KIFF-এ বিয়ন্ড বর্ডারস : বেঘর হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প

বিয়ন্ড বর্ডারস – ডিসপ্লেসমেন্ট, মাইগ্রেশন…। অর্থাৎ, যা-কিছু ছেড়ে আসা এবং নতুন ঠিকানা খুঁজে নেওয়া। এই গোটা প্রক্রিয়াটার মধ্যে আছে সীমানার গল্প, হতাশা, অপমান, আবার হঠাৎ কিছু খুঁজে পাওয়ার আনন্দ। অভিবাসন, স্থানচ্যুতি, উদ্বাস্তু, পরিযায়ী এগুলো আসলে রাষ্ট্রের তৈরি করা শব্দ। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে চর্চিত একটি বিষয়। তারপরেও গৃহহীন মানুষরা স্বপ্ন দ্যাখে। যুদ্ধে সব হারানোর পরেও নতুন করে বাঁচার রসদ খুঁজে নেয় কেউ কেউ। আমরা ভারতের মতো দেশে এনআরসি নিয়ে বড়োসড়ো আন্দোলন হতে দেখেছি। আসলে কে বৈধ আর কেই বা অবৈধ, তার হিসেবটা খানিক গোলানো। ভারতের মতো বড়ো দেশে, যে দেশ একটা দেশভাগের সাক্ষী, যেখানে এত ভাষা-সংস্কৃতি-ধর্ম, সেখানে এই ধরনের আইনি জটিলতা অনেক মানুষের কাছেই কঠিন ধাঁধার মতো। প্রতি বছর বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, যারা দিনের পর দিন ফুটপাথে দিনাতিপাত করেন, যাঁরা লিঙ্গ পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় পেয়েছেন – এঁদের কারোর কারোর কাছে এখন এসআইআর তাই চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। (অভিবাসী, পরিযায়ী ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে সিনেমা)

কলকাতায় আলাপ হয়েছিল মায়ানমারের পরিচালক বো থেট ঠোন-এর সঙ্গে। তাঁর তথ্যচিত্রের প্রধান বিষয় মানবাধিকার। মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান-এর বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় মিলিটারিরা হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে বো পালিয়ে যান থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ডে চলে যাবার পর ইয়াঙ্গুনে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায় মিলিটারিরা এবং মেরে দেবার হুমকি দেয়। পাশাপাশি হাসান ফাজিলির কথাও আমরা অল্পবিস্তর জানি। এই আফগান চিত্র নির্মাতার মাথার দাম ধরে দিয়েছিল তালিবান জঙ্গিরা। স্ত্রী ও দুই বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে রাতারাতি বাড়ি ছাড়তে হয়। তারপর এ-দেশ থেকে ও-দেশ ঘুরে বেড়ান আর মোবাইলেই ধরে রাখেন সেই ভয়ংকর উদ্বাস্তু জীবন। (অভিবাসী, পরিযায়ী ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে সিনেমা)

এবারের ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের একটা বড়ো জায়গা জুড়ে থাকছে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিভাগ – বিয়ন্ড বর্ডারস। অর্থাৎ, সীমানা ছাড়িয়ে। অভিবাসী, পরিযায়ী ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে ছবি দেখাবে এই বিভাগ। প্যালেস্তাইন, লেবানন, ইরাক, মিশর, সৌদি আরব, তিউনিসিয়া, সুদান-এর মোট ৯টি সাম্প্রতিক ছবি দেখানো হচ্ছে এই বিভাগে।

আজ পৃথিবী জুড়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এমন হানাহানি চলছে, সবদিক থেকেই একটা ভয়ংকর অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছে আবিশ্ব। এই সমস্ত ঘটনা নানা সময় নানা ভাবে উঠে এসেছে মানুষ নির্মিত কাজের মাধ্যমে। তা সে সিনেমা হোক বা থিয়েটার, পেইন্টিং হোক বা কবিতা। এবারের ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের একটা বড়ো জায়গা জুড়ে থাকছে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিভাগ – বিয়ন্ড বর্ডারস। অর্থাৎ, সীমানা ছাড়িয়ে। অভিবাসী, পরিযায়ী ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে সিনেমা দেখাচ্ছে এই বিভাগ। প্যালেস্তাইন, লেবানন, ইরাক, মিশর, সৌদি আরব, তিউনিসিয়া, সুদান-এর মোট ৯টি সাম্প্রতিক ছবি দেখানো হচ্ছে এই বিভাগে। বেঘর হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প আমাদের কাছে নতুন নয়। ঋত্বিক ঘটক তাঁর ছবিতে ফিরে ফিরে গেছেন দেশভাগ বৃত্তান্তে আর তুলে ধরেছেন ছিন্নমূল মানুষের রক্তমাখা জীবনগাথা। (অভিবাসী, পরিযায়ী ও উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে সিনেমা)

পাসিং ড্রিমস

রশিদ মাশারাওই পরিচালিত প্যালেস্তাইনের ছবি ‘পাসিং ড্রিমস’ বারো বছর বয়সী এক মেয়ের হারিয়ে যাওয়া পায়রার গল্প বলে। হারিয়ে যাওয়া পায়রার উদ্দেশ্যে তার সেই হৃদয়গ্রাহী যাত্রার সঙ্গে জুড়ে যায় ফিলিস্তিনি শহরগুলি। এই ছবির পরিচালক রশিদ মাশারাওই একজন ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি গাজা উপত্যকার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন। সিনেমায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বানিয়েছেন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ছবি। ‘পাসিং ড্রিমস’ দেখানো হবে ৭ নভেম্বর, সকাল ১০টা থেকে বিনোদিনী থিয়েটারে এবং ১৩ নভেম্বর, সকাল ৯টায় নবীনা সিনেমাহলে।

অন্যদিকে, মিশরীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরাদ মোস্তফার প্রথম ছবি ‘আয়েশা কান্ট ফ্লাই অ্যাওয়ে’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর দেখানো হতে চলেছে কলকাতায়। এই ছবির বিষয়ের কেন্দ্রে রয়েছে একজন সুদানী পরিচর্যাকারী, যিনি কায়রোতে অন্যান্য আফ্রিকান অভিবাসী ও স্থানীয় গ্যাংগুলির উত্তেজনার মধ্যে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছেন। মিশরীয় সমাজে নারী ও আফ্রিকান শরণার্থীদের সংগ্রামের উপর দৃষ্টিপাত করে মিশরের এই ছবি। ছবিটি দেখানো হবে ৭ নভেম্বর, সকাল ১১টা থেকে অজন্তা সিনেমায় এবং ১৩ নভেম্বর, বেলা ১২টায় গ্লোব সিনেমায়।

আয়েশা কান্ট ফ্লাই অ্যাওয়ে এবং হিজরা

সৌদি আরবের ছবি ‘হিজরা’। সৌদির মহিলা পরিচালক শাহাদ আমিনের নতুন এই ছবিটি এ বছরের একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে (অস্কার) আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়েছে। মরুভূমির প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই রোড মুভি সৌদি নারীদের তিন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক, বিশ্বাস ও আত্ম-অন্বেষণের গল্প তুলে ধরেছে। ছবির গল্প ঘিরে রয়েছে বারো বছর বয়সী এক কিশোরী জান্নার জীবন। অনুসন্ধান ও আত্ম-আবিষ্কারের যাত্রা বোনে এই ছবি। এবছর কিফ-এর বিশেষ আকর্ষণ এই ছবিটি দেখানো হবে ৭ নভেম্বর, সকাল ৯টা থেকে, নবীনায় এবং ১৩ নভেম্বর, সকাল ১০:৩০টা থেকে নিউ এম্পায়ারে।

দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজব

তিউনিসিয়ার ছবি ‘দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজব’ পরিচালনা করেছেন কাউথার বেন হানিয়া। বেন হানিয়ার ছবি প্রায়শই আবেগঘন আখ্যানের মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে অন্বেষণ করে চলে। ‘দ্য ম্যান হু সোল্ড হিজ স্কিন’ ছবির মাধ্যমে একাডেমি পুরস্কারের (অস্কার) মনোনয়ন অর্জন করেন বেন হানিয়া। এছাড়া তাঁর ‘ফোর ডটার্স’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কৃতও হয়। ‘দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজব’ গাজায় আটকে পড়া বছর পাঁচেকের এক ফিলিস্তিনি শিশুর গল্প। সমসাময়িক বিশ্ব সিনেমার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর কাউথার বেন হানিয়ার এই ছবিটি এবারের কিফ-এ দেখা যাবে ৭ নভেম্বর, সন্ধে ৬:৩০টা থেকে নজরুল তীর্থ ১-এ; ১১ নভেম্বর, সকাল ৯টা থেকে আইনক্স কোয়েস্টে এবং ১৩ নভেম্বর, বিকেল ৪:৩০টা থেকে নন্দন ১-এ।

দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধ যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন বোমার আঘাতে শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, আর একটি পরিবার তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে নতুন জীবনের খোঁজে। ধ্বংসস্তূপে ফিরে এসে, তারা কেবল নিত্যসামগ্রীর টুকরো খুঁজে পায়, আর নতুন করে স্বপ্নের আলো দ্যাখে। এমনই একটি বিষয়কে ছবির কেন্দ্রে এনেছেন ইরাকি-ফরাসি পরিচালক আব্বাস ফাহদেল। ফ্রান্সে একসময় সিনেমা নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন, তারপর ইরাকে ফিরে এসে তাঁর দেশের ভিটে ও হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেন তথ্যচিত্র ‘ব্যাক টু ব্যাবিলন’। তাঁর সাম্প্রতিক ছবি ‘টেলস অফ দ্য উন্ডেড ল্যান্ড’-এর জন্য আব্বাস এবছর লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরষ্কার পান। লেবাননের এই ছবিটি কলকাতায় দেখানো হবে ৯ নভেম্বর, বিকেল ৪টে থেকে নজরুল তীর্থ ১-এ এবং ১২ নভেম্বর, বিকেল ৪:৩০টেয় নন্দন ১-এ।

টেলস অফ দ্য উন্ডেড ল্যান্ড

এছাড়াও ‘বিয়ন্ড বর্ডারস’ বিভাগের তালিকায় আছে আরও চারটি ছবি। ইতিমধ্যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইটে।

উদ্বাস্তু সমস্যা আসলে কি সভ্যতার সংকট? আধুনিক মানুষের সংজ্ঞা তাহলে কী – আজও সেখানে রাজনীতি, হানাহানি, মানুষের লোভ আর চাহিদা জীবনকে এলোমেলো করে দিচ্ছে, ভূমিহারা করছে, ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। তাই কি? প্রশ্ন তুলবে আলোচ্য ছবিগুলি। উত্তরণের উপায় খুঁজব আমরা সকলে মিলে।

Written by