
শিল্প মানুষের আত্মার গুণ। শিল্পচর্চা আসলে জীবনচর্চা। আদিগন্তকাল ধরে মানুষ শিল্পসাধনায় ব্রতী রয়েছে। গান, চিত্রকলা, স্থাপত্য, সিনেমা, নানান রূপে আত্মদর্শন করেছে সে। শিল্প তার বিদ্রোহের স্বর, হৃদয়ের আকুতি, সত্যিকে খোঁজার প্রচেষ্টা, ক্লান্ত দিনের শেষে একান্ত আশ্রয়, আবার জীবনের ক্লেদ থেকে পালাবার পথও। শিল্পে অধিকার সবার। কিন্তু দিন-আনা, দিন-খাওয়া মানুষের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিল্পচর্চা দূরের প্রহেলিকার মতন মিলিয়ে যেতে থাকে। ভোরের আলো ফোটার পর কোনও কারখানার শ্রমিক, তাঁর একান্ত সম্বল বাদ্যযন্ত্রটি বাজিয়ে খোলা গলায় গান ধরলেই বেজে ওঠে কারখানার ভোঁ। কোনও চাষি হাতে তুলি নেওয়ার কথা ভাবলে তাঁর স্মৃতি ধরে টান মারে পাকস্থলি আর আধসেঁচা মাঠ। সেই দূরত্ব আর আক্ষেপ মেটাতে উদ্যোগ নিয়েছেন শান্তিনিকেতনের শিল্পী দম্পতি আশিস ঘোষ ও অরুণিমা দত্ত ঘোষ। শান্তিনিকেতনের কোপাই নদীর তীরে বিদ্যাধরপুর গ্রাম। সেখানেই তাঁদের স্টুডিও। নাম স্টুডিও মৃত্তিকা (Studio Mrittika) বা মৃত্তিকা আর্ট গ্যালারি (Mrittika Art Gallery)।

২০০৬ সালে শুরু হয়েছিল শান্তিনিকেতনের স্টুডিও মৃত্তিকা-র পথ চলা। বিশ্বভারতীর শিল্প সদনের অধ্যাপক আশিস ঘোষ (Ashish Ghosh) এই স্টুডিওতে প্রশিক্ষণ দেন স্থানীয়দের। স্টুডিওর মালিকানা রয়েছে অরুণিমা দত্ত ঘোষের (Arunima Dutta Ghosh) নামে। তিনি পুরো ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধান করেন। আশিসবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “বাংলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছেন অগুনতি শিল্পী, যাঁরা প্রতিভায় কারোর চেয়ে কম যান না। তাঁদের শিল্পকর্ম অতুলনীয়। কিন্তু তাঁরা না পান শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি, না পান নিজের তৈরি জিনিসের ন্যায্য দাম। তাঁদেরকে তুলে ধরাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।” তিনি আরও বলেন, “ক্রাফটের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা স্টুডিও বাংলাতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি স্টুডিও গড়ে তুলতে, যা হবে সম্পূর্ণ ক্রাফট নির্ভর। যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী, ফসলের ফেলে দেওয়া অংশ, ইত্যাদি দিয়ে শিল্পীরা গড়ে তুলবেন ঘর সাজানোর উপকরণ, ছোটোবড়ো স্থাপত্য, মূর্তি।”

অধ্যাপক আশিস ঘোষ জানালেন, এই স্টুডিওটির গঠনপ্রণালীও অভিনব। পুরো গ্যালারিটি সহজলভ্য সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে। গ্যালারির ফলস সিলিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে মূলি বাঁশ। মেঝে তৈরি হয়েছে মুর্শিদাবাদের শিল্পীদের হাতে তৈরি টালি দিয়ে। গোটা গ্যালারিটি রং করা হয়েছে প্যাটেল নগরের বিখ্যাত রং দিয়ে। গ্যালারির সীমানা সাজানো হয়েছে চন্দননগরের মাটির তৈরি কুয়োর রিং দিয়ে। বিভিন্ন গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আলোকসজ্জা। লোহা, বাঁশ, পিতল, কাঠ, মাটি দিয়ে তৈরি হাজারেরও বেশি সুদৃশ্য উপকরণে সুসজ্জিত এই গ্যালারি।

আশিসবাবু উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বাংলাতে প্রায় ৫০০ রকমের মাটির ভাঁড় তৈরি হয়। লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি হতে পারে বাহারি ল্যাম্পশেড, বিভিন্ন ডিজাইনের কাঠের বাটি তৈরি হয়। লোহা, পিতল, বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায় ঘর সাজানোর উপকরণ। বাংলাতে এমন শিল্পীও আছেন, যাঁরা ৬ ফুটের কাঠের থালা তৈরি করতে পারেন। সারা পৃথিবীতে আর কোথাও এমন আর কেউ আছেন কি না সন্দেহ। আমরা তাঁদের কাজকে তুলে ধরার চেষ্টা করি।” এসব দ্রব্য বাজারে বিক্রিও করা হয়। আশিস ঘোষ বছরভর খুঁজে বেড়ান এমন সব শিল্প ও শিল্পীদের।

অধ্যাপক আশিস ঘোষ জানালেন, এই স্টুডিওটির গঠনপ্রণালীও অভিনব। পুরো গ্যালারিটি সহজলভ্য সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে। গ্যালারির ফলস সিলিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে মূলি বাঁশ। মেঝে তৈরি হয়েছে মুর্শিদাবাদের শিল্পীদের হাতে তৈরি টালি দিয়ে। গোটা গ্যালারিটি রং করা হয়েছে প্যাটেল নগরের বিখ্যাত রং দিয়ে। গ্যালারির সীমানা সাজানো হয়েছে চন্দননগরের মাটির তৈরি কুয়োর রিং দিয়ে।
এই গ্যালারির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কুড়ি-পঁচিশ জন। এছাড়াও আরও পনেরো-কুড়ি জন এখানে কাজ শেখেন, কাজ করেন। এঁরা সকলেই এলাকার আশেপাশের গ্রামের প্রান্তিক মানুষ। কেউ কামার, কেউ পিতলের কাজ করেন, কেউ কৃষিকাজ করেন। কুড়মিঠা গ্রামের পাঁচজন কুমোর এবং টেকরাবেতা গ্রামের পাঁচজন পিতলের কারিগর এখানে কাজ করে উপার্জন করেন। “এখানে সবাই থাকেন একটা পরিবারের মতন”, জানালেন আশিসবাবু।

তাঁদের স্টুডিও থেকে তাঁরা কাজ করেছেন বিভিন্ন জায়গায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রায়চকের গঙ্গাকুটির রিসর্ট, তাজ গ্রুপের অনেকগুলি হোটেল ও রিসর্ট, কলকাতার ইকো পার্কের বিভিন্ন কাজ। তাঁরা প্রধানত কোনও বিল্ডিং-এর আভ্যন্তরীন নকশার নান্দনিক দিকটিকে তুলে ধরার কাজ করেন। গ্রাম বাংলার অচেনা বা হারিয়ে যেতে বসা শিল্পকলাকে সময়োপযোগী করে তাকে বাজারজাত করে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে এই শিল্পকেন্দ্রটি, তার সঙ্গেই প্রান্তিক মানুষকে সুযোগ দিচ্ছে বিকল্প কর্মসংস্থানের। তাঁদের শ্রমগুলি শিল্প হয়ে উঠছে, শিল্পগুলি ন্যায্য দাম পাচ্ছে, আর শিল্পীরা পাচ্ছেন শিল্পের অধিকার।

