
এ দেশে কৃষক-ক্ষোভ বা আন্দোলন কি নতুন কিছু? উত্তর হবে ‘না’। অতিরিক্ত কর, শোষণ, ভূমি উচ্ছেদ, ঋণ, অযৌক্তিক অর্থনৈতিক নীতি, অবৈতনিক শ্রম – বহু বহু বছর ধরে কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে এই দেশ। ইতিহাস পড়ে আমরা জানতে পারি সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের কথা। বিগত কয়েক বছরে ভারতে যে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, তার সাক্ষী থেকেছি আমরা। কিন্তু, আমরা যারা চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নই, মূলত ক্রেতা, তারা কতটা একাত্ম হতে পেরেছি এইসব আন্দোলনের সঙ্গে? অথচ, দিনের শেষে চাষের ফসল খেয়েদেয়ে শান্তিতে নিদ্রা গিয়েছি। অথচ, ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব থাকার কথা ছিল।
সাধারণ নাগরিকরা অনেক কিছুই গভীরে গিয়ে জানতে পারেন না, চেষ্টাও করেন না। চাষশিল্প ও চাষিদের ক্ষতি মানে আমাদেরও ক্ষতি, রাষ্ট্র চায় না সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে সচেতন হোক। তারা মুনাফালোভীদের বন্ধু।মুনাফালোভী কর্পোরেট দুনিয়া ফড়ে, দালাল, মধ্যস্বত্ত্বভোগীরও বহু ধাপ ওপরে। আড়ালে তারাই দেশকে চালাচ্ছে। দেশে অশিক্ষা এবং ‘নুন আনতেই পান্তা ফুরোয়’ দশা টিকে থাকলেই তাদের মঙ্গল! “ওরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে তত কম মানে”। মিটে গেল। হাজার হাজার কৃষকের মৃতদেহের ওপর, “জাগো গ্রাহক জাগো” লালাবাই শোনাতে শোনাতে আমাদের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে রাখে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবা রাষ্ট্র। কিন্তু, তারা ভুলে যায় সকলের ঘুম সমান নয়। যারা জেগে থাকে, তারা জাগাতেও পারে। শুধু তাগিদটা থাকতে হবে। এই তাগিদ থেকেই আমেরিকা-প্রবাসী কৃতি বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক বেদব্রত পাইনের তথ্যচিত্র ‘দেজা ভ্যু’ নির্মাণ।

আমরা যারা চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নই, মূলত ক্রেতা, তারা কতটা একাত্ম হতে পেরেছি এইসব আন্দোলনের সঙ্গে? অথচ, দিনের শেষে চাষের ফসল খেয়েদেয়ে শান্তিতে নিদ্রা গিয়েছি। অথচ, ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব থাকার কথা ছিল।
বেদব্রত এই ছবি চাষিদের সচেতন করার জন্য বানাননি, তাঁরা সত্যিটা জানেন। এই ছবি সেইসব নাগরিকদের জন্য, যাঁরা না জেনে বা জেনে শুনে বিষ খাচ্ছেন। যাঁরা জানেন না, কৃষিক্ষেত্রে মার্কিন মুলুক ইতিমধ্যেই যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, তা অচিরেই এদেশের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের লোকেরা সাধারণত ভাবেন যে, প্রথম বিশ্বের দেশগুলো সুখের সাগরে ডুবে থাকে। সবকিছুতেই তারা এগিয়ে। এই যেমন, কৃষিক্ষেত্রে বিগত ৪০ বছরে কর্পোরেট আগ্রাসনের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি, দুগ্ধ ব্যবসায়ী এবং পশুপালকদের যে সর্বনাশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে, তা এদেশে এখনও হয়নি। এ দেশে ‘প্রসেসিং’ চলছে। সর্বনাশা এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে, গত কয়েক বছরে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের হাজার হাজার কৃষক যে আন্দোলন করছেন, তা দেখে যার পর নাই খুশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া শহরের প্রবীণ কৃষক-দম্পতি, প্যাটি নেলর ও জর্জ নেলর। বেদব্রত’র তথ্যচিত্রে তাঁরা বলেছেন, তাঁদের মতো কৃষকরা কীভাবে অন্ধকারে ডুবে গেছেন। আক্ষেপ করে বলছিলেন, “মার্কিনমুলুকে এখন এমনই অবস্থা যে আন্দোলন করার মতো কৃষক আর অবশিষ্ট নেই।”
কোনও সমস্যার সমাধান করার আগে মূল সমস্যাটা খুব ভালো করে বোঝা দরকার। ওঁদের আজ যা পরিস্থিতি, কাল আমাদের হবে। আজ ওদের কাছে যা অতীত, পরিস্থিতির বিরুদ্ধে এখনই না রুখে দাঁড়ালে তাহাই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। ‘দেজা ভ্যু’ ছবির শিরোনামটি সে কারণেই বিশেষ তাৎপর্যবাহী। কীভাবে অন্ধকার থেকে অন্ধকারের দিকে চলেছে এদেশের কৃষক ও ক্রেতারা, সে বিষয়েই আলো ফেলতে চেয়েছেন পরিচালক। তথ্য, পরিসংখ্যান ও লেখচিত্র সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও পশুপালক পরিবারের সাক্ষাৎকার তুলে ধরে বেদব্রত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন, মুক্ত অর্থনীতির ফাঁদে পড়ে আমেরিকার কৃষিক্ষেত্রে আজ যে সর্বনাশ নেমে এসেছে, ঠিক একই সর্বনাশ ও বিপর্যয় ঘটতে চলেছে ভারতেও।
এদেশে কৃষক-আত্মহত্যার কথা তো আমরা জানিই। আমরা জানি না, বিগত শতকের আশির দশকে বিতর্কিত ‘ফার্ম বিল’-এর জেরে বহু মার্কিন চাষি সর্বস্বান্ত হয়ে, পরিবারকে বীমার টাকা পাইয়ে দিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার কাছে নিজেদের জমিজমা জলের দরে দিতে বাধ্য হন সেখানকার চাষিরা। সেখানে কর্পোরেটরা বিশাল বিশাল এগ্রিকালচারাল টার্মিনাল গড়ে তুলে একচেটিয়া ব্যবসা করছে। আমেরিকা থেকে ভারত, কর্পোরেটরা চায় চাষিরা তাদের ইচ্ছেয় চলবে, অলাভজনক হলেও চুক্তিভিত্তিক চাষে সম্মত হবে। আমেরিকায় যে ভুট্টা এখন উৎপাদন হয় তার মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষের খাবার, বাকি ৯৫ শতাংশ জেনেটিকালি মডিফায়েড। হয় পশুখাদ্য, নয়তো বায়ো ফুয়েল। আগে গবাদিপশুরা চাষিদের পরিবারেরই অংশ ছিল, একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। এখন সেখানে গবাদি পশুপালন আর সাধারণ নিয়মে হয় না। আমেরিকায় সুপরিকল্পিত ভাবে ধাপে ধাপে যাবতীয় পারিবারিক চাষ-আবাদ, পশু খামারের ব্যবসা, গো-শালা — কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে কর্পোরেটের একচেটিয়া মুনাফা বৃত্তি। গবাদি পশুদের জন্য সেখানে তৈরি হয়েছে ক্যাফো (Cafo)। যা জেলখানার থেকেও ভয়ংকর। সম্পূর্ণ কৃত্রিম পদ্ধতিতে পশুপালন করা হয় সেখানে।
এসবের বিরুদ্ধে আমেরিকায় কোনও সংগঠিত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। কিন্তু, ভারতে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এম এস পি) সুনিশ্চিত করা এবং কৃষি সংস্কার আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দিল্লির কাছে সিংঘু ও টিকরি সীমান্তে প্রায় এক বছর ধরে চলেছে কৃষকদের আন্দোলন, অবস্থান বিক্ষোভ। পুলিসের সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে ৭০০ চাষির। কিন্তু হাল ছাড়েননি কৃষকেরা। সংসদে কৃষি সংস্কার আইন পাশ করে সরকারের বক্তব্য, উৎপাদিত ফসল মজুদ, বিক্রি ও মূল্য নির্ধারণ করা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ শিথিল করার জন্যেই আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে চাষিদের উপকারের কথা ভেবে। আর বহু দশক ধরে মুক্ত বাজারের কবল থেকে সরকারি আইনের জোরে সুরক্ষিত থাকা চাষিদের আশঙ্কা, কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে আসলে কর্পোরেট লবিকে যাবতীয় সুবিধে করে দেওয়া হয়েছে যাতে তারা চাষিদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করতে পারে। এর ফলে বিপুল কর্পোরেট শক্তির সঙ্গে কখনওই এঁটে উঠতে না পেরে আদতে নানান অন্যায্য চুক্তির ফাঁদে পড়ে পথে বসতে হবে চাষিদের। বিশ্বায়ণের সুযোগ নিয়ে মুনাফালোভীরা চাষের পরম্পরা, চাষিদের মন নষ্ট করে দিয়েছে। কৃষকেরা ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন। চাষ করলে সমাজে সম্মানও নেই। সমবায়গুলো কেবল টাকা ধার দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে যেমন সকলের পরিচয় “ভোটার”, পুঁজিবাদের এই ঘোরতর যুগে সকলের পরিচয় যেমন “ক্রেতা” , তেমনই সবুজ বিপ্লব পরবর্তী এ সময়ে কৃষিক্ষেত্রে একটাই কথা শোনা যায়, “ফলন, ফলন, ফলন”। আরে বেশি ফলন খায় কে? বেশি ফলনের জন্য চাষিকে সঠিক দাম দেয় কে? বেশি ফলন ফলাতে গিয়ে মাটি মরে যাচ্ছে তার দায় নেয় কে? বেশি ফলনেও রোজগার কম বলে অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরা কৃষিকাজে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়, এর দায় নেয় কে?
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এই তেষট্টি মিনিটের ছবিতে উঠে এলো এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ছবিটির ইংরেজি ভয়েস ওভারে রয়েছেন আলি ফজল আর হিন্দিতে নাসিরউদ্দিন শাহ। এই ছবিতে পরিচালক মিলিয়ে দিয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সমস্যা।
ঝকঝকে শপিং মল কিংবা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে শাক-সবজি, ফলমূল যাঁরা কিনছেন, তাঁরা কি আদতে বহুজাতিক কর্পোরেট কোম্পানির তহবিলই ফাঁপিয়ে তুলছেন না? যিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষ করলেন, তাঁর কপালে কত টাকা জুটছে? বেদব্রত তাঁর ছবিতে দেখিয়েছেন, কর্পোরেট সংস্থা এবং উৎপাদকের মধ্যে দ্রব্যমূল্যের বিস্তর ফারাক কেন ও কীভাবে হচ্ছে।

বেদব্রত দেখিয়েছেন, দেশকাল সময়ের নিরিখে কৃষকেরা ঠিক কোথায়? কেন অনশন বা আত্মহত্যা? এমএসপি ঠিক কী? পাঞ্জাবের কৃষক সম্প্রদায় এবং সুদূর উইস্কনসিন প্রদেশের ডেয়ারি ফার্মার্সদের মধ্যে মিল কোথায়? ১৯৩০-এর পর তাদের ঋণের বোঝা বাড়তে বাড়তে কোথায় পৌঁছেছে?
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এই তেষট্টি মিনিটের ছবিতে উঠে এলো এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ছবিটির ইংরেজি ভয়েস ওভারে রয়েছেন আলি ফজল আর হিন্দিতে নাসিরউদ্দিন শাহ। এই ছবিতে পরিচালক মিলিয়ে দিয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সমস্যা। দেখিয়েছেন মুনাফালোভীদের জন্য প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় বিশ্ব বলে আদৌ কিছু হয় না। রাষ্ট্র তার মুনাফা চায়। সার্বিক কল্যাণসাধন একটা ছদ্মবেশ। তাই ছবিটি শুরুর আগেই বেদব্রত বলে দিয়েছিলেন তাঁর সার কথাটি “এই ছবি যদি মানুষকে ভাবায়, তবেই পরিচালক হিসেবে আমার সার্থকতা”।

