শিকড় রয়েছে চিনে, তবু তাঁরা মনেপ্রাণে ভারতীয় : কলকাতার চিনেপাড়ায় বন্ধুত্বের ছবি

নুমানিক ১৭৯৮ সাল নাগাদ বাংলার আছিপুর-এ আসেন এক চিনে ব্যবসায়ী। ইতিহাস মতে তাঁর নাম টং অ্যাচিউ। আছিপুরে এসে তৎকালীন বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের স্নেহধন্য হন এই ব্যবসায়ী। বাংলার একমাত্র চিনা উপনিবেশের স্মৃতি আছে আছিপুরের নামে। হেস্টিংসের থেকে কিছু জমি লিজে নিয়ে দেন চিনির কল। এই চিনি কলে কাজ করার জন্য চিন থেকে বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ আসেন বাংলায়। এসে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন তারা। কিন্তু অ্যাচিউর মৃত্যুর পর একপ্রকার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত আছিপুরের চিনির কল বন্ধ করে কলকাতার দিকে চলে আসেন এই মানুষগুলি। কলকাতায় এসে তারা শুরু করেন চামড়ার ব্যবসা। কলকাতার যেই অঞ্চলে এসে তারা নিজেদের চামড়ার কারখানা বা ট্যানারি খোলেন, তাকেই আজকে আমরা চিনি ট্যাংরা নামে। কালক্রমে কলকাতা এবং ট্যাংরায় বাড়তে থাকে চিনা সমাগম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দেশভাগের পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। তবে ১৯৬২ সালের ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চিনারা একত্রিত হয়ে আসেন কলকাতার তপসিয়া এবং ট্যাংরা অঞ্চলে। নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থেই তারা এই সিদ্ধান্ত নেন। ধীরে ধীরে কলকাতার বুকেই গজিয়ে ওঠে একটি চিনা বসতি, একটি ছোট্ট টাউন। যাকে আজ আমরা চায়না টাউন বলি। কলকাতার চিনা পাড়ার আলাদাই ঐতিহ্য রয়েছে৷ ট্যাংরার অলিগলিতে ধরা পড়ে সেই চাইনিজ মেজাজ৷ সঙ্গে অবশ্যই রয়েছেন চিনা খাবারের হাতছানি৷ সন্ধে নামতেই চিনা খাবারের জন্য যেখানে ভিড় করেন বহু মানুষ৷ অবশ্য শুধু ট্যাংরার চায়না টাউন নয়, কলকাতায় রয়েছে আরও একটি চায়না টাউন। সেটি টেরিটি বাজারে। বিশ্বের অনেক বড়ো বড়ো শহরেই দেখা যায় এই চায়না টাউন, কিন্তু একই শহরে দুটি চায়না টাউন আছে এমন উদাহরণ বিরল। তবে এই আলোচনার মূল কেন্দ্র থাকবে ট্যাংরা।

ট্যাংরা চায়না টাউনের প্রবেশ পথ

কলকাতার দক্ষিণ পূর্ব অংশে অবস্থিত এই এলাকাটি বিখ্যাত তিনটি জিনিসের জন্য- চামড়ার সামগ্রী, অথেন্টিক চিনা খাবার এবং চাইনিজ কালীবাড়ি। ট্যাংরা অঞ্চলে মূলত হাক্কা সম্প্রদায়ের চাইনিজরা বাস করেন। মোটামুটি ১৯১০ সাল থেকে ট্যাংরায় এলেন কিছু জুতো প্রস্তুতকারক। চামড়ার তৈরি উচ্চমানের জুতো তৈরি হতে থাকলো কলকাতার ট্যাংরায়। প্রথমে তেমন সাড়া না পেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিত্রটা পাল্টে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চামড়ার তৈরি জিনিসের চাহিদা বাড়তে থাকে বাজারে। যার ফলে ভাগ্য পাল্টে যায় ট্যাংরার চিনা বাসিন্দাদের। ব্যবসায় বিপুল লাভের আশায় ক্রমশ বাড়তে থাকে চিনা বাসিন্দা এবং চামড়ার কারখানার সংখ্যা। ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে এলাকার চেহারা, গড়ে ওঠে নিত্যনতুন ঘরবাড়ি, কলকারখানা। সেখানকার স্থানীয় মানুষরাই তৈরি করে নেন নিজেদের জন্য স্কুল। চিনা মানুষের সমাগম, চিনা খাওয়া দাওয়া এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনে অচিরেই চায়না টাউনে পরিণত হয় ট্যাংরা।

চামড়ার কারখানা আজও দৃশ্যমান কলকাতার চিনেপাড়ায়

আগেই বলা হয়েছে, ট্যাংরার নামকরণ হয়েছিল ট্যানারি থেকে। ট্যাংরার এই চায়না টাউনের বাসিন্দাদের অন্যতম অর্থনৈতিক স্তম্ভ হল তাদের চামড়ার ব্যবসা। ট্যানারির কথা উঠলেই আপনাকে যেতে হবে দক্ষিণ ট্যাংরা রোড। আপাতভাবে দেখে কোনো সাধারণ রাস্তা মনে হলেও এই অঞ্চলে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশটি ট্যানারি। চামড়ার জুতো, বেল্ট থেকে শুরু করে ব্যাগ, জ্যাকেট পর্যন্ত সবকিছু তৈরি হয় এই দক্ষিণ ট্যাংরা রোডে। দক্ষিণ ট্যাংরা রোডের গা ঘেঁষেই রয়েছে চাইনিজ সিমেট্রি। পিছনের দিকটি ঘন গাছ গাছালিতে ভর্তি। একবার দেখলে পরে জঙ্গল বলে ভ্রম হতেই পারে। এখানে বলতে ইচ্ছা করছে চায়না টাউনের ডনের কথা। ডন। শব্দটি শুনতেই মনে হয় অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা বা অনেক খুন করা অপারাধীকে। কিন্তু এই ডন অপরাধী বা খুন করেনি। জীবনে চলার পথে আগত প্রতিটি কঠিন থেকে কঠিন দিনের সঙ্গে নির্ভীকভাবে যুদ্ধ করেছেন। এই ডন হলেন কলকাতার চায়নাটাউনের গ্র্যান্ডমাদার উমনিকা লিউ। তবে সকলের কাছে পরিচিত ‘ট্যাংরা ডন’ নামে। মনিকা চায়নাটাউনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। একটা ছোট হোটেল দিয়ে জীবনের যুদ্ধ শুরু করে আজ কলকাতার পাঁচটি হোটেলের মালিক তিনি।

ট্যাংরা ডন মনিকা লিউ

কলকাতার দক্ষিণ পূর্ব অংশে অবস্থিত এই এলাকাটি বিখ্যাত তিনটি জিনিসের জন্য- চামড়ার সামগ্রী, অথেন্টিক চিনা খাবার এবং চাইনিজ কালীবাড়ি। ট্যাংরা অঞ্চলে মূলত হাক্কা সম্প্রদায়ের চাইনিজরা বাস করেন। মোটামুটি ১৯১০ সাল থেকে ট্যাংরায় এলেন কিছু জুতো প্রস্তুতকারক। চামড়ার তৈরি উচ্চমানের জুতো তৈরি হতে থাকলো কলকাতার ট্যাংরায়।

মজার বিষয়, খানিকটা বালিগঞ্জ প্লেসের মতোই দক্ষিণ ট্যাংরা রোডের নামেও একটি চাইনিজ ফুড চেন আছে কলকাতা শহরে। তার নাম ৪৭ দক্ষিণ ট্যাংরা রোড। খাবারের কথা যখন উঠলো, তখন চলে আসা যাক খাওয়া দাওয়ায়। বলা যায় বিশুদ্ধ চিনা খাবারের খনি কলকাতার চায়না টাউন। আজকালকার ফুড ভ্লগারদের ভাষায় ‘অথেন্টিক’ চাইনিজ খাবার খেতে হলে আপনাকে আসতেই হবে কলকাতার চায়না টাউন। এই এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে ফ্রাইড রাইস, নুডলস (ওখানে কেউ সাধারণত চাউমিন শব্দটা ব্যবহার করেন না), চিলি চিকেনের সঙ্গে পাওয়া যায় পিকিং রোস্টেড ডাক, ভলকেনো চিকেন, স্প্রিং রোল, ডামপ্লিংস, চপসুইয়ের মতো চিনা খাবার। যদি আপনি একজন প্রকৃত খাদ্য রসিক হন এবং খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বিশেষ ছুৎমার্গ না থাকে তাহলে পর্কের বেশ কিছু উপাদেয় খাদ্য অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। চায়না টাউনের খাবারে সাধারণত চিকেন এবং পর্কের আধিক্য বেশি। মাটন কিংবা বিফ সেখানে প্রায় পাওয়া যায় না বললেই চলে। তবে সেখানকার রেস্তোরাঁ সাধারণত যে ধরনের খাবার সার্ভ করে হয় তা কিন্তু সেখানকার চিনে মানুষদের প্রতিদিনের খাবার নয়। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্থানীয় রেস্তোরাঁর এক মালিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আমাদের মধ্যে কিছু নিয়ম আছে। ধরুন যে জিনিস নিয়ে আমরা ব্যবসা করি তা আমরা খাই না। আবার যে জিনিস খাই তা নিয়ে ব্যবসা করি না। এখানে আপনি চিলি চিকেন, ফ্রাইড রাইস, নুডলস-সহ যাবতীয় খাবার পেয়ে যাবেন। কিন্তু এগুলি আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য নয়। আমাদের খাওয়া দাওয়া বলতে মূলত স্টিমড মাছ, স্টিকি রাইস, চাইনিজ স্যুপ এবং কাপ্তাই।”

এই কাপ্তাই জিনিসটি আসলে শুয়োরের মেটে বা লিভার। শুয়োরের মেটেকে শুয়োরের চর্বি দিয়ে রান্না করা হয়। কোনো সাধারণ বাঙালির পক্ষে এই খাবার খেয়ে হজম করা মুশকিল। তাছাড়া যেমনটা বললাম কাপ্তাই আপনি কোনো চাইনিজ রেস্তোরাঁয় পাবেন না। তবে একান্তই যদি খাওয়ার হয় তাহলে চাইনিজ নিউ ইয়ারের সময় একবার ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন। সেই সময় এরকম কিছু বিশেষ এক্সক্লুসিভ পদ সাধারণ মানুষের জন্য বানায় রেস্তোরাঁগুলি। একই সঙ্গে সেই দোকানের মালিক জানান, এই চিনে পরিবারগুলির অনেক সদস্যই আজ বড়ো বড়ো কোম্পানিতে অনেক উঁচু উঁচু পদে কর্মরত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা সময় পেলেই নিজেদের পরিবারের দোকানে এসে বসেন। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে একটি প্রথা আছে বলতে পারেন। যে যত বড়োই হয়ে যাক না কেন পরিবারের প্রথম ব্যবসাকে কেউ কখনও ছাড়ে না। শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বার করে নিয়ে আসে এই ব্যবসার জন্য। এই কারণেই হয়তো আমরা এত বছর ধরে টিকে আছি।”

চায়না টাউনের বিশেষ পদ কাপ্তাই

সুস্বাদু অথেন্টিক চাইনিজ নুডলস

জানলে অবাক হবেন এই চিনে খাবারের পাশাপাশি এখানে আপনি পেতে পারেন অথেন্টিক বিহারি খাবারও। তা সে লিট্টি চোখা হোক বা ভর্তা। ট্যাংরাতে চিনেদের পাশাপাশি বাস করে বিহার থেকে আসা অসংখ্য মানুষও। চাইনিজ কমিউনিটির পাশাপাশি সেখানে রয়েছে বিহারী কমিউনিটিও। তাই লক্ষ্য করা যায় সেখানকার চাইনিজরা হিন্দি কিংবা ভোজপুরী বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য বাংলার থেকে। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সেখানকার এক স্থানীয় তরুণ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আমরা বরাবরই ওঁদের (বিহারীদের) সঙ্গে একসঙ্গেই বড়ো হয়েছি। বাংলা বুঝতে পারি কিন্তু বলতে বা পড়তে একটু অসুবিধা হয়। ইংরেজি এবং হিন্দিতে আমরা স্বচ্ছন্দ্য।” চায়না টাউনে আরেকটি মজার বিষয় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত ভোটের সময় গেলে আরও বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা। কলকাতায় ভোটের সময় যে দেওয়াল লিখন হয় তা মূলত বাংলা কিংবা ইংরেজিতে। মারোয়াড়ি কিংবা মুসলমানবহুল অঞ্চলে অনেক অনেক সময় উর্দু কিংবা হিন্দিতে দেওয়াল লিখন দেখা যায়। তবে ট্যাংরায় ব্যতিক্রমী ভাবে চাইনিজে দেওয়াল লিখন হয়।

ভোটের সময় চিনা ভাষায় দেওয়াল লিখন

আসলে সাংস্কৃতিকভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বাঙালিয়ানার থেকে সেখানে চাইনিজ সংস্কৃতির প্রাধান্য রয়েছে। তবে সেখানকার বাসিন্দারা কী মনে করেন? তাঁরা নিজেদের চিনা ভাবতে চান, নাকি ভারতীয় বাঙালি! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির কথায়, “দেখুন একটা কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, আমরা ভারতীয়। আমার জন্মভূমি এবং কর্মভূমি ভারত। এটা সত্যি কথা যে আমাদের শিকড় রয়েছে চিনে। কিন্তু এখানকার সব ছেড়ে চিনে ফিরে যাব, এমনটা ভাবতেও পারি না। আমাদের চায়না টাউনে ইউহান প্রদেশের অনেক মানুষ বসবাস করেন। সেখান থেকেই করোনাভাইরাসের সূত্রপাত। তারপর ঘটলো গালওয়ান ঘাঁটির ঘটনা। তাই অনেকেই আমাদের বলতেন চিনে ফিরে যাও। তারা কারোর প্রতি রাগ থেকে বলতে পারেন, কিন্তু এই কথা আমাদের খুব বুকে লাগতো। সেই সময় আমাদের একঘরে করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন সব আবার আগের মতো হয়ে গেছে। এই তো কয়েকদিন আগে চাইনিজ নিউ ইয়ার গেল। তখনও আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে আনন্দ করেছি।”

কলকাতার চায়না টাউনের সবচেয়ে বড়ো উৎসব চাইনিজ নিউ ইয়ার। প্রতিবছর সাধারণত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ কিংবা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় চাইনিজ নিউ ইয়ার। এই চায়না টাউন একপ্রকার পরিণত হয় বেজিংয়ে। সুদূর চিন থেকে ট্যাংরায় উড়ে আসেন শিল্পীরা এই উৎসবে শামিল হতে। এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে অসাধারণ মার্শাল আর্টের পাশাপাশি থাকে চিনা লোকনৃত্যের অপূর্ব উপস্থাপনা। এছাড়াও থাকে চোখ-ধাঁধানো জাগলিং-এর খেলা আর তাকলাগানো সব জিমন্যাস্টিক্স। তবে মূল আকর্ষণ হল লায়ন ডান্স। ৩-৪ জন মানুষ মিলে সিংহ সেজে শোভাযাত্রা বের করেন। তাঁদের সঙ্গে হুল্লোড় করেন আশেপাশের মানুষ। তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল এই সময় চাইনিজ গানের পাশাপাশি সমান তালে বাজতে থাকে বলিউডি এবং বাংলা গান। স্থানীয় এক ব্যক্তির কথায়, “চাইনিজ নিউ ইয়ার মূলত সাত দিন ধরে পালিত হয়। প্রতিবছর জৌলুস নিয়ে মানুষ পৌঁছান চাইনিজ কালীবাড়িতে। মায়ের আশীর্বাদ নেন এবং একই সঙ্গে শুরু হয় আমাদের চাইনিজ নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন। সাতদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে নাচ, গান, হই-হুল্লোড় তো থাকেই তবে লায়ন ডান্স এটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। এছাড়াও এই সময় বিভিন্ন চাইনিজ এবং বলিউডের ছবি দেখানো হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে।”

চাইনিজ নিউ ইয়ার উদযাপন

একটি মজার জিনিস দেখুন। বিশ্বজুড়ে চাইনিজরা বিখ্যাত নিজেদের সংস্কৃতি বজায় রাখার জন্য। তারা যেখানেই যান না কেন নিজেদের সংস্কৃতিকে পিছু ছাড়েন না। কিন্তু এই বাংলার মাটিতে এসে বাঙালির সংস্কৃতিকেও আপন করে নিয়েছে চাইনিজরা। আমাদের আরাধ্য দেবী হয়ে উঠেছেন তাঁদেরও আরাধ্য। চাইনিজ কালীবাড়ি এই সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক। একজন হিন্দু দেবীকে শ্রদ্ধা ভরে চাইনিজ রীতি অনুযায়ী পুজো করেন তাঁরা। কালের নিয়মে অনেক কিছু বদলালেও বদলায়নি এখানকার কালীমন্দিরের নিত্য পুজোর রীতি৷ এবং সেখানেই পুজোর পর প্রসাদের জন্য হাত পাতলে পাওয়া যায় চাইনিজ খাবার৷ মাকে পুজো দেওয়া হয় নুডলস, চপসয়ে, ভাত এবং সবজি দিয়ে৷ মন্দিরের পূজারী বাঙালি, হিন্দু৷ এখানে প্রায় প্রতিদিনই অশুভ শক্তিকে দূরে রাখতে পোড়ানো হয় কাগজ। কালীপুজোর সময় মহা ধুমধাম করে পুজো হয়। সেই সময় মন্দিরে জালানো হয় লম্বা মোমবাতি এবং গোলাপি চাইনিজ ধূপকাঠি। এই চাইনিজ ধূপকাঠিগুলি কিন্তু সাধারণ ধূপকাঠির থেকে বেশ আলাদা। এর গন্ধ অনেক বেশি।

চাইনিজ কালী মন্দির

প্রায় ২২-২৩ বছর আগে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ট্যাংরা অঞ্চলে৷ কিন্তু মন্দির তৈরি হওয়ার আগে প্রায় ষাট বছর ধরে সেই গাছের নিচেই ধুমধাম করে কালীপুজো হতো। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক কিংবদন্তিও। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৮০ বছর আগের কথা৷ হঠাৎ এক বালক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। অসহায় মা-বাবা মানত করেন দেবীর কাছে। গাছের তলায় শুইয়ে রাখেন তাদের অসুস্থ ছেলেকে। সকলকে অবাক করে দিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে সেই ছেলে৷ তারপর থেকেই এলাকার মানুষদের ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে দেবীর প্রতি। সেই থেকে ভক্তি ভরে পুজো শুরু হয় মায়ের। প্রথমে গাছের নিচে এবং পরবর্তীকালে মন্দির বানিয়ে পুজো করা হয় কালীর। এই মন্দিরে নিয়মিত আসেন এলাকার চিনা বাসিন্দারা৷ তাঁরা প্রণাম করেন, পুজোতে অংশও নেন৷ পুজোর সময় এখানে হিন্দু কিংবা চিনাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। এই ভাবেই মিলেমিশে যায় সব সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শহর কলকাতা।

Written by