলা সিরিয়ালে সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গে। যদি বলা হয় যে বাংলা সিরিয়ালে অপ্রত্যক্ষভাবে সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রচার করা হচ্ছে, তাহলে অনেকেই অনেক প্রশ্ন ছুড়তে পারেন। কিন্তু যে কথা বলতেই হয়, তা হল বাংলা ধারাবাহিকে মুসলমান চরিত্র কোথায়? এটাও তো এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হিন্দুত্ববাদ নয়? যার অস্তিত্বকে স্বীকারই করা হচ্ছে না, তাকে নিয়ে সংখ্যালঘু-রাজনীতির জায়গা কোথায়? পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কম নয়। কিন্তু তাঁদের ধর্মবিশ্বাস এবং সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে এখনও পর্যন্ত টিভিতে কটি কাজ হয়েছে? প্রত্যেকটি সিরিয়ালের প্রায় সমস্ত চরিত্রই হিন্দু। বাংলা সিরিয়ালে যেভাবে বারোমাসে তেরো পার্বণকে মহাসমারোহে দেখানো হয়, অর্থাৎ দুর্গাপুজো, কালীপুজো থেকে ষষ্ঠীপুজো, এমনকি ঘটা করে বড়োদিন উদযাপন করা হচ্ছে, কিন্তু একবারও কি ইদ উদযাপিত হচ্ছে? বাঙালির সাংস্কৃতিক আইডেনটিটি বলতে যখন মূলত হিন্দু সংস্কৃতিকেই মান্যতা দেওয়া হচ্ছে, তখন ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ আর নয়, অনেকের কাছে তা বাঙালি ও মুসলমান। আবার এটাও ঠিক যে, গত বছর ‘খড়কুটো’ নামের এক ধারাবাহিকে এক মুসলমান আগন্তুকের আগমনকে কেন্দ্র করে দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। আগন্তুক যেহেতু মুসলিম ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ, সেই জন্য এই তথাকথিত আধুনিক সমাজের সংরক্ষণপন্থীরা একজোট হয়ে ধারাবাহিক বয়কটের ডাকও দিয়েছিলেন। তাদের দাবি, হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে কোনও বিধর্মী আসতে পারেন না! অতএব এই দায় শুধুমাত্র সিরিয়াল বা চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নয়, সমানভাবে দর্শকদেরও।

বাংলা সিরিয়ালে যেভাবে বারোমাসে তেরো পার্বণকে মহাসমারোহে দেখানো হয়, অর্থাৎ দুর্গাপুজো, কালীপুজো থেকে ষষ্ঠীপুজো, এমনকি ঘটা করে বড়োদিন উদযাপন করা হচ্ছে, কিন্তু একবারও কি ইদ উদযাপিত হচ্ছে?

সিরিয়াল অনেক পরে জনপ্রিয়তা পাওয়া একটি মাধ্যম। কিন্তু যদি বাংলা ছবির কথাই ধরি সেখানেও কিন্তু মূল ধারার জনপ্রিয় ছবিগুলিতে মুসলিম চরিত্রের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আবার, হাতে গোনা কয়েকটি ছবিকে বাদ দিলে অন্যান্য বাংলা ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে কোনো মুসলিম চরিত্রকে দেখা যায় না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় যে ঋত্বিক-মৃণাল-সত্যজিতের আলোচিত ছবিগুলিতেও আদর্শ মুসলমান চরিত্রের অভাব। আবার ছবিকে বাদ দিয়ে যদি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যের দিকেও লক্ষ্য করি, সেখানেও কিন্তু মুসলিম জীবনচর্যা এবং সংস্কৃতি নির্ভর কাজের সংখ্যা বেশ কম। বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথের কিছু লেখা বাদ দিলে অন্যান্য মহীরুহদের লেখালেখিতেও মুসলিম-জীবন সেভাবে উঠে আসেনি। একমাত্র মুসলমান সাহিত্যিকরাই নিজেদের জীবন মেলে ধরেছেন নানান আঙ্গিকে। তাই সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন সর্বত্র।

বাংলা সিরিয়ালে ধর্মীয় কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রচারণার প্রসঙ্গে চ্যানেলগুলির টিআরপি-র যুক্তি বোধহয় খাটে না, কিংবা যদি সেটিকেই যুক্তি হিসেবে দেখানো হয় তাহলে বিষয়টি যে পুরোপুরি রাজনৈতিক তা বুঝতে পারা খুব কঠিন একেবারেই নয়। দেশ জুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদের হিড়িক যখন এক স্বাভাবিক প্রবণতায় রূপান্তরিত হয়ে যায়, রাজ্যে তখন সমস্যাটিকে নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই হয়তো বুদ্ধিমানের রাজনীতি। কিন্তু এই এড়িয়ে যাওয়া তো কোনো সমাধান নয়, বরং পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেওয়া। একবিংশ শতকের বাঙালি কেন আলোর বিপরীতে হাঁটবে? সমস্তরকম ধর্মীয় কুসংস্কারকে জয় করে, সাম্প্রদায়িকতাকে সরিয়ে রেখে কেন বাঙালি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে টিভির পর্দায় দেখতে পাবে না এমন সব পরিবারের গল্প, যার স্বপ্ন হয়তো ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠেই দেখা সম্ভব!

 

_____

*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

Written by