লোকায়ত মৃৎশকটিকের আদলে তৈরি মাটির ভাস্কর্য
কলা ভবনের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের শিল্পের ভাঙা গড়া খেলায় মেতে ওঠার এক আনন্দ উৎসব হল – নন্দন মেলা (কলা ভবনের নন্দন মেলা)। একদিকে যেমন মাটির সরাচিত্রকে লোক পরম্পরার উঠোন থেকে নিয়ে এসে সমকালীন শিল্পের নীল আকাশে সাদা রঙের ভেলা করে তুলেছে এই মেলা, অন্যদিকে এ হল শিল্পের ছাঁচ ভাঙা নিরীক্ষার এক আনখ সমুদ্দুর।
নন্দন মেলার সরাচিত্র
শুরুর দিন থেকেই রবীন্দ্রনাথের কলা ভবন ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির বিধির বাঁধন কেটে, আপন হতে বাহির হয়ে – সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলার আদর্শে গড়ে উঠেছিল। শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের তৈরি কৃষি ও ঋতু-কেন্দ্রিক মেলা ও উৎসবের প্রধান অবলম্বন হল সেই শিল্প, যা আমাদের আটপৌরে জীবনের সঙ্গী।
“ওগো চিত্রী, এবার তোমার কেমন খেয়াল এ যে,
এঁকে বসলে ছাগল একটা উচ্চৈশ্রবা ত্যেজে…
আজ তুমি তার ছাগলামিটা ফোটালে যেই দেহে
এক মুহূর্তে চমক লেগে বলে উঠলাম, কে হে।”
‘ছবি-আঁকিয়ে’/‘ছড়ার ছবি’/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘ছড়ার ছবি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের ‘ছবি-আঁকিয়ে’ কবিতার জন্য আঁকা ছবিটি দেখে রবীন্দ্রনাথ, চিত্রী নন্দলাল বসুকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন “তুমি আমাকে যে ছাগলের ছবি পাঠিয়েছ এ উর্ব্বশীর সহোদর ভাই নয় কিন্তু এর বাসা অমরাবতীতে। এর থেকে প্রমাণ হয় আর্টে সুন্দর হবার জন্য সুন্দর হবার কোন দরকারই হয় না। আর্টের কাজ মন টানা, মন ভোলানো নয়।” নন্দলালের সরল অথচ দার্ঢ্য রেখার টানে তৈরি গান্ধীজির লিনোকাট, ‘ডান্ডি পদযাত্রায় বাপুজি’ (১৯৩০) পরাধীন ভারতে প্রতিরোধের শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ।
বিশ্বায়নের প্রতিস্পর্ধী এক সচেতন শিল্প প্রক্রিয়া গড়ে তোলে নন্দন মেলা, যেখানে স্থানীয় পরম্পরায় তৈরি শিল্প ও স্থাপত্যের ভাবনা, এক উত্তর ঔপনিবেশিক গ্লোবাল সাউথ সংহতির জন্ম দেয়।
নাদের খলিলির ভাবনায় ঋদ্ধ সেরামিক ডোম কেন্দ্রিক ইন্সস্টলেশন ‘রেজিস্ট টু রেজিস্টেন্স’
বিশ্বায়নের প্রতিস্পর্ধী এক সচেতন শিল্প প্রক্রিয়া গড়ে তোলে নন্দন মেলা, যেখানে স্থানীয় পরম্পরায় তৈরি শিল্প ও স্থাপত্যের ভাবনা, এক উত্তর ঔপনিবেশিক গ্লোবাল সাউথ সংহতির জন্ম দেয়। যেভাবে স্থানীয় উপকরণে ১৯৩০-এর দশকে তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্র বাসগৃহ মাটির বাড়ি ‘শ্যামলী’ অথবা কলা ভবনের ছাত্রাবাস ‘কালো বাড়ি’, সেই পরম্পরাতেই ইরানীয় রীতিতে তৈরি পরিবেশবান্ধব ডোম স্থাপত্যকে সারা বিশ্বে পরিচিত করিয়েছিলেন ইরানি-আমেরিকান স্থপতি-শিক্ষাবিদ নাদের খলিলি (১৯৩৬-২০০৮)। ২০১৫ সালে নাদের খলিলি-র স্ত্রী ইলিওনা আউট্রাম খলিলি রবীন্দ্রনাথ ও নাদেরের ভাবনার মেলবন্ধনে কলা ভবন চত্ত্বরে একটি সেরামিক ডোম বানিয়েছিলেন – ছাত্রছাত্রীদের জন্য আয়োজিত একটি কর্মশালার মাধ্যমে।
ইলিওনা খলিলির কর্মশালা, ২০১৫ সালের নন্দন মেলার ঠিক আগেই হয়েছিল। ১৯২২ সালে, নন্দন মেলায় প্রাক-সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে, সেই স্মৃতিকে মনে রেখে, ‘রেজিস্ট টু রেজিস্টেন্স’ নামের একটি ইন্সস্টলেশন তৈরি হয়েছিল, বাটিকের কাপড় তৈরি করার মোম প্রতিরোধ রঞ্জন পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে। এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল, কলা ভবনের সদ্যপ্রাক্তনী-গবেষক-ছাত্রছাত্রী, রবিউল খান, ঋতুশ্রী মণ্ডল, উজ্জ্বল দে, এষা মুখার্জী, আগমনী সেন, দ্বিমু বোরো, প্রণব কে ঢাল, সৌমরাজ আচার্য ও আরও কয়েকজনের সঙ্গে শিল্পী-অধ্যাপক সঞ্চয়ন ঘোষের সমবেত প্রয়াসে। ‘রেজিস্ট টু রেজিস্টেন্স’-এর ভাবনা বিস্তারলাভ করে একটা কর্মশালার মাধ্যমে। সেখানে ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরি-র (১৯২১-১৯৯৭) প্রসঙ্গ তোলেন সঞ্চয়নদা। রবীন্দ্রনাথের মতই ফ্রেইরি, ব্রাজিলে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিগুলো তুলে ধরেছিলেন – ‘নীপিড়িতের শিক্ষানীতি’ থেকে শুরু করে ‘হৃদয়ের শিক্ষানীতি’-র মাধ্যমে। যে শিক্ষাপদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের কৌহূহল ক্রমাগত বেড়ে ওঠে, ফ্রেইরি সেই জ্ঞানের অন্বেষণের কথা বলেছিলেন। মোমের রং প্রতিরোধক সত্ত্বাকে শিল্পের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে সেই নীরিক্ষামূলক জ্ঞানের ইতিহাসচেতনা উপলব্ধি করা যায়। কিভাবে রবীন্দ্রনাথের শিল্প সমন্বয়ের প্রেক্ষাপটে ইন্দোনেশিয়ার বাটিকচর্চা এসেছিল শান্তিনিকেতনে। আবার ‘রেজিস্ট টু রেজিস্টেন্স’ সেই চর্চাকে নিওলিবারেল সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ গোলার্ধের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে সোচ্চার করে তোলে।
সোমনাথ হোরের প্রতি শ্রদ্ধার্পণ
সঞ্চয়নদার আগেও মোমের নমনীয়তাকে অন্যরকম ভাবে ব্যবহার করেছিলেন কলা ভবনের আর এক শিল্পী অধ্যাপক সোমনাথ হোর (১৯২১-২০০৬), তাঁর ‘ক্ষত’ সিরিজে। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ-দাঙ্গা-দেশভাগ-বাস্তুহারার স্মৃতি যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল তাঁর চেতনায়, তিনি তা ফুটিয়ে তুলতেন মোমের পাত্রে গরম লোহা দিয়ে আঘাত করে। আর তা থেকে তৈরি করতেন সিমেন্টের মোল্ড। তারপর, পেপার পাল্প কাস্টিং-এর মাধ্যমে তৈরি হত কালের মাত্রায় অমলিন, সাদার ওপরে সাদা প্রিন্ট। ‘রেজিস্ট টু রেজিস্টেন্স’ নাদের খলিলি ও সোমনাথ হোরের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার্পণ।
২০২২ সালের নন্দন মেলায়, শিল্প ইতিহাস বিভাগের ছাত্র সৌরভ বেরা ও তার সহপাঠীরা মিলে তৈরি করেছিল, তিন চাকার খেলনা গাড়ি – বাংলাদেশের মাটির খেলনা থেকে অনুপ্রাণিত একটি মাটির ভাস্কর্য। বাঁশ, লোহার তার ও খড়ের পরিকাঠামোর ওপরে এঁটেল মাটি দিয়ে প্রাথমিক ভিত তৈরি করার পরে, থ্রোয়িং পদ্ধতিতে বীরভূমের লাল মাটির আস্তরণে সেজে উঠেছিল এই কাজ। কলা ভবনে কংক্রিট থ্রো করে ভাস্কর্য তৈরির পরম্পরার পথ দেখিয়েছেন রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০)। তাঁর ‘কলের বাঁশি’-তে কারখানায় কাজ করতে যাওয়া দুই নারীর মধ্যে একজনের ভেজা শাড়ি হাওয়ায় শুকোতে শুকোতে যাওয়ার কল্পনাকে, কম্পোজিশনের পরিকাঠামোয় ব্যালেন্স করার জন্য একটি শিশুকে নিয়ে আসতে হয়। নন্দন মেলার শিল্প ইতিহাসের ছাত্রদের ভাস্কর্যের ভার ধরে রাখার জন্য ওই মাটির গাড়ির যাত্রীকে, চালকের মাথার লম্বা চুল টেনে ধরতে হয়।
কলা ভবনের নন্দন মেলায় শিল্পের আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে এখনও যেন রবীন্দ্রনাথ থেকে নন্দলাল-বিনোদবিহারী-রামকিঙ্কর-মানিদা-সোমনাথদা-নাদের খলিলির অমোঘ উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়।
নাদের খলিলির প্রতি শ্রদ্ধার্পণ
নন্দন মেলার সময় কলা ভবন চত্ত্বরে, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় (১৯০৪-১৯৮০), কে জি সুব্রমনিয়ম বা মানিদা (১৯২৪-২০১৬) ও সোমনাথ হোড়ের কালোত্তীর্ণ ভাস্কর্য ও দেওয়ালচিত্র গুলো আলোর স্পর্শে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আর তারই পাশে স্থান করে নেয় বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের কাজ। এবছর কলা ভবনের সদ্য প্রাক্তনী ঋতুশ্রী মণ্ডল, রবিউল খান, সুরজিৎ মুদি, হিমাংশু শর্মা, কুলদীপ শর্মা ও শীতল সি পি, কোচি-মুজিরিস বিয়েনালে-র অন্তর্গত স্টুডেন্স বিয়েনালে-তে কিউরেটর হিসেবে যোগদান করেছে। কোচি-মুজিরিস বিয়েনালে ২০২৫-২৬-এ অংশগ্রহণকারী শিল্পী ধিরাজ রাভা ২০২২ সালের নন্দন মেলায় খাবারের স্টল দিয়েছিল।
নন্দন মেলার ক্যালেন্ডার
খাদ্যকে রান্নাঘরের পরিসর থেকে বের করে শিল্পের আলোয় মুড়ে দিয়েছিল ‘নিমতনামা’– পঞ্চদশ শতকে মাণ্ডু সুলতানদের পৃষ্টপোষকতায় তৈরি রান্নার বইয়ের এক অনন্য পুঁথিচিত্র। থাইল্যান্ড বংশোদ্ভূত সমকালীন শিল্পী রিরক্রিট থিরাভানিজার (জন্ম ১৯৬১) কাজের অঙ্গ হল স্টুডিওতে দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে চাউমিন রান্না করা এবং সেই খাবার সকলের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ধরনের পায়েস ও পিঠে থেকে শুরু করে, দক্ষিণ ভারতীয় খাবার এবং বেনারসের মিঠা পানের মত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খাদ্যদ্রব্যের এক অফুরান সম্ভার নিয়ে হাজির হয় নন্দন মেলা।
নন্দন মেলায় কলা ভবনের প্রাক্তনী ও বর্তমান শিল্পী-অধ্যাপকগণ
নন্দন মেলায় শিল্পের বহুস্বর নিত্যনতুন অর্থময়তায় ভরে ওঠে। শিল্পকে নিয়ে শিল্পীর অভিজ্ঞতার পরিসরে, পাঠক-দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো ভেসে এসে মানে খোঁজার এক অনন্ত অন্বেষণ শুরু করে। নন্দন মেলা উপলক্ষ্যে শিল্প ইতিহাস বিভাগ থেকে দুটি বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ‘নন্দন’ ও ‘সার্চিং লাইনস’। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে শিল্পপাঠের ব্যাপ্তি ডানা মেলে উড়ে চলে শিল্পবিশ্বের আসীম আকাশে। শিল্পীর কাজের পদ্ধতি আর কলা ভবনের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের পারস্পরিক সম্পর্কের আদানপ্রদান, সমকালীন শিল্পকে এক নতুন পরিসরে এনে দাঁড় করায়। এই নব্য-অমরাবতীতে ছাত্রছাত্রী-শিল্পী-অধ্যাপক, শিল্প আর দর্শক-পাঠক – সবাই একই পংক্তিতে বসে এক অফুরান সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। দেওয়ালচিত্র থেকে সেলফি, সময়ের বহুস্বর, কেন্দ্র ও প্রান্তের ভেদাভেদ মুছে দেয়। এভাবেই নন্দন মেলায় শিল্পের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে এখনও যেন রবীন্দ্রনাথ থেকে নন্দলাল-বিনোদবিহারী-রামকিঙ্কর-মানিদা-সোমনাথদা-খলিলি-ফ্রেইরি ও আরও অনেক অনামী তারকার অমোঘ উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়।
_______________
চিত্রগ্রহণ – লেখক